সেই জোনাকিরা (১৬–১৯ অন্তিম) ৷৷ অনিরুদ্ধ সেন

3 05 2013

There are 19 sections of these memoirs, divided into 6 posts, this being the sixth and the final.

১৬ শুকতারাই সাঁঝতারা

মাস্টারমশাইদের কেউই ইহজগতে নেই আর: ফটিকচন্দ্র কুমার, শিশির সেনগুপ্ত, মীনাদি রীনাদি দুই বোন, হাসিদি, সুষমাদি, আরো কেউ কেউ বাদ গেলেন হয়ত৷ সহপাঠীদের মধ্যে এক দীপালী বাঁড়ুজ্যে ছাড়া কারু সঙ্গে যোগাযোগ নেই৷ মায়া সুরের সঙ্গে একবার পথ চলতি দেখা হয়েছিল, তাও বছর কুড়ি আগে; ঝাঁকড়া চুল ঝাঁকিয়ে দারুন কবিতা বলত মায়া, “কাঠবিড়ালি, কাঠবিড়ালি, পেয়ারা তুমি খাও?” মায়ার জ্যেঠামশাই, মোহিনীমোহন, ব্যান্ডেল চার্চের উল্টোদিকে সেন্ট জন’স স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন; কেহ বা কাহারা তাঁর ঘাড়ে কাটারির কোপ মেরেছিল, জব্বর কোপ, অনেক ভুগে বেঁচে গিয়েছিলেন সেযাত্রা! তাঁর স্কুলে উনিশ দিন পড়েছিলাম, হুগলি কলেজিয়েটে ভর্তির অপেক্ষায়৷

বাবার তত্ত্বাবধানে হ-য-ব-র-ল নাটক হযেছিল একবার৷ সদ্য কামলামুক্ত আমি ন্যাড়া (লাল গানে নীল সুর, হাসি হাসি গন্ধ!… সুরহীনতাটা আমার সহজাত বলে তেমন মহড়া লাগেনি), সুজিত কাক্কেশ্বর কুচকুচে (হাতে রইলো পেনসিল), সমীর ছিল প্যাঁচারক (প্যাঁচা+বিচারক), সুভাষ ব্যা-করণ শিং, বি.এ., আর ডাক্তার দাসের মেজ মেয়ে মিন্টি পুং ভূমিকায় গল্পের আমি৷ রিহার্সল প্রায়ই হত আমাদের বাড়িতে, অধিকাংশ মুখোশ কলকাতায় কেনা, শুধু কুমিরের এবং আর দু একটা বাবা নিজের হাতে বানিয়েছিলেন। সেই সুযোগে সহপাঠীদের সঙ্গে ভাবটা আরও জোরদার হলো; খালি মিন্টি, আমাদের এক ক্লাস নিচে পড়ত, ছিল স্ট্যান্ডঅফিশ, বরং বলা ভালো তুষার কুমারী — অত রিহার্সল সত্ত্বেও আমার সঙ্গে ভাব হয়নি কখনও৷ পরে একবার রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে স্ত্রীচরিত্রবর্জিত মুকুট নাটকে রাজধরের ভূমিকায় বাপি, আমি সেজেছিলাম ইশা খাঁ, সুজিত আর শিবু অন্য দুই রাজপুত্র। সম্ভবত সেবারই পুংবর্জিত নাটক হল বিসর্জন: রঘুনাথের ভূমিকায় শিপ্রাদি, জয়সিংহ তার বোন শীলাদি আর অপর্ণা বোধহয় পিনুদি; উঠতি বয়সের ছেলেদের ভিড় হয়েছিল খুব! সেসব নাটকের রিহার্সলটাই আসল, যত দীর্ঘায়িত তত মজা!

সুজিত বল  সে  আমল  থেকেই  আমার  প্রাণের  বন্ধু,  এখনোও তাই,  তবে  সে বাংলা স্কুল ছেড়ে গিয়েছিল বাঁশবেড়ে স্কুলে৷ দু দুটো হালকা হার্দিক ধাক্কা সামলে এখনও সে বহাল তবিয়তেই আছে, দেখা সাক্ষাৎ হয়৷ গীতা নন্দি আর মীনা পোড়েল — বয়েসে কিছুটা বড় তবে আমাদের সঙ্গেই পড়ত, দুজনেরই বিয়ে হয়ে যায় স্কুলের গন্ডি পেরুতে না পেরুতে৷ মীনা তার পরেই আত্মহত্যা করে: কারণটা কখনও অনুসন্ধান করিনি তবে সহজেই অনুমেয়৷ দুই কৃষ্ণার একজন, ভট্টাচার্য, ছেলে হতে গিয়ে মারা যায় কাঁচা বয়েসে; অন্য কৃষ্ণা, চক্রবর্তী, আর তার দুই ভাই, শঙ্কর (ক্লাসের একমাত্র ছেলে যে ড্রইঙের বদলে সেলাই শিখত মেয়েদের সঙ্গে) ও সমরও কোথাও হারিয়ে গেছে৷

নতুন এস্টেটে ঝোপ জলা জঙ্গলের খামতি ছিলনা, বর্ষায় জোনাকিও ছিল বিস্তর, তবু দিওয়ানা কবি হাফ়েজ়ের মত হা জোনাকি যো জোনাকি করে আমার সেই জোনাকিদের খুঁজতাম৷ সারাক্ষণ বললে মিথ্যে বলা হবে, মাঝে মাঝে মন খারাপ হলে, অথবা আচমকা মনে পড়লে৷ তখনই বোঝা উচিত ছিল, কবি হওয়ার আসলি বীজ, নিষ্ঠা, আমার ভেতর নেই!

পিটর মাইকেলের পৈতৃক সাকিন ছিল বর্তমান ঝাড়খন্ডে, যত দূর শুনেছি রাঁচির অনতিদূরে বুণ্ডুর মুন্ডা বংশে তার জন্ম৷ তার জ্যেঠা ছিলেন কারখানার কর্মচারী, তখন চার্জহ্যান্ড, পরে ফ়োরম্যান৷ পিটর নিঃসন্তান জ্যেঠা-জেঠির কাছেই মানুষ এবং অমানুষ হচ্ছিল৷ এস্টেটের নবলব্ধ চুরাশি একর জঙ্গলের হাঁড়ির খবর জানত সে: কোথায় ঘুঘুদের আস্তানা (ইউ ক্যান রোস্ট দেম অন উড ফ়ায়ার… ডিলিশস্); কোথায় কুন্ডুদের পরিত্যক্ত শিব মন্দির, যেখানে খোঁড়াখুঁড়ি করলে গুপ্তধন মিলতে পারে; কোথায় লিচু পেকেছে কিন্তু জমাওয়ালার জাল পড়েনি এখনও৷ একটা সময় আমার সঙ্গে জমেছিল খুব, বোধহয় আমার এয়ার রাইফেলের দৌলতে৷ জঙ্গলের সব খবর রাখত সে, তবে সেই জোনাকিদের নিশ্চয়ই চিনতনা, সেই উল্টোনো জবার মত, গহন সমুদ্রের উজ্জ্বল আর বেপথু জেলিফ়িশদের মত, ফিসফিস করে কথা বলা জোনাকিদের; চিনলে কি আর বলতনা আমায়? উঠতি অবস্থার জ্যেঠা জেঠি ভালো বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়েছিল তাকে, পিটর তাঁদের বংশে গৌরব আনবে প্রথম! কিন্তু অদৃষ্টের রসিক দেবতা আরেকবার হাসলেন: স্কুল থেকে কোথাও পিকনিকে গিয়ে সাঁতার কাটছিল সে, জলের নিচে চোরা পাথর তাকে রেয়াত করেনি৷

কানাই পিটরের চেয় বেশি জঙ্গুলে ছিল: ঈশ্বরবাগে তাদের বাড়িতে গেছি একবার, তার মা বললেন, “ঘরে নেই, দেখোগে উত্তুরের পুকুরে ডালঝাঁপ খাচ্ছে হয়ত”৷ উত্তরের পুকুর তো বুঝলাম, কিন্তু ডালঝাঁপ কি ভালো খেতে? পানিফলের মত জলে ফলে? গিয়ে দেখি, একটা গাছের ডাল পুকুরের প্রায় সমান্তরাল হয়ে ঝুঁকে রয়েছে; কানাই তাতে চড়ছে আর জলে ঝাঁপাচ্ছে৷

…আরেকবার কানাই আমায় ডিম ষষ্ঠীর নিমন্ত্রণ করেছিল৷ আর সব ষষ্ঠীর নাম শুনেছি, তা বলে ষষ্ঠী আর ডিম! পেঁয়াজি পেয়েছ? সেদিন সরস্বতী পুজোর ভাসান, স্কুল ছুটি৷ যথাসময়ে গিয়ে শুনি, শ্রীপঞ্চমীর পর দিন সরস্বতীর বাহনের খাতিরে ষষ্ঠী: ঘরে পোষা হাঁসের ডিম সেদ্ধ, আলু সেদ্ধ, কুমড়ো সেদ্ধ দিয়ে ভাতে ভাত খেতে হয়, আমরাই খুঁজে পেতে এনেছিলাম  পাত পাড়ার পদ্ম পাতা;   ছেলেমেয়েদের  সে  সব  খাইয়ে তবে মা সেই পাতে খাবে,  হাতে  বাঁধবে নজর এড়াবার কালো সুতো৷ সর্ষের তেল আর কাঁচা লঙ্কা চলতে পারে, পেঁয়াজ নৈব নৈব চ!

মাটির অত কাছে থেকেও কানাই সেই জোনাকিদের দেখেনি৷ বড্ড গরিব ছিল কানাইরা, পড়াশুনো চালাতে পারেনি; শুনেছি, ঈশ্বরবাগেই দোকান দিয়েছিল একটা৷

শা’গঞ্জের বাংলা স্কুলে ছটা মাত্র ক্লাস৷ কথা ছিল বছর বছর একেকটা ক্লাস বাড়বে, কিন্তু বরাদ্দ এবং স্থানাভাবে সেটা শুরুতে মেয়েদের জন্য শুধু৷ কাজে ১৯৫৭তে সপ্তম ক্লাসে উঠে শহরের স্কুলে যেতেই হল৷ একে বেপাড়ার, তায় বেড়ে ক্লাসে বেঁড়ে ছেলে! বয়েসটা একটু কম বলেই বিপত্তি বেশি; প্রতিষ্ঠা পেতে লড়াই করতে হয়েছিল রীতিমত৷ যে কথা অন্যত্র বলা হয়নি তার মধ্যে আশরফির গল্পটা জরুরি হয়ত৷ জরুরি আর কি, সে অবশ্যই — জোনাকি নয় — তবে তেমনই অধরা কিছু একটা খুঁজত৷ কলেজিয়েটের গেটের বাইরে, টিপিনের এবং ছুটির সময়, খোলা সুদ্ধ বাদাম, ছোলা ভাজা, ঝাল ছোলা, ছোলা টোপার ঝুড়ি নিয়ে বসত সে; অন্য সময় টাউন ক্লাবের মাঠে কিংবা নদীর ধারে৷

একদিন, ক্লাস সেভ়েনেই হবে কারণ সেটা ছিল ইলেকশনের বছর, ১৯৫৭, মাস্টারমশাইরা ভোটাভুটির ট্রেনিঙে গেছেন সব, হাপ ছুটি, কোম্পানির ফিরতি বাস আসতে আসতে সেই সাড়ে চারটে৷ একেকদিন দপ্তরি শুকুল চাচা লাইব্রেরিতে বসে বইপত্র ঘাঁটতে দিত হেডমাস্টারমশাই পি.কে. সেনের সস্নেহ প্রশ্রয়ে, অবশ্যই লাইব্রেরি ঘরের এক কোণে নিজের খুপরি টুকুতে অন্য কোনও কাজ থাকলে৷ না থাকলে ফাঁকা স্কুলে চড়ে খাওগে৷ সেখানে নাকি মহসিন সাহেবের কোন বিবির ভূত এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়, প্রবাদ অনুযায়ী নিশুত, নিঃঝুম দিনমানেও৷ একদিন কি করি কি করি করতে করতে ষাঁড়েশ্বরতলা ঘাটে বুড়ো বটের ছায়ায় গিয়ে বসেছি, দেখি আশরফি পৈঠায় ঝুড়ি নামিয়ে উদাস চোখে গঙ্গার স্রোত দেখছে, চারদিক শুনশান — জনমনিষ্যি নেই৷ সেই থেকে বুড়োর সঙ্গে আমার গলাগলি ভাব৷

আশরফির গল্পটা বহু কাল আগেই, বোধহয় কলেজে থাকতে, একবার লিখেছিলাম, তাই খুঁটিনাটি অনেকটাই মনে ছিল; যদিও সে যাত্রায় আগা এবং লেজা হীন সে লেখাটা ধোপে টেঁকে নি; কাঙ্ক্ষিত পত্রিকার সম্পাদক পত্রপাঠ বাতিল করেছিলেন, টিকিট মারা ফিরতি খাম সঙ্গে দিই নি বলে ফেরত পাঠান নি৷

মোকামায় থাকতে রুজি রোজগার ছিল না আশরফির; ওইটুকু খেতির ফসলে অতগুলো লোকের চলে! অগত্যা চাচার কাছে নৈহাটি৷ এসে দেখে, চাচার কামাই বিস্তর, তবে হারামের কামাই, ডাকা ডালনেকা পয়সা! চাচার দলেই শেষমেশ ভিড়ে গেল আশরফি, তখনই তার দেড়কুড়ি দুকুড়ি বয়েস, বাঁজা বউটা মরে বেঁচেছে৷ চাচার এক নম্বর বেওসা নৌকোয় যাত্রী পারাপার৷ রাত হোনেসে সেই নৌকো নিয়েই অভিযান: চরেরা খবর আনত; খবর বুঝে কোনও দিন এখানে, কোনও দিন সেখানে, মাসে কমসেকম দো’তিন রোজ ডাকা ডালতা থা চাচার দল৷ গেরস্ত সজাগ থাকলে বা বেগতিক বুঝলে কাজ হত না; সে সব দিন মেজাজ টঙে তুলে দারু খেত চাচা আর লাল লাল চোখে আশরফিকে গাল পাড়তো৷ ভাগের বেলায় কিন্তু অষ্টরম্ভা: কখনো সিকিটা কখনো আধুলিটা, কখনো শুধুই  রক্তচক্ষু!

একা আশরফি ধরা পড়েছিল সেবার, সেই একবারই এবং শেষ বার৷ কাল বাদে পরশু যে বাড়িতে বিয়ে, গয়নাগাঁটি, নগদ টাকা, বেনারসি, কাঁসা পেতলের বাসন তো থাকবেই, বাড়ি ভর্তি কুটুমও থাকবে;  সে সব জেনেই তো আসা! সচরাচর বন্দুক দেখালেই কেঁচো হয় যায় লোক, মেয়েছেলেরা  চোখের  জল  ফেলতে  ফেলতে  হাহাকার  করে  ঠিক  কিন্তু নিজের নিজের গলার হার, কানের পাশা, হাতের বালাও  স্বেচ্ছায় খুলে দেয়৷ সেদিন, সেই ছোকরি, যার  কাল বাদে পরশু বিয়ে, তারই গায়ে গলায় হাত দিল চাচা!

“কি সুন্দর মেয়েটা, খোকাবাবু, কি মাসুম — তোমাকে তা কি করে বোঝাই! তোমার তো বোঝার বয়েসও হয়নি; তা ছাড়া আমার দিলে যা হচ্ছিল সেটা বলবার মত ভাষা আমার নেই৷ নরম চাঁপা রঙের মেয়েটার মুখে চোখে ইজ্জতের ভয়, এখনো চোখ বুজলে দেখতে পাই৷ আমি বারবার চাচাকে মনা করছিলাম, হাত ধরে টেনেও ছিলাম, সেই দেখে মেয়েটা কেমন তাকিয়েছিল আমার দিকে, হয়ত আশ্বাস চাইছিল৷ কি করে ভুলি!

“মেয়েটার কোনো আত্মীয়, হয়ত ভাইয়া, চাচাকে ছাড়াবার চেষ্টা করছিল; ধস্তাধস্তিতে এমন হয়ে গেল কি খালেদের হাতের বন্দুকসে গোলি ছুটে গেল আর মরলো সেই ভাইয়া৷ মেয়েটার গায় হাত দিচ্ছে চাচা? আমার গুসসা হল৷ হতভম্ব খালেদের বন্দুকটা কেড়ে নিয়ে চাচাকে ঝেড়ে দিলাম৷ সবাই দেখল কিন্তু বিচারের সময় সে কথাটা বললনা কেউ, বললে কিছু কমসম সাজা হত হয়ত! ধরা পড়লাম আমি একা, বাকি সব এ তল্লাট থেকেই পালালো, গয়নাগাঁটি নিয়ে৷

“আমার উমর কয়েদ হল৷ আঠেরো মাস রেমিশন নিয়ে সাড়ে বারো বছর খেটে বেরিয়ে এই সাত দস সাল বাদাম বেচছি৷ ভাইয়াটা তো মরেই গেল; মেয়েটা আছড়ে পড়েছিলো তার ওপর, আমি এখনো দেখতে পাই৷”

“কি দেখ, আশরফি?”

“আমি সেই মেয়েটাকে দেখি৷ বিচারের শেষ অবদি, জানি, তার বিয়ে হয়নি৷ তার পর তার কি হল? হিন্দুরা কি আর বিয়ে দিতে পারবে?…সে কোঠিতে তারা আর থাকেনা, খোকাবাবু, আমি দেখে এসেছি৷”

“তুমি কি তাকে দেখতে চাও?”

“এসব কথা বোঝার বয়েস তোমার হয়নি, খোকাবাবু৷”

আমার নিজের দিলের ভেতরকার যে আকুতি, সেই জোনাকিদের জন্য যারা দেখা দিয়ে হারিয়ে যায়, তার কথা তো আশরফি জানত না, জানার কথাও নয়, কাউকে এতদিন বলিনি সে কথা!

###

১৭ দেখা নাদেখায় মেশা

১৯৫৪ থেকে ১৯৬৫ ওই ১১৬ নম্বর ছিল আমাদের ঠিকানা, হাল সাকিন ও অভয়াশ্রম৷ তার মধ্যে ১৯৬২র মাঝখান থেকে ১৯৬৫র মাঝামাঝিঅবধি কাটিয়েছি কলকাতায় (যে শহরটা এখনও আমার নিজের হল না!) পড়াশুনোর অজুহাতে৷ সেই নতুন এস্টেটেই আমার যথার্থ বয়ঃপ্রাপ্তি,  ছেলে থেকে লোক হয়ে ওঠার প্রথম সোপান৷ কিন্তু, সুধী পাঠক, আমি পিটর প্যানের মত চিরকিশোর থাকতে চেয়েছিলাম৷ যে ভগবানকে কখনও মানিনি, তার দিব্যি, নতুন স্কুলের বেনেবাড়ির ছেলেরা যেমন বাঁ হাত দিয়ে একবার কণ্ঠা একবার চোখ ছুঁয়ে দ্রুত লয়ে বলত, “sত্যি বলছি, মাইরি, মা কালির দিব্যি, চোক ছুঁয়ে বলছি, গণেs মানত”, সেই রকম দিব্যি গেলেও বলতে পারি, “আমি বড় হতে চাইনি, চাইনি, চাইনি!”

দীর্ঘতর সময়, হয়ত পাকাপাকি, চিরকাল, পরবাসে কাটানোর কথা ছিল, পাখির ছানা যেমন উড়তে শিখলে নিজের মনেই অন্য কোথাও চলে যায় — হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোনওখানে জীবনের বন কেটে নিজের বসত  বসায়৷ আমি নিজে এবং চেনাশোনা সকলেই তাই ভাবতেন, কিন্তু অদৃষ্টের রসিক দেবতা মৃদু হাসছিলেন তখনও! আমি লায়েক হবার আগেই আমার পূজনীয় পিতৃদেব সব দায়িত্ব আমার ঘাড়ে ফেলে সটকে পড়লেন ১৯৬৫র জুলাইতে৷ পয়সাকড়ি কিছু রেখে যাননি বলবনা, তবে এমনই তাঁর ইহলৌকিক জ্ঞান যে জীবিত কাউকে নমিনি করেননি! সেই থেকে শা’গঞ্জের ঘানিতে পাকাপাকি জুতে গেলাম৷ বিদ্যে সামান্যই, বুদ্ধি তথৈবচ, অনেকটাই পিতৃবিয়োগের আহা বেচারা সমবেদনা, বাকিটা লিখিত নির্বাচনী পরীক্ষা আর নির্দ্বিধার ইন্টারভ়িউএর খাতিরে সেই কারখানাতেই চাকরি হল একটা, তিন বছরের ম্যানেজমেন্ট ট্রেনি৷

চেনা মানুষ, বিশেষ করে বাপের চেনা মানুষদের সঙ্গে কাজ করার হ্যাপা অনেক: একে তো বয়স্করা বাজে বকে বেশি, তায় পদে পদে গঠনমূলক তুলনা ও সমালোচনা!

“আর্য সেন বিরাট পন্ডিত ছিলেন, তোমার মত ফাঁকিবাজ না৷”

“এই যে তুমি ক্ষীরোদ করের চায়ের দোকানে চ্যাংড়া ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা মারো, এটা কি আর্য সেনের ছেলের পক্ষে শোভন?”

“তুমি শেষমেষ সত্যিই অনার্স পেয়েছিলে? সেনবাবু তোমার পরীক্ষার মধ্যেই মারা গিযেছিলেন না?”

ততদিনে আমরা ১১৬ ছেড়ে সান বারান্দাহীন ১৬৯ নম্বরে উঠে গেছি, বলা ভালো নেমে গেছি, এবং অচিরেই সেখান থেকে আরও নেমে সাবেক শা’গঞ্জ কেওটার টায়ারবাগানে, গোবিন্দ ঘোষের সন্তোষ কাসটে, কারণ বিজ্ঞপিত ইংরেজি গৃহপরিচিতির শেষ দুটো অক্ষর খসে গিয়েছিল৷ সেখান থেকে আবার লাটবাগানে, সুহাস সেনগুপ্তর নামহীন গৃহে, সন্তোষ কাসলের মত নিস্প্রদীপ নয়৷ সুহাসবাবুর এক ছেলে, সুরজিত, বাংলার ফুটবল দুনিয়ায় স্বনামধন্য, আর এক ছেলে প্রতিষ্ঠিত ভূতত্ত্ববিদ্ ও আমার সমপাঠী; সহপাঠী নয় কারণ সে পড়ত ব্র্যাঞ্চ স্কুলে৷ বহুদিন আগে জ্যোতিষ (যতীশ?) কাকা প্রায় জোর করে বাবাকে কিনিয়ে দিয়েছিলেন একটা প্রমাণসই জমি, জলের দরে, বড় রাস্তার ওপর এবং, জনধারণায়, কেওটার তখনকার রইসতম পাড়ায়, যেখানে চক্ষুবিদ নীহার মুনশির নিজের এবং তাঁর আত্মীয়বর্গের বাড়ি৷ অদূরেই ভাগীরথী সতত প্রবাহমানা, ব্যান্ডেল চার্চ চারশো গজ, স্টেশন তিন মাইলের কম, কারখানা আধ কি পৌনে মাইল!

১৯৬৮তে, এস্টেট ডিউটি দিয়ে সাকসেশন সার্টিফিকেট পাওয়ার পর, বাবার মৃত্যুজনিত কারণে প্রাপ্ত ও কিঞ্চিত সঞ্চিত অর্থে একটা ভদ্রাসন তৈরি হল সেখানে,  আমার পরম বন্ধু, পরে সাতাশ বছর ধরে আমার সহকর্মী, সদ্য পরলোকগত স্থপতি সুবীর সেনগুপ্তের নকশায়৷ নকশাটা অনন্য বলা যাবেনা কারণ কনট্র্যাকটর টোগু বাবু, যিনি সুবীরের সন্ধান দিয়েছিলেন, আমাদের বাড়ি তৈরির বছর দুই আগে প্রায় একই নকশার আরেকটা বাড়ি বানিয়েছিলেন চন্দননগরের পুরশ্রী কলোনিতে, সুবীরেরই ডিজ়াইনে; ট্রেনচলতি দেখা যেত এবং ডেলিপাষন্ডদের নানান আলোচনার বিষয় ছিল সেটা৷

মিল কন্ট্রোল ল্যাবের জটা গাঁজারু এবং কোকেনসেবী ছিল তো বটেই, তবে সদ্য মিক্স করা রাবার কমপাউন্ডগুলোর মনের কথা শুনতে পেত সে; মুনি বা রিওমিটার যন্ত্রে না চড়িয়েই স্পর্শে, চর্বণে, দলনে ও ঘ্রাণে সে তাদের ভিসকসিটি, অন্তত দুটো তাপমাত্রায় স্কর্চ সেফ়টি, কিওর টাইম, কিওর রেট ইত্যাদি হুবহু বাতলে দিতে পারত; বিশ্বাস না হলে মিলিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ ছিল — কখনও জিততে পারিনি৷ পাকেচক্রে দেখা গেল, আহা উহু সমবেদনা ছাড়া আমারও একটা ঐশী ক্ষমতা আছে — জটার চেয়ে কম নয় কিছু৷ রাবার (কলচলতি ভাষায় রবাট, কারখানাটার ডাকনাম রবাট কল, আমরা সব রবাট কলের কুলি) নামক পলিমারগুলোর বিশাল অণুরা আমার কথা শুনত৷ সত্যি, প্রায় বিনা চেষ্টায়, রেসিপি দেখে বা নতুন রেসিপি উদ্ভাবন করে, স্ট্রাকচার বুঝে, প্রণিধানযোগ্য স্থাবর ও জঙ্গম প্রপার্টিগুলো অক্লেশে বলে দিতে পারতাম ভবিষ্যৎদ্রষ্টার মত! হয়ত তারই জন্যে অচিরাৎ ফ্যাক্টরি টেকনিকাল ছেড়ে দ্রব্যগুণের গবেষণাগারে জায়গা হল আমার, নতুন গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগে৷ অথবা, বলা ভালো, গবেষণাগারগুলোর সরকারি স্বীকৃতি এবং আর অ্যান্ড ডি-তে উত্তরণ হল যৌথ প্রচেষ্টায়, তাতে আমার দায়ভাগের (আর পাঁচ বছর ধরে মেহনতের) দাবি ছিল অনেকটা৷

গবেষণা হল গো+এষণা, গোরু খোঁজার কাজ৷ ওই রাখালিয়াপনাটা আমার সহজে আসতো, আগের জন্মে ব্রজের গোপ-বালক ছিলাম কি না কে জানে! ১৯৭৩ সাল, পশ্চিম এশিয়া সংকট এবং ওপেক সংগঠনের সব-নিংড়োনো অর্থনীতির শুরুয়াৎ৷ কাজেই আমার করে দেখানোর বিস্তর বিষয় ছিল৷ তারপর আর ফিরে দেখিনি কখনো; শুধু বিভাগের মাথা হয়ে ওঠার আগে বিদেশ থেকে একটা দুটো খেতাব আর পিঠচাপড়ানি  অর্জন করতে হয়েছিল৷

অদৃষ্টের রসিক দেবতা এবার অট্টহাসি হাসলেন! নতুন মালিকদ্বয়ের আবাসিক অংশিদার তাঁর সদ্য বিশ পেরুনো ছোট ছেলের জন্য ভারতীয় কোম্পানিটা কিনে নিলেন; সহক্রেতা নাম না জানা কে এক অনাবাসী৷ বিলিতি হোল্ডিং কোম্পানির হাঁড়ির হাল, আগেই শুনেছি; এখন লীড ব্যাংকার, বার্কলে, ঋণের বোঝা লাঘব করতে গোটা কোম্পানিটা টুকরো টুকরো করে বেচে দিল, এদেশের কসাইরা যেমন করে অনায়াসে জনসমক্ষে মাংস বেচে৷ আপাদমস্তক ছাল ছাড়িয়ে হেঁটমুন্ড ঝোলানো — দাপনার দাম এত, সিনার দাম তত, এমনকি শিং সুদ্ধ মাথা আর খুর সুদ্ধ পায়ারও আলাদা দাম ধরা আছে৷ ছাল কিনবে, ছাল? ডেলা পাকানো চর্বি? সব পাবে: ইংল্যান্ড, জর্মনি, ফ্রান্স, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজ়িল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ়… মায় হিন্দুস্তান হমারা!

নতুন মালিকদের মতলব কি কে জানে!

১৮৮৮  সালে বার্মিংহাম শহরে যাত্রা শুরু করেছিল যে দিশারী প্রতিষ্ঠান, ভারতে যার নথি-ভুক্তি ১৮৯৮তে এবং শা’গঞ্জে কারখানা স্থাপন ১৯৩৬ সালে, বণিকের মুদ্রানিক্বণে তার খাসি করা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিক্রি হল হঠকারিতায়! আমার ব্যক্তিগত ভাগ্য কিছুটা স্তিমিত হলেও তখনও ঊর্ধমুখী৷ তারও পরে গজকচ্ছপের লড়াই শুরু হল, দুই অংশিদারের দখলদারির পারস্পরিক লড়াই৷ অস্যার্থ, কারখানায় অশ্রুতপূর্ব সাতানব্বুই দিনের ধর্মঘট৷ পয়সার খেলা, বোঝাই যাচ্ছিল, কিন্তু কার পয়সায় দুটি ইউনিয়নই এই আত্মঘাতী খেলায় মাতল, সেটা বুঝতে সময় লেগেছে৷

এই কারখানাকে লোকে বলত মহীরূহপ্রতিম শিক্ষণ সংস্থা; ভারতময় তুল্যমূল্য অন্য প্রতিষ্ঠানে শা’গঞ্জে-কাজ-শেখা উচ্চ মার্গের লোকেদের রাজত্ব৷ সেই ভারতীয় সংস্থাও কিনা খাসি হয়ে গেল!

স্ট্রাইক মিটল, তবে আবাসিক অংশিদার পাততাড়ি গোটালো, অনাবাসী বড়-শরিকের হাতে লাগাম ছেড়ে দিয়ে৷ যাবার সময় অনেকটা রস নিংড়ে নিল আর টোপ ফেলে গোটা প্রতিষ্ঠানের বাছা বাছা লোকদের নিয়ে গেল নিজেদের প্রতিষ্ঠানে৷ আমি যাইনি; আমার কৈশোরের গোকুল, যৌবনের বৃন্দাবন ছেড়ে কোথায় যাব! …

      কাতলার গাদা ইলিশের কোল
তপসে ভাজা পাবদার ঝোল

                               (দখনে ছড়া)

মাছ শিকারের নেশা ছিল আগে, কিন্তু মাছেভাতে বাঙালি নই, তাই কাৎলা তপসে পাবদার খবর জানিনা৷ ইলিশটা অবশ্যই পছন্দ করি (চিংড়ি কাঁকড়াও, তবে সেগুলো মাছ নয় বলে বোধহয় ছড়ায় পাত্তা পায়নি) এবং নিশ্চিত জানি, শা’গঞ্জ ছিল প্রতিষ্ঠান কুলের ইলিশ (মনে পড়ে, ব্যান্ডেল-হাওড়া লোকালে সেই না-বাউল গায়কের টাটাবাটা**** বড়!) চিবিয়ে ছাতু করে ফেলা ইলিশের কাঁটার মত কোম্পানির ছিবড়েটুকু পড়ে রইলো তারপর৷ প্রতিষ্ঠান চালায় মানুষ; এক আধ জন নয়, অনেকের সমাহারে এক বিশাল মানুষের দল, সর্দার ও পুরোহিত সমেত, সতেরোর ‘ক’ থেকে উনসত্তর ‘ঙ’, যারা যন্ত্রাংশের মত নীরবে নিজের নিজের কাজ করে যায়৷ ঘড়িতে যেমন দম দেওয়া স্প্রিং, প্রতিষ্ঠানের তেমনি দম দেওয়া, জান কবুল করা মানব সম্পদ৷ নীলকণ্ঠের পালক খুঁজে পাওয়া নন্দিনীর মত অলক্ষ্য প্রেরণাও থাকে: একেক জনের একেক রকম — কারু প্রেরণা অর্থ, কারু আবার জিতবার ইচ্ছে, কেউ বা আবার জ্ঞানান্বেষী৷

সেই দম ফুরিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানে আমাকে লাথি মেরে আবার ওপরে তুলে দেওয়া হল, প্রথমে শা’গঞ্জের দন্ডমুন্ডের কর্তা, পরে কলকাতার হেড আপিসে, ক্রমক্ষীয়মান রাজত্বের একরাট রাজা!

###

 ১৮পূর্ণ চাঁদের মায়া

ঠিক দুক্কুরবেলা, যখন ভূতে মারে ঢেলা, চারদিক শুনশান, বাবুরা আপিসে,   কাকিমা মাসিমারা নিদ্রালু, দূর থেকে শোনা যেত ডাহুকের নালিশ, প্রেমপাগল কুকুরদের ভৌভৌকার, শিলকাটা ঈশানের ডাক, সাতসতেরো পাখপাখালির হঠাৎ  চেঁচামেচি৷ কর্তৃপক্ষের নিষেধ সত্ত্বেও গ্রাম থেকে ঘাসুড়েরা কাস্তে দিয়ে লনের ঘাস যেমন তেমন কেটে নিত নির্জনতার সুযোগে; যান্ত্রিক ঘাসুড়ের নিপুন ছাঁট সেই টাক পড়া শ্রীহীনতা ঢাকতে পারত না৷ লাফঝাঁপ থেকে নির্বাসিত আমি সান বারান্দায় দাঁড়াতাম এসে, হাতে হয়ত রাজকাহিনী কিংবা সিংখুড়োর গপ্পো, মনটা বাইরের বিস্তারে৷ দেখতাম, রাজ্যের কাক এসে জড়ো হচ্ছে পাশের ব্লকের ছাতে, মিটিং হবে এবার, লোকসভা বিধানসভার মত ভয়ানক চেঁচামেচি৷ বিচার হচ্ছে কোনও গুরুতর আইনভঙ্গকারী বায়সপুঙ্গবের৷ ওদের বিচারব্যবস্থা গণতান্ত্রিক এবং দ্রুত; নিষ্পত্তি হয়ে গেলে তক্ষুনি শাস্তি হয় অপরাধীর —  ঘাতক কাকেরা সাংঘাতিক ঠোকরায় তাকে, অন্যেরা রোমান সার্কাসের হৃদয়হীন দর্শকের মত ছীছিৎকার করে আর ডানা ঝাপটিয়ে ঘাতকদের উৎসাহ দেয়৷

না-হওয়া পাচিলের ওপাশে, সবুজ হলুদ দাবাছক খেতে, পাখমারারা কি যেন বলে চেঁচায়৷…

ছেলে ঘুমোলো পাড়া জুড়োলো বর্গি এলো দেশে

বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে? …

… জমিদারের খাজনা দেবার সময়ই কি শুধু বর্গি-বুলবুলির অজুহাত? না বোধহয়৷ এস্টেটের বাড়িতে ঢোকার সময় ইয়ংসাহেবের ঢেউখেলানো পাঁচিল সম্পূর্ণ হয়নি; সীমানার ওপারে বিস্তীর্ণ ধান খেত, মুসুর খেত, সর্ষে খেত দেখা যেত, দেখা যেত৷ সেই দিগন্তবিস্তারী সবুজ হলুদ ঢেউয়ের মাঝখানটিতে আম কাঁঠাল বাঁশঝাড় ঘেরা ছোট্ট একটা পটে আঁকা গ্রাম, ছায়াঘন, অসিত হালদারের জলরঙের মত৷ ফসলের সময় রাজ্যের পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসতো কোথা থেকে, তবে খাজনালোভী বুলবুলিদের দেখেছি বলে মনে পড়েনা৷ পাখমারারাও উদয় হত আকাশ ফুঁড়ে৷

বাংলায় চুয়াড় নামে একটা আদিবাসী জাত আছে, নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে সাঁওতাল মুন্ডাদের সমগোত্রীয়৷ তাদেরই নামে, আমরা না ভেবে বলি, চোয়াড়ে স্বভাব, চোয়াড়ে চেহারা, চোয়াড়ে ভাষা৷ এদের এক শাখা এই পাখমারা; নামেই পরিচয় — পাখি মারা তাদের পেশা৷ দীর্ঘকাল ধরে চাষি গেরস্তদের ফসল রক্ষা করত তারা; বনবাসী রামের মিত্র গুহর মত কাঁধে ধনুক, তুনীরে তিরের বদলে কোমরে গোঁজা কেঠো মাথার ভোঁতা বাঁটুল, পিঠের ঝুলিতে জাল৷ আর থাকত ভীষণদর্শন মুখ আঁকা কেলে হাঁড়ি — নরম মাটিতে ডাল পুঁতে মাথায় চড়িয়ে দিলেই খাসা কাকতাড়ুয়া! এ ছাড়া ক্যানেস্তারা পেটানোর সরঞ্জাম৷ বাবা বলতেন ওরা নাকি যাযাবর: খেতিকাজের সময় এখানে, বছরের বাকি সময় কোথায় থাকে, কি করে, কে জানে! পাঁচিল উঠে যাবার পরে আর দেখিনি তাদের, তবে বড় হয়ে কেতাবে পড়েছি৷

গোবিন্দ নামের পাখমারাটার বছর পনেরো বয়েস, দীঘল রোগাটে শরীর, খাকি হাপপ্যান্ট আর হলুদ গেঞ্জি পরা ধূসর চেহারা৷ ট্রাইসাইকেল চালাতে দেখে ঝোপ পেরিয়ে এপারে এসে ভাব করেছিল;  তার  মুখটা  এখনও মনে পড়ে৷ বয়েসে আমার চেয়ে বড় হলেও আমাকে ভালো লেগেছিল তার, আমারও তাকে৷ কারণ ছিল৷ আমার তাকে ভালো লাগত তার নাতিবিশাল কিন্তু অন্য দুনিয়ার গল্পের ভান্ডারের জন্য৷ সে চাইত মুখ বদল, একটু স্নেহ, একটু মনোযোগ৷ প্রথম দিনই তাকে দিয়েছিলাম আমার বরাদ্দের অস্ট্রেলিয়ান ক্রাফট চীজ়ের টুকরোটা, তার পর থেকে মঙ্ঘারামের বিশকুট কিংবা কমলালেবু আপেল৷ তাছাড়াও মা তাকে দুধ দিতেন, ঘরে তৈরি কেক দিতেন৷ জঙ্গলে পাওয়া যায় না সেসব, তাই সে আগে কখনও খায়নি৷ বলেছিল, জঙ্গলে আম জাম কাঁঠাল তো আছেই, খেত বাঁচানোর মজুরি স্বরূপ ছালা বোঝাই চাল ডাল নুন আছে, মাটির নাগরিতে জমানো তেল আছে, বন ভরা পাখি খরগোশ সজারু আছে, দিব্যি কেটে যায়৷ “ধ্যাৎ, সজারু খাস কি করে, অত কাঁটা!” সে আমার অজ্ঞতায় মজা পেত: “ছাল ছাড়ালেই সজারু তো খরগোশ, শ্যালের ভয়ে ওরা কাঁটা পরে থাকে, তাও জানিসনা!”

গোবিন্দদের ডাক পড়ত ধান বেড়ে উঠলে, তারপর কাজ ফুরুলে পাজি, যাও, চড়ে খাওগে! কাজ ফুরুলে যে পাজি হয় সে শিক্ষায় আমার সেই হাতেখড়ি; অনেক পরে হাড়ে হাড়ে বুঝেছি৷

আমার সেই স্নিগ্ধ, ছায়াময় আই.ও.কিউ.-এর কাছে এস্টেটের চেষ্টাকৃত শহুরেপনা ফিকে মনে হত বহুকাল৷ কালে কালে সেখানে বাস্তুর সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পেল, প্রায় আকন্ঠ ভরে গেল ইয়ংসাহেবের পূর্বপরিকল্পিত সীমারেখা৷ দু দুটো ক্লাব হল — তার একটায় সুইমিং পুল, স্কোয়াশ কোর্ট, বিলিয়ার্ড ঘর৷ অন্যটায় চেনা স্পোর্টস গ্রাউন্ডের বদলে আনকোরা মাঠ৷ নতুন বাজার, লেডিজ পার্ক, তিন ভাষার তিনটে আলাদা স্কুল৷ তবে সেখানে আমার বহুকালের চেনা সেই জোনাকিদের দেখিনি কখনো, যদিও দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল সর্বদাই৷

সম্প্রতি অনেক দিন জনশূন্য ছিল সেই এস্টেট, ঋগ্বেদের হরিয়ূপীয়ার মত প্রেতপূর্ণ; সারি সারি দরজা জানালা খুঁড়ে নেয়া ফোকলা বাড়ি সব ; লুঠ হয়ে যাওয়া আলো পাখা কল৷ তবে ছিল৷ দু’একবার জি.টি. রোড দিয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার সময় দূর থেকে দেখতে পেতাম৷ ইদানীং শুনি নতুন মালিক, হিসেব মিলিয়ে চতুর্থ পক্ষের, সেই সব ইমারত ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে; অথবা হয়ত বিক্ষুব্ধ কিছু মানুষ যাদের প্রতিবাদ মানেই ভাঙচুর, গড়ে তুলতে কেউ শেখায়নি তাদের, তারাই হয়ত আগ বাড়িয়ে অতীত দর্প চূর্ণ করতে চেয়েছে এমন ভাবে যাতে আগামি দিনের কোনও রাখালদাস, কোনও মার্শাল, একটা ইটও খুঁজে না পায়৷ যাতে আবার অক্ষতযোনি কুমারী হয়ে ওঠে গোটা অঞ্চলটা৷ তাকে যথেচ্ছ রমণ করতে উদ্ধত লিঙ্গের মত সারি সারি বহুতল গজিয়ে উঠবে হয়ত সর্বত্র; লোভে চকচক প্রোমোটারের চোখ, লকলকে কামাসক্ত জিভ তাদের!…

সেই জোনাকিদের কম খুঁজেছি নাকি!

ভাইয়ের যখন দশ মাস বয়েস, মায়ের শরীর সারাবার জন্য দার্জিলিং গেলাম সকলে৷ মলের এক প্রান্তে অ্যালিস হোটেলে উঠেছিলাম৷ সুধীদা, সুধীরঞ্জন দাস, সুপ্রিম কোর্টের তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি এবং পরে বিশ্বভারতীর উপাচার্য, সস্ত্রীক উঠেছেন ঠিক আমাদের পাশের কামরায়৷ অন্য কোনও কামরায় গৌরী দেবী আর গৌতম, মহানায়কের (তখনও শুধুই নায়ক) স্ত্রী ও আমার প্রায় সমবয়সী তাঁর পুত্র৷ তাঁরা এসেছেন, এবং উইন্ডামেয়ারে না উঠে অনুত্তম   অ্যালিসে  উঠেছেন,  কারণ  গৌতমের  জলবসন্ত৷  স্কুল  কর্তৃপক্ষ  চিঠি  দিয়েছেন একুশ দিনের মত ছেলেকে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে৷ সেই অন্য কোথাও, অভিভাবকদের বিচারে, কলকাতার স্বগৃহ না হয়ে দার্জিলিঙের হোটেল অ্যালিস ভ়িলা৷ সঙ্গে আছে নায়কের সেক্রেটারি, জনৈক শম্ভু৷ এসব কথা, জানাজানি হবার আগে, গৌতমই বলেছিল আমায়; তখনও তার চুমটি পড়েনি৷ অগত্যা, সুধীদার নির্দেশক্রমে এবং, আমার না হোক, আমার দশমাসের কচি ভাইটার খাতিরে, আমরা সারাদিন যথাসম্ভব বাইরে বাইরে কাটাতাম৷…

তখনও দার্জিলিং এখনকার মত ঘেয়ো, বাক্সসর্বস্ব, ঘিঞ্জি শহর নয় — খোলামেলা মল, স্টেপ-আ-সাইড দিয়ে নেমে গেলে বেহেশতের ঠিকানা৷ সারাদিনের ভাড়া করা টাট্টু নিয়ে, অথবা পদাতিক, আজ এ রাস্তা কাল ও রাস্তা চষে বেড়াতাম৷ সন্ধে বেলা ক্যাপিটলে সিনেমা, ইংরেজি ছবি থাকলে৷ জীবনানন্দের হালভাঙা নাবিকের মত, বাচ্চা নাবিক, বিদিশা শ্রাবস্তী দারুচিনি দ্বীপ দাপিয়ে বেড়াতাম সারাদিন৷ বাবা মা ভাই তখন স্যানাটোরিয়ামে শান্তিনিকেতনের বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন৷…

আমার গতিপথে সরল গাছের বন ছিল অনেক, ছায়াঘন, তার ফাঁকে ফাঁকে অনেক সম্ভাবনাময় ঝোপজঙ্গল; খেলনামাপের বাঁশঝাড়; শেওলায় সবুজ পাহাড়ের গা, জ্যান্ত গাছের মাটিতে শুয়ে পড়া গুঁড়ি আর আলগা পাথর; পাহাড়ি ফুল ঝুমকোলতার মত নতমুখ ফুটে থাকত থোকায় থোকায় — সেসব বিচিত্রবর্ণ ফুলের ছবি জল রঙে আঁকলে বিশ্বাস করবে না কেউ! কথায় কথায় উড়ো মেঘ এসে ওড়নায় ঢেকে দিত তাদের অবয়ব৷

এমন জায়গায় খুব মানাত সেই জোনাকিদের, তবু কোত্থাও তাদের দেখিনি!

পুরীর সামুদ্রিক হাওয়ায় জোনাকিরা উড়ে যায়; ঘিঞ্জি গলির অন্ধকারে, হৃদয়হীন পাথরের মন্দিরে তাদের মানায় না৷

কলকাতার বড় রাস্তায় বড্ড বেশি আলো আর নিরালোক গলিঘুঁজিতে দুটো মানুষই পাশাপাশি যেতে পারেনা, কয়েক কোটি জোনাকি তো কোন ছার!

দেওঘরে জোনাকি ছিল অনেক, বম্পাস টাউনের সার সার অবহেলিত দালানকোঠার জঙ্গুলে বাগানে, পেয়ারাতলায়, অস্পৃষ্ট আতা নোনার ফলসম্ভারে, হাস্নাহানা আর যুইঁয়ের সুগন্ধী ঝোপের আড়ালে, কিন্তু বিহারী জুগনু তারা, আমার চেনা কেউ নয়৷

কোথায় খুঁজবো তাদের, কোন নিরুদ্দেশে?

শান্তিনিকেতনে তারা ইচ্ছে হয়ে ছিল মনের মাঝারে, কিন্তু গুরুপল্লি বা শ্রীপল্লিতে নয়, ছেলেবেলাতেও নয়৷ তখন চাকরি করছি কয়েক বছর৷ সুবীর, আমার স্থপতি সুহৃদ, তখন আমার সহকর্মীও৷ লাটবাগানে তার বিভাগের ভাড়া করা ফ্ল্যাট ছিল আমাদের বাড়ি থেকে দু মিনিটের হাঁটা পথ, তবু আমাদের সঙ্গেই তার থাকা নাওয়া খাওয়া৷ আমার আত্মীয়েরা, পারিবারিক ও বিবিধ বন্ধুরা, তারও খুব পরিচিত হয়ে গেছে তত দিনে৷ এক সঙ্গে দিল্লি বেড়াতে গিয়ে আমার এক আত্মীয়ের বাড়ি উঠেছিলাম একবার, এবং তাঁদের যথেচ্ছ জ্বালিয়েছিলাম তিনজনেই (সঙ্গে টুকুও ছিল), নির্দ্বিধায়, নিঃসংকোচে৷ অসাধারণ মেধাবী ছিল সুবীর; অধীত বিদ্যা ছাড়াও যান্ত্রিক বৈদ্যুতিক বৈদ্যুতিন কারিগরিতে; হাতে গড়া মডেল বিমানের বেতার উড়ানে;  প্রাচীন,  ফেলে দেওয়া,  ডগলাস মোটরসাইকেল দুশো টাকায় কিনে, তিন মাসের মধ্যে স্বহস্তে সারিয়ে তুলে, স্টেটসম্যানের ভ়িন্টাজ কার প্রদর্শনীতে যোগ দেওয়ার প্রকল্পে; দুনিয়ার কল্পবিজ্ঞানের গল্পে তার জুড়ি মেলা দায়৷…কারখানায় দোল হোলি মিলিয়ে দুদিন ছুটি থাকত৷ সত্তরের দশকের শুরুর দিকে একবার তার মোটরসাইকেলে (ডগলাসের চেয়ে তরুণতর অন্য এক দেশি মডেল) হঠাৎ, উঠলো বাই, তো শান্তিনিকেতন চলে গেলাম দুজন, দোলের আগের দিন বিকেলে৷ উঠলাম দাদির শ্রীপল্লির বাড়িতে, অনাহুত, কিন্তু পরম আদরে ডেকে নিয়েছিলেন দাদি তাঁর স্বভাবসুলভ স্নেহে৷

পরদিন দেখি খোল দ্বার খোলএর মিছিলে নন্দিতা এবং দর্শকের ভূমিকায় আমার কলকাতার বন্ধুবান্ধব বেশ কয়েকজন৷ নন্দিতা আছে মানে, দেখা না গেলেও, অতীনও আছে কোথাও৷ তখনও দোলের শান্তিনিকেতনে যারা যেত তারা সম্পর্কের টানেই যেত, যেত ভালোলাগা আর পরিচয়ের নেশায়, গড়িয়াহাট বা শ্যামবাজার পাঁচমাথার মতলবি হুল্লোড় সঙ্গে বয়ে নিয়ে যেতনা৷ অমিতাদি বললেন, “মাকে এত জ্বালাস তোরা! দুপুরে তো বাড়িতে খাবি না, জানি, রাতে আমার ওখানে খাস৷” ভালোই হল, কারণ আমার সমবয়েসী চেনা স্থানীয়দের দেখা পাইনি সেবার, তাই অমিতাদির প্রস্তাবে বিনা ওজরে রাজি হয়েছিলাম৷

অবেলায় কালো করে এসেছিল আকাশ; হবি তো হ, পরিক্রমা শেষ হতে না হতে ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি নামল, ফাল্গুনেই কালবৈশাখী৷ বৃষ্টি ধরতেই অতীন বলল, “চ, কোপাই দেখবি চ”৷ দল বেঁধে গিয়ে দেখি, রক্তের নদী বইছে — সে দৃশ্য আগে কখনো ঠাহর করে দেখিনি, সে ভাবে দেখার মনটাই তৈরি হয়নি হয়ত৷ সাধে কি আনন্দ বাগচী তাঁর কবিতায় আলতার শিশি ভাঙলো, কোপাই কি শান্তিনিকেতনে লিখেছিলেন! অমিতাদির বাড়ি ডিনার মানে কাঁটায় কাঁটায় আটটা, তাই ঠিক হল ছটার সময় মিলব সবাই চৈতির সামনে৷

সেখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে অমিতাদির বাড়ির উলটোদিকের খোয়াই, শ্রীপল্লির রাস্তার ওপাশে৷ এখন সেখানে বিস্তর দোকান, আপিসঘর, নির্জনতা কেড়ে নিয়েছে; তখন একটা বাদে আর কোনো বাড়িও ছিল না৷ কাঁকুড়ে মাটিতে গোল হয়ে বসলাম সবাই, তৃষিত মাটি তখন বৃষ্টির সব জল নিঃশেষে শুষে নিয়েছে৷ অর্জুন গলা ছেড়ে আশায় আশায় ভালবাসায়, তোমার নাকি বিয়ে হবে গাইল, আমরা হাততালি দিয়ে হাসলাম সবাই; তারপর এ কথা সে কথা, এ গান সে গানের পর নয়নিকা বলে একটি মেয়ে, আগে কখনও দেখিনি তাকে, পরেও নয়, পূর্ণ চাঁদের মায়ায়  গাইল অসামান্য তৈরি গলায়৷ সে দেখতে কেমন, কি তার পরিচয়, এসব ভাবিনি৷ কন্ঠ দিয়ে সে একটা মায়ার জাল, পূর্ণ চাঁদের মায়ার জাল, বুনেছিল — যে চাঁদটা তখন স্নাত আকাশে একটা সরল প্রতীকের মত জ্বলজ্বল করছে; যে চাঁদ পূর্ণ হলেও আশৈশব আমি বলতাম পুরনো চাঁদ, চির চেনা, তবু নতুন চাঁদ, ফি-পূর্নিমায় নতুন করে ওঠে, জলে ধোয়া বসন্ত পূর্নিমায় আরো নতুন যেন! কোপাই তখন অনেক দূরে, দৃষ্টির আড়ালে, কিন্তু কল্পনায় তার রাঙা জলের ছলাৎছল শুনতে পাচ্ছিলাম৷ সেই মায়া, চাঁদের আলো আর সুরের মূর্চ্ছনা মাখা সন্ধ্যায় আসা উচিত ছিল তাদের, তবু সেই জোনাকিরা আসেনি৷

###

১৯ যা হারিয়ে যায়

সে যে ছড়া আছে না,

এক পয়সার তৈল

কিসে খরচ হইল?

তোর দাড়ি, মোর পায়ে

আরো দিছি ছেলের গায়ে।

ছেলেমেয়ের বিয়া হলো,

সাত রাত্তির গাওনা হলো।

কোন আবাগি ঘরে এলো

বাকি তেলটুক ঢেলে নিল?

… জীবনের বারো-চোদ্দ আনা খরচ করে ফেলে আজ আমি বাকি তেল টুকুর খোঁজ করছি! তেল তো তরল: উবে যায়, গড়িয়ে যায়, দাহ্য বলে পুড়েও যায়। নসিবের বা বহিরাগত আবাগিদের দোষ দিয়ে লাভ কি! তাছাড়া নসিব যেন গনৎকারের ধামাধরা!

আরও একটা আপ্তবাক্য আমাকে বিষম ধন্ধে ফেলে। চিত্তকাকার ছেলেবেলায় দেখা এক বরিশাইল্যা পাগল নাকি অন্যদের একটু বেচাল দেখলে বলত, “যত সব পাগলের বাসা, কলা খায় ছুইল্যা!” (চ-বর্গের পূর্বী ঢঙের দন্ত্য উচ্চারণ আর মহাপ্রাণের গিলে ফেলা হ বাংলা লিপিতে ফোটানো শ্রমসাপেক্ষ; কাজটা পাঠকের মর্জির ওপর ছাড়া রইলো।) আমিও দেখি, চারদিকের বিষয়ী সংসারী সফল যত মানুষ গোমড়ামুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কলাও খাচ্ছে ছুলে! তারা পাগল নয়তো কি?

হয়ত এককালে তাদের কেউ কেউ আমার খেলুড়ে ছিল, ছেলেবেলাটা বেদম হাসি আর পরিমিত কান্নার মধ্যে বড় হয়েছি সব, হয়ত অজান্তেই ভেবেছি তেমনি করেই দিন যাবে। আমি চেষ্টা করে হাসিটুকু বাঁচিয়ে রেখেছি, ঠিক; আমার সহখেলুড়েরা অনেকেই দরকারের চেয়ে বেশি সিরিয়াস হয়ে গেছে — এতটাই গম্ভীর যে আরেকটু হলেই বিবর্তনের পথে পিছু হঠতে হঠতে গোরিলা পর্যায়ে পৌঁছে যেত। তাদের কেউ কেউ ধর্ম খুঁজে পেয়েছে কেউবা অধর্ম; ভাগ্যগণনা রত্নধারণ পূজাপাঠ ইত্যাদিতে অগাধ বিশ্বাস তাদের। দুয়েকজনকে প্রশ্ন করে দেখেছি; তারা সোজাসুজি উত্তর দেয়নি তবে শরীরী ভঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছে যে প্রশ্নটা তাদের মনঃপুত নয়। আবার সেই চিত্তকাকা কথিত একটা মাহিলারার রোম্যান্টিক যাত্রার ডায়ালগের মত: নায়ক জিজ্ঞেস করলো, “জানালার পাশে একাকী বসি কি ভাবিছ রাজবালা?” নায়িকার ভঙ্গিমুখর উত্তর, “মরি এ কোন জ্বালা, এ কোন জ্বালা!”

সে যাকগে, আমি তো কলাই খাইনা, তার ছোলা না আছোলা! অর্থাৎ আমাকে পাগল প্রতিপন্ন করা শক্ত হবে।…

আগে এক সময়ে অ্যাভ়রো ৭৪৮ বিমানের অনেক উড়ান ছিল দক্ষিণ ও পশ্চিম উপকূলে, লাফানে উড়ান,  দুই  বা  তিন  লাফে গন্তব্যে পৌঁছোত৷ তেমনই  একটা  উড়ানে  মাদ্রাজ  থেকে ব্যাঙ্গালোর কিংবা কোচিন যাচ্ছি একবার — সম্ভবত তিরুপতি ছুঁয়ে৷ তড়িঘড়ি উঠেছি বলে নম্বরহীন আসনমালার ডানদিকের শেষ লাইনে জানালার সীট পেয়ে গেছি, অন্যটা খালি৷ ব্রীফ়কেসটা রেখেছি সেখানে৷ সে বয়েসে অবশ্যই আশা করতাম কোনও সুন্দরী সেই খালি আসনটা দখল করবেন হয়ত, কিন্তু মধ্যপথে উঠলেন এক দক্ষিণী ভদ্রলোক, মাঝবয়সী; আমাকেও বিরক্তিভরে বাক্স কোলে নিতে হল৷ বিমান ছাড়তে না ছাড়তে ভাব জমাতে শুরু করলেন৷

তিনি নাকি দেবরাজ অর্সের পোষা গণৎকার এবং, তাঁর গণনায়, অর্স অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী হবেন অদূর ভবিষ্যতে! আমার কার্ড চাইলেন৷ তারপর শুরু হল আমার নামের অক্ষরগুলো দিয়ে নিউমেরোলজির ব্যাখ্যান৷ সাতকেলে অবিশ্বাসী সেই আমাকেই শোনাচ্ছে ভূত ভবিষ্যতের সাতকাহন! অতীতের দশটা কথা বললে, কে না জানে, চার পাঁচটা মিলবেই৷ “তোমার জীবনে একটা বড় আঘাত এসেছিল কৈশোরে”…পিতৃবিয়োগ, এটা কাকতালীয় কিন্তু সত্যি৷ “অল্প  বয়েসে খুব বড় চাকরি কর তুমি”…আমার কার্ডেই তার হদিস৷ কিছুর মধ্যে কিছু নেই, হঠাৎ বললেন, “আরো বড় আঘাতের জন্য তৈরি থেকো, পঞ্চাশের কাছাকাছি, প্লাস মাইনাস তিন!” এটা মোক্ষম এবং মজাদার ভবিষ্যৎবাণী, তায় আবার হবু প্রধানমন্ত্রীর খোদ গণকের মুখনিঃসৃত, স্বকর্ণে শুনেছি বলেই — এবং অর্স যেহেতু প্রধানমন্ত্রী হননি — মনে ছিল৷ হাড়ে হাড়ে তার যাথার্থ্য টের পেয়েছি অনেক পরে ৷

জটিল রাবারের অণু বিস্তর ঘেঁটেছি; দরকার মত নির্দ্বিধায় ম্যানিপুলেট করা যেত তাদের, রামের সঙ্গে রহিমের ভাগ্য মিলিয়ে দিয়ে অচিন্ত্য নতুন গুণাবলী আরোপ করেছি অনায়াসে৷ মানুষ জাতটা রাবারের অণুর চেয়ে, আগেই জানতাম, অনেক অনেক বেশি জটিল, তবে অঙ্কের না হোক সমাজতত্ত্বের নিয়ম তো মানে! কিন্তু কর্মীদের যারা অঙ্গুলিহেলনে চালায়, সেই মালিকপক্ষ ও তার সাক্ষাৎ প্রতিনিধিরা, এই অধমও যার বাইরে নই, তারা সেই পাঁচ হাজার মানুষের চেয়েও বেশি জটিল, ডি.এন.এ.’র জোড়া ইশক্রুপের প্যাঁচের ওপর কয়েক গুণ! চড়াইয়ের রাস্তায় শত্রুর সংখ্যা বাড়ে, তাও জানতাম৷ যাদের উপকার করেছি তারাই যে বেশি শত্রু হয় তাও, বিদ্যেসাগর মশায়ের দৌলতে, অজানা নয়৷ তবে চেনা মানুষ, কাছের মানুষও যে কোথায় নামতে পারে তা বুঝিনি মোটেই৷ নিউমেরোলজিস্টের কথা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম কিন্তু ১৯৯৩এর শেষের দিকে, যখন আমার বয়েস সাতচল্লিশ, বিরোধীদের চাপে এবং বৃহত্তর দায়িত্বের নামে, নবকলেবর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ — রণাঙ্গনে যাঁদের দেখা দায় কিন্তু হোমারের গ্রীক দেবতাদের মত মরণশীল মানুষের বাঁচামরা যাঁদের হাতে — রাতারাতি কলকাতায় বদলি করলেন আমায়, নেইসাম্রাজ্যের এক্কা গাড়ির ঠুলি আঁটা ঘোড়াটার ভূমিকায়৷ হেড আপিসে ঠাইঁ হল একতলার টয়লেটের পাশের ঘরটায়, যেটা আগে ছিল কোম্পানি সেক্রেটারির কাগজপত্রের গুদাম৷ সেখান থেকে অবশ্য বাহুবলে সর্বোচ্চ তলার একটা ঘর দখল করেছিলাম আবার৷ সেসব ব্যাখ্যান নয়, আঘাতের ব্যাপারটা বোঝানো দরকার এখানে৷

সেই জোনাকিদের থেকে বহু দুরের একটা হাঁপিয়ে ওঠা, রং চটা, যক্ষাগ্রস্ত শহরে নির্বাসন আমার মত লোকের কাছে দ্বীপান্তরের চেয়েও বৃহত্তর আঘাত৷ ১৯৯৪-এর শেষের দিকে মুক্তির দরখাস্ত দিলাম, ১৯৯৫এর ফেব্রুয়ারিতে একতৃতীয়াংশ বেতনে যোগ দিলাম অন্যত্র৷ তারপর আর কারখানার চৌহদ্দির ছায়া মাড়াইনি কখনো৷

যতই নির্লিপ্ত হই, খেদ থেকে যায়৷

পঞ্চিপিসির খোঁজ করিনি আর৷ আমার এলেবেলে স্কুলের এক সুন্দরী, বড় হয়ে বিমান বালিকা হয়েছিল; একটা উড়ানে তার ফোন নম্বর দিয়েছিল পুরনো দিনের খাতিরে৷ যোগাযোগ করিনি৷ সুভাষ কুলকার্নির সঙ্গেও আলাপটা ঝালাইনি৷ সে সবই আমার দোষ, মানি৷ চুয়াড় জাতির প্রতিভূ, গোবিন্দ, সেই এক ফসলের পর আর আসেনি৷ ঘরে তৈরি রাজাভোগ, পান্তুগোল্লা  খাবার নিমন্ত্রণ করে ফটিকবাবু চিরকালের জন্য চলে গেলেন৷ আলতার শিশি ভাঙা খোয়াইয়ের পূর্ণিমায় নয়নিকা আর কোনও দিন গান শোনালোনা৷ সুবীরের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ হয়েছিল ইদানীং — সেটা দেখাসাক্ষাতে পরিণত হওয়ার আগেই সে তড়িঘড়ি চলে গেল নিরুদ্দেশে, তর সইলনা৷ সেই জোনাকিরা যে ফিরে এলোনা আর, সেসবও কি আমার দোষ?

আসলে সারা বেলা হেলা ফেলা দেখে কোন আবাগি যেন আমার অজান্তেই বাকি তেলটুকু ঢেলে নিয়ে গেছে; ভারি তো এক পয়সার তৈল!

শেষ

Other posts in <aniruddhasen.wordpress.com> and <apsendotcom.wordpress.com>





সেই জোনাকিরা (১৩–১৫) ৷৷ অনিরুদ্ধ সেন

3 05 2013

There are 19 sections of these memoirs, divided into 6 posts, this being the fifth.

১৩ বন কেটে বসত

আমার স্কুল জীবন শুরু হয়েছিল উনিশ শো একান্নর গোড়ায়; বারো নম্বরের পেছবাগান তখন নানান মরশুমি ফুলে ঝলমল করছে৷ চার বছর পুরে সবে দুমাস হয়ছে৷ চেনাদের মধ্যে এ পাড়ার ননতু, হেদর, ক্যারল, হাসি৷ তা ছাড়া বেপাড়ার সুজিত, বাপি আর আর ইলাকে আগেই চিনতাম৷ অন্যেরা সব আনকোরা৷ যে রাস্তায় আমার ট্রাইসাইকেল অ্যাডভেঞ্চর, স্কুলগামী   রিকশা  সে  পথ দিয়ে আরো  অনেক দূর,  বাজারের  পাশে  বাগদিপাড়া  রোড  হয়ে, কারখানার পাচিল ডানহাতে রেখে চলছি তো চলছিই…হঠাৎ একটা বাঁক নিলে কারখানার প্রধান ফাটক, তারপর ডাইনে ঘুরে ময়দান আর ক্লাব হাউস, তারও পর স্কুল৷ কম রাস্তা? একেক পিঠে প্রায় সিকি ঘন্টা! কারখানার ভেতর দিয়ে গেলে সময় বাঁচে অনেক কিন্তু বিধি, অর্থাৎ আমার পিতৃদেব, বাম; “আমার ছেলেকে আনডিউ অ্যাডভ়ান্টেজ নিতে দেবনা!”

এলোপাথারি ম্যাকিউলার ডিজেনারেশনের মত এখন আমার স্মৃতিপটের অনেকটাই পোকায় খাওয়া, নাম ভুলে যাই, মুখের সঙ্গে নাম মেলাতে পারিনা, আগে পরে পারম্পর্যে বিস্তর গোলমাল৷ তবু যেন মনে হচ্ছে, হেদর আর ক্যারল ছিল আমার প্রথম রিকশা সহযাত্রী, পরে তাদের বদলে ননতু৷ আনটি ডি’ক্রুজের স্বামী ছিলেন, পরে জেনেছি, কোম্পানির ওয়ার্ক স্টাডি বিশেষজ্ঞ, থাকতেন ক্লাব হাউস পেরিয়ে বাঁহাতি রাস্তায়, যার দুপাশে সার সার স্টাফ় কোয়ার্টার নতুন ধোবিখানা অবধি (তখনও তৈরি হয়নি)৷ পোর্টুগীজ় গোয়ার এই তরুণ দম্পতি ছিলেন অতিশয় ভদ্রলোক; তাঁদের প্রথম সন্তান, ব্রেন্ডা, তখন সবে হয়েছে, তাকে প্র্যামে শুইয়ে স্কুল চালাতেন আন্টি, গোড়ার দিকে তাঁকে সাহায্য করতেন তাঁর মা — তাঁকে আমরা টীচর বলতাম৷ বি ব্রেন্ডার চুষিকাঠি মুখে দিয়েছিল একদিন, ননতু অমনি নালিশ করলো, “আন্টি! আন্টি! বি ব্রেন্ডা মিল্ক!” বুঝতে অসুবিধে হয়নি কারু৷

যখন এই অবাক দুনিয়ার সিংদরোজা আমার চোখের সামনে ধীরে ধীরে খুলছে, ছুটি পড়লেই বরং কেঁদে কেটে অস্থির, ঠিক তখনই ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ার মত একটা বাজে অসুখ ধরলো আমার! তার একটাই সুফল — সপ্তাহাধিক কাল, হয়তো দ্বিসপ্তাহাধিক, মায়ের সঙ্গে শোওয়া, সেখানে তাঁর স্নানশেষের উষসী পাউডারের সুবাস, হেজ়েল স্নো, ওটিন ক্রীম, অগুরু সেন্ট৷ বাইরে যেতে গেলে অবশ্য বিলিতি কমপ্যাক্ট আর সন্তর্পণে খরচ করা শ্যানেল ফ়াইভ়৷ তোয়ালে জড়িয়ে মা আমার মাথায় আইস ব্যাগ দিচ্ছিলেন একদিন, পাশে দাঁড়িয়ে ঊষা কাকিমা, দরজার কাছে উৎকন্ঠিত বাবা — এই দৃশ্যটা মনে আছে আমার৷

বছর তিনেক পড়েছি কি পড়িনি, নতুন ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ভাব হয়েছে: রতন সেনগুপ্ত, নাম করা ভালো ছেলে; আমি পড়া না পারলে মাকে বলতাম, “আমিও পড়া পারিনি, রতনও পড়া পারেনি!” কলেজ শেষ করেই সেই যে গেল, অ্যামেরিকাতেই পাকাপাকি থাকে সে; অধুনা ই-মেলেই যেটুকু যোগাযোগ৷ ইলা চোংকার; তিন বোন তারা — শীলা, ইলা আর নীলা৷ দিদি শীলা পরে একবার ইভ়জ়’ উইকলির ভারত সুন্দরী হয়েছিল৷ গৌতম, ফোটোগ্র্যাফ়ার অমর সেনের ছেলে, সে বোধহয় কিছুকাল থাকত চোংকারদের সঙ্গে; কলকাতার সাকিন ছিল লেক মার্কেটের কাছে৷ আর্কিটেক্ট ইয়ং সাহেবের ছেলে, জনি, যে দেশে ফিরে গিয়ে পরে ইশকুল মাস্টার হয়েছিল; ছুটিতে শা’গঞ্জে এসেছিল একবার, দেখা হয়নি আমার সঙ্গে৷ কলিন বাটারউইক — চোখে মুখে কথা বলত, চ্যাটারবক্স৷ ক্ষণস্থায়ী সুভাষ কুলকার্নি — লিখতে বসে হঠাৎ মনে পড়ল নামটা৷ সে কে, কোত্থেকে এলো, কোথায় গেল, কিচ্ছুটি মনে নেই, শুধু মনে আছে ভালো লেগেছিল তাকে৷ আরো কত কে!

এমন  সময়  বিনা  মেঘে কামলায়  ধরল আমাকে,  বিলিরুবিন  বলে কি একটা যেন নাকি তুঙ্গে, চোখ-চামড়া-নোখ সেই টিয়াপসন্দ সূর্যমুখীর মত, কেঁদো বাঘের মত হলুদ — শার্দুল শার্দুল উজ্জ্বল জ্বলছে!

ইত্যবসরে বড়রা তাঁদের অভিরুচি মত নতুন এস্টেটে স্থানান্তরণের বন্দোবস্ত করছিলেন, আলোচনা শুনেছিলাম আগেই৷ আমার স্কুলে যাবার যে পথ কারখানার প্রধান ফাটক থেকে ডাইনে বেঁকেছে, সেটাই মিলেছে ফাটক থেকে নাক বরাবর এক কিলোমিটর গিয়ে জি.টি. রোডের সঙ্গে৷ রাস্তাটা আগেও ছিল, তবে ইয়ং সাহেব ভেবেচিন্তে চওড়া করেছেন সেটা, আর তার নামকরণ হয়েছে লিঙ্ক রোড৷ জি.টি. রোড যেতে তার বাঁ দিকটা ফাঁকাই বলা যায়, কিছুটা জল কিছুটা ডাঙা, বাদা আসলে, দুএকটা বোর ওয়েলের ইটের ঘর৷ ডানদিকটায় প্রথম সারিতেই অনেকগুলো দোতলা, পয়েন্টিং করা ইটের বাড়ি, ঝকঝকে নতুন হাসপাতাল, নতুন টেনিস এন্ড সোশল ক্লাব৷ আরো ভেতরের সারিগুলোর জায়গায় জায়গায় অ্যাটাচড একতলা স্টাফ় কোয়ার্টার সব, আর অপারেটরস’ ফ়্যামিলি কোয়ার্টার, লাইনের পর লাইন৷ প্রথম সারির বাড়িগুলোর সব কটাই তখন জোড়ুয়া ভাইয়ের মত সমদর্শন—প্রতি তলায় দুটো করে ফ্ল্যাট; শুধু হাসপাতাল থেকে স্কাউটস’ ডেন অবধি পাঁচটা বাড়ির প্রতিটি ফ্ল্যাটে একটা করে বাড়তি সান বারান্দা — শীতকাল ছাড়া রোদ পোয়ানোর দরকার এমনিতে নেই কিন্তু এই দক্ষিণমুখী জালে ঢাকা বারান্দাটা হাওয়া ঘরের মত, আবার ঘোর বর্ষায় দরকার মত কাপড় শুকোত অনেকে৷ বাবা বলতেন, “ঘরের জাঙিয়া ঘরেই থাক না!” বস্তুত, পেছনের নির্জাল লম্বা বারান্দাতেও লোক না দেখিয়ে স্বচ্ছন্দে কাপড় শুকোনো যেত৷ আমাদেরটা ছিল স্কাউটস’ ডেনের আগে উন-অন্তিম বাড়ির দোতলায় ১১৬ নম্বর ফ্ল্যাট৷

###

১৪ পদ্মখাকির দল

শা’গঞ্জের নামকরণ হয়েছিল বাংলা বিহার ওড়িশার মুঘল শাসক শাহ আজ়িমের নামে, যাঁর পোশাকি নাম আজ়িম উশ শান৷ প্ৰথম বাহাদুর শাহের ছেলে তিনি, ঔরঙ্গজ়েবের নাতি৷ কোনো যুদ্ধে একদা শিবির ফেলেছিলেন এই তল্লাটে৷ তার আগেও বর্ধিষ্ণু ছিল গ্রামটা, বাঁশবেড়ের মতই সাবেক সাতগাঁর এক গাঁ, তবে আগে তার কি নাম ছিল তা নিয়ে অনেক সংশয়৷ সরস্বতী মজে যেতেই সাতগাঁর হাঁড়ির হাল৷ বর্ধিষ্ণু বেনেরা মালকড়ির খোঁজে সাতগাঁ ছেড়ে চাটগাঁ (তৎকালীন পোর্টুগীজ় বানানেও প্রায় একাকার নাম দুটো, Catgao আর Catigao), ঢাকা, মালদা, মুর্শিদাবাদ, মায় কলকাতায় ছড়িয়ে গেল৷ চতুষ্পাঠী টোলগুলো তার পরের শিকার: এক বাঁশবেড়েতেই অনতিঅতীত একদা চল্লিশ ঘর টুলো উপাধ্যায় ছিল বলে কানাঘুষো৷ ইংরেজ আমলে আজ়িমের কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল পাবলিক; সেই সুযোগে জায়গাটার নাম হয়ে যায় সাহাগঞ্জ — কয়েক ঘর স্থানীয় সাহা যারা ছিল তারা সে’নামের দাবি রাখেনি কখনও৷ বিভূতিভূষণ তাঁর দেবযান উপন্যাসে শা’গঞ্জই লিখেছেন — শা’গঞ্জ-কেওটা — কেওটা মানে কেওট (কৈবর্ত) পাড়া৷ তা লিখতেই পারেন, একদা কিছুদিন এ তল্লাটে ছিলেন তিনি, অপুর কিশোর বয়েসে; প্রসন্ন গুরুমশাইয়ের পাঠশালা নাকি এখানেই ছিল!

সেনাশিবিরের দৌলতে শা’গঞ্জ বাঁশবেড়ের সঙ্গমে, যার নাম এখন খামারপাড়া, গড়ে উঠেছিল একটা অবধারিত বেশ্যালয়৷ সৈনিক আর বেশ্যা, দেবসেনাপতি উভয়েরই আরাধ্য৷ সেই সুবাদে, পাঁজি দেখে নয়, কৃত্তিকা নক্ষত্রের নামে যে কার্ত্তিক মাস, তার শেষ দিনে এখনও ধুমধাম করে হয় কার্ত্তিকেয়ের পূজা, বারোয়ারি উদ্যোগে৷ তাও একটা দুটো নয়, গণনাতীত! কাত্তিক ঠাকুরের চেহারার রকমফের দেখে ধাঁধা লেগে যায়: খোকা কাত্তিক, ধেড়ে কাত্তিক, দরওয়ান কাত্তিক, এক কানে দুল পরা ঢলানে কাত্তিক (সম্ভবত গে!), বরাঙ্গনা বারাঙ্গনা পরিবৃত লম্বা জুলপি কানে মাকড়ি হাতে লোহার বালা কোমরে ভোজালি মাচো কাত্তিক, এবং দেবানন্দ ব্রুস লী মার্কা কাত্তিকও দেখেছি৷ এখন হুজুগটা হুগলি চুঁচড়ো এবং বাকি বাংলায় ছড়িয়ে গেছে৷ আর আলকাৎরায় লেখা গৃহস্থের বাড়ি নামাঙ্কের সন্দেহজনক পাড়াটা আমার স্মরণকালেও ছিল — সে পাড়ার সত্যিকারের গেরস্তরা গোরে মালা হাতে, আতর সুরভিত, প্রায়-মাতাল রসিকদের হাত থেকে পরিবারের মহিলাদের রক্ষার্থে বাড়িময় লিখে রাখতেন তাঁদের শুচিতার বিজ্ঞাপন!

বারো কোয়ার্টারের অবস্থান শা’গঞ্জের উত্তর-পূর্ব কিনারায়৷ গেট থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় পড়ে ডানদিকে কিছুটা গেলে কারখানার ফাটক৷ বাঁদিকে খামারপাড়া, প্যালেস বোর্ডিং, তার উল্টোদিকে গন্ধেশ্বরী ঘাট৷ সেসব উজিয়ে বাঁশবেড়ে৷ বাঁশবেড়ের ওবাগে দেবরায়দের বাসুদেব (প্রাচীন) আর হংসেশ্বরীর (অর্বাচীন) মন্দির৷ মন্দিরের আশেপাশের ময়রারা খাসা মাখা-সন্দেশ বানাতো, দানা দানা; তেমনটি আর খেলামনা!

তারপর, দরাপ খাঁ গাজির ঢিপি পেরিয়ে, ত্রিবেণী৷ সেই খাঁসায়েব — তুর্কি জ়াফর খাঁ গাজ়ি (ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতক) — যিনি শেষ জীবনে ভুলভাল সংস্কৃতে গঙ্গাস্তোত্র লিখতেন: সুরধুনি মুনিকন্যে…  জাতধম্মের অত্যাচার চরমে পৌঁছনোর আগে অবশ্যই সম্ভব ছিল সেটা, আজ হলে এম.এফ়.হুসেনের দশা হত, অন্যথায় মৌলবিদের রক্তচক্ষু, হয়ত দুটোই! বাঁশবেড়ের মাঠে রথের মেলা বসত তখন: থালার মত বড় পাঁপড়ভাজা আর দাঁতভাঙা গুজিয়া-কটকটি (বাসি সন্দেশ বেশি করে চিনিতে জ্বাল দিয়ে আধ বিঘৎটাক লম্বা কাঠির মত গড়ে একটু তিল ছিটিয়ে তৈরি হত দাঁত ভাঙা কটকটি) খেয়ে, চাকাওয়ালা মালসার ওপর ব্যাঙের চামড়া লাগানো দড়িটানা খ্যাঁচকাঠির ট্যামটেমি, কিংবা টিনের চোঙের দুপাশে নকল চামড়া আঁটা ঢোল, এবং বাঁশের-কাঠির-ওপর সাঁটা মৃগিগ্রস্ত তালপাতার সেপাই কিনে বীরদর্পে ঘরে ফিরতাম৷

আমাদের বারো নম্বর বাড়িতে সোফা সেটি; সেন্টার টেবিল; পেক্স স্টুল; দম দেয়া বাক্স গ্রামোফোন (রেড উডের বডি, সবচেয়ে ওপরের প্রকোষ্ঠের হিঞ্জ করা ডালাটা ষাট ডিগ্রি কোণ করে খুলত — ডালার মাঝখানে প্রভুর বশংবদ সারমেয়ের ছবি, টার্ন টেবলের এক পাশে পিন রাখার আর বাতিল পিন ফেলার জায়গা, অন্য পাশে ষোলো থেকে আটাত্তর আর.পি.এম. অব্দি ঘূর্ণি পাল্টানোর ডায়াল, বাক্সের তিনটে প্রকোষ্ঠের মাঝেরটায় চোঙ্গার বদলে একটা তসরে ঢাকা চৌকো অংশ — বাবার ভাষায় গ্লাস-ডায়াফ়্রাম স্পিকার — সেটা যে কি জন্তু তা কে জানে! নিম্নতম প্রকোষ্ঠে রেকর্ড রাখার ব্যবস্থা); মায় আমার চেন-স্প্রকেট ওয়ালা বিলিতি ট্রাইসাইকেল — সবই ছিল, জীবনানন্দের অমোঘ ভাষায়, ব্যবহৃত, ব্যবহৃত, ব্যবহৃত…, বিদায়ী সাহেবদের থেকে কেনা৷ শুধু আমার দুলুনি ঘোড়াটা আনকোরা; অবরেসবরে সেই ঘোড়ায় পালা করে দুলত সবাই, সমবয়স্ক কারু জন্মদিনে গমগমে আওয়াজের সেই বাক্স-গ্রামোফোনটার চাহিদা ছিল খুব — বিবিধ ঈর্ষান্বিত মন্তব্য (বাট নট সো পোর্টেবল লাইক আওয়ার অ্যাটাচি-সাইজ়়ড ওয়ানস!) সত্ত্বেও৷

বারো কোয়ার্টারের চত্তরে বারোটা একতলা বাড়ি, মেলাই ছেলেমেয়ে, তার মধ্যে আমার কাছাকাছি বয়েসের বিজগুড়িরা আধ ডজনের বেশি তো বটেই! আমরা ক’জন আন্টি ডি’ক্রুজ়ের এলেবেলে স্কুলে যেতাম শম্ভুর মাসকাবারি রিকশায়৷ মাঝেমাঝে পাগলা সুন্দরলাল তার বদলি খাটত৷ (সুন্দরলাল সত্যিই পাগলা: শরৎ সরণির অন্ধকারে হিসি করতে নেমে ডানহাতে সাপের ছোবল খেয়েছিল; বাঁহাতে বিষাক্ত সাপটার ফনা মুঠিয়ে ধরে, রিকশা চালিয়ে, সোজা কোম্পানির হাসপাতাল!) অন্যেরা যেত কোম্পানির বাংলা স্কুলে, পঞ্চিপিসির সঙ্গে, পদাতিক৷ পঞ্চিপিসির ছেলেছাঁট চুল ও পরনের কাপড় দুইই সাদা৷ ছোটখাটো মানুষটা ঝুঁকে পড়লেও শক্তপোক্ত৷ প্রত্যেকটি ক্লাস ঝাড়পোছ, হেডমাস্টারের নোটিস এ ক্লাস ও ক্লাসে চালাচালি আর সময়মত ঘন্টা বাজানো ছিল তার কাজ; পরীক্ষার সময়ে ওপর টেইম!

খোলা আকাশের নিচে, সবুজ-দেয়াল সবুজ-গালিচার খেলাঘরে, বেমিশাল আনন্দ ছিল তখন: স্বাধীনতার আনন্দ, বড়বেলায় যার খোঁজ পাইনি আর৷ রঙন ফুলের মধু চুষতাম আমরা, বড়কাকিমাদের লংকা জবারও৷ মৃত্যুঞ্জয় মুখার্জির যমজ মেয়েরা, বড়ি আর ছুটি, বলত, “কলকে ফুলের মধু খাসনি, বেজায় বিষ!” আমরা তাও চুষতাম৷ হাঁটুতে মার্কিউরোক্রোম, কনুয়ে মার্কিউরোক্রোম, কখনও সখনও লাল ওষুধের বদলে গাঁদা পাতার হাতে ডলা রস, কারুকারু কপালে স্টিকিং প্লাস্টার (ব্যান্ড-এড তখনও দেখিনি), আলুথালু চুল, প্যান্টের বাইরে শার্টের লেজ, ধুলোমাটি মাখা তো ছিলই!

সে সব ছেড়ে যাওয়া সহজ?

তবু ছেড়ে যেতে হল, যেতে হবে তাই৷

###

১৫ গুপ্তধনের খোঁজ

নতুন এস্টেটের সামনে দিয়ে একটা চওড়া রাস্তা, লিঙ্ক রোড, কারখানার গেট থেকে বেরিয়ে পূব পশ্চিম নাক বরাবর জি.টি. রোডে পড়েছে৷ পূব দিক বাদ দিলে তিনদিকেই এক ইটের পাঁচ ইঞ্চি দেয়াল, সাইন কার্ভ়ের মত ঢেউ খেলানো, যাতে হাওয়ায় পড়ে না যায় — আর্কিটেক্ট ইয়ং সাহেবের অনবদ্য সৃষ্টি৷ তাঁর ছেলে জন আমাদের সঙ্গে পড়ত, থাকত সাহেবদের জন্য বরাদ্দ কমপাউন্ডে — বিলাসের অমরাবতী৷…

লিঙ্ক রোডের (রাস্তার নামগুলো ক্যাজুয়ারিনা ওয়াক, ক্যানা অ্যাভ়িনিউ ইত্যাদি — মদীয় পিতৃদত্ত; একটা বিশুদ্ধ দেশি নাম, শিরিষ গাছে সমৃদ্ধ শিরিষ বীথিকা, অবশ্য ধোপে টেঁকেনি) উত্তরে দোতলা বাড়ি সব, নিচে দুটো ওপরে দুটো ফ্ল্যাট৷ ঠিক সার বেঁধে নয়, গায়গায়েও নয়, জায়গাটার  ভূগোল মেনে, যথাসম্ভব গাছ না কেটে, সন্তর্পণে উপস্থাপিত, যাতে খামোখা খটকা না লাগে৷ বাড়িগুলোর সামনে পায়ে চলার জন্য ইটের পথ, লিঙ্ক রোডের সমান্তরাল; তা থেকে সমকোণে গৃহাভিমুখী অনুরূপ পথ প্রত্যেক বাড়ির সামনের লম্বাচওড়া লনগুলোকে দ্বিখন্ডিত করছে৷

মেহেদির বেড়ায় ঘেরা লনে আমরা বড়-হয়ে-যাওয়া খেলা খেলতাম: ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, পিট্টু, আর ট্রাইসাইকেল সজোরে চালিয়ে পেছনের একটা চাকা শূন্যে তুলে দ্বিচক্র ব্যালান্সের খেলা৷ ওই লনে আমি বাইসাইকেলও চালাতে শিখি: ম্যানজ়েল এঞ্জেলো, স্টিভ়েন পেট্রোজ়া আর জ্যাকি স্টিফ়্ল্ (স্ত্রীং!) আমার এক রাশ কমিক ধার নিত — পড়তে যতক্ষণ লাগে তাদের চোদ্দ কিংবা ষোলো ইঞ্চি সাইকেল ততক্ষণ আমার৷ ফ্ল্যাটগুলোর পেছনে, বাগান আর নয়ানজুলি পেরিয়ে স্কাউটস’ ডেনের মাঠ, সেটা পেরিয়ে আরো কিছু নির্মীয়মান কোয়ার্টার আর ৮৪ একর সদ্য কেনা অনাঘ্রাত জঙ্গল৷ কুন্ডুদের জায়গা ছিল আগে, তখনও ছিল তাদের চাকর মহলের ধ্বংসস্তুপ এবং খিড়কির মজে আসা পুকুর — লোকে কুন্ডু পুকুর বলে৷ সেখানে আমরা গুপ্তধনের খোঁজে বিস্তর খোঁড়াখুঁড়ি করতাম৷

আমার ন’বছরের জন্মদিনে মা কিনে দিয়েছিল একটা ডায়ানা এয়ার রাইফ়ল, ভ়েরি এক্সপেন্সিভ়, ২৫ টাকা! তবে লিডারশিপের জন্য দুর্দান্ত৷ আমার ভাই আমার চেয়ে প্রায় দশ বছরের ছোট; তার জন্মের সময়, ১৯৫৬-তে, বাবা দিলেন বয়ঃপ্রাপ্ত চব্বিশ ইঞ্চি এভ়ন সাইকেল (অনেক দিন হাপপ্যাডেলে চালাতাম), আজ মনে হয় হয়ত ঘুষ হিসেবে৷ এ-দুয়ের মণিকাঞ্চন যোগেও আমার ভবিষ্যৎ নায়কত্ব পাকা হল না!

১৯৫৪-র মাঝামাঝি থেকে আমরা নতুন এস্টেটের ১১৬ নম্বরে৷ জনডিসের জন্য প্রায় একবছর গৃহবন্দি থাকার পর ১৯৫৫-র জানুআরিতে কোম্পানির বাংলা স্কুলে ভর্তি হলাম, পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ক্লাস ফ়াইভ়ে৷ মলয় বাদে ক্লাসের সব্বাই পুরনো, কিন্তু আমার কাছে বুলটু, পতাকী, শঙ্কর, জাপান, পাঁচুগোপাল কান্ডি, সুভাষ, বিমান, দুই দীপালী, চম্পা, ছন্দা, আরতি, প্রণতি — আনকোরা নতুন৷ মলয় করও আমার মত সেবারই ভর্তি হল কলকাতা থেকে এসে৷ শুধু টাইফয়েডে বেদম ভুগে নতুন করে ভর্তি হল আলো বলে একটা মেয়ে — আলো মজুমদার; স্বভাবতই তার সঙ্গে আমার ভাব হল বেশি৷ কিন্তু মেয়েদের সঙ্গে ভাব করে লাভ নেই: তারা ফুটবল ক্রিকেট ডাঙ্গুলি লাট্টু খেলতে চায়না, পারেওনা; অগত্যা…!

বলতে দ্বিধা নেই, আমার প্রাণের বন্ধু ছিল কানাই হালদার — ঈশ্বরবাগে বাড়ি, তার বাবা কোম্পানির শ্রমিক৷ কত কি শিখেছি তার কাছে — অমোঘ চার আর অব্যর্থ টোপের সুলুক সন্ধান: সর্ষের খোল, মেথি, দুধের সর (অভাবে লুকিয়ে চুরিয়ে বুগনুর কাউ এন্ড গেটের এক খামচা মহার্ঘ্য গুঁড়ো দুধ … মাছ যাবে কোথায়!), আরও কত কি সব ঘিয়ে ভেজে তৈরি সেই গোপন ফর্মুলার চার, ছিপ ফাৎনা বঁড়শি বাঁধা, খ্যাঁচ মারার টাইমিং; নারকেল তেল আর কস্টিক সোডা মিশিয়ে গোলা-সাবান তৈরি; নানান জংলি গাছগাছালির গুণাগুণ… ঋণের শেষ নেই!

প্রথম হেডমাস্টার ছিলেন যিনি, তাঁর নাম মনে নেই তবু তাঁর বিরলকেশ, প্রবীণ চেহারাটা চোখের সামনে ভাসে৷ কমাস বাদেই এলেন জিতেনবাবু, সতীদির বাবা; কয়েক বছর পর কোনও কারণে তাঁকে চাকরি ছাড়তে হয়৷ তদ্দিনে অবশ্য আমি চুঁচড়োর স্কুলে৷ দু-বছর মাত্র ছিলাম, কিন্তু মায়ায় জড়িয়ে ছিলাম তার চেয়ে ঢের বেশি৷

এই পর্বে আমার দিগন্ত অতি দ্রুত পিছু হটছিল৷

সামনের সর্পিল পাচিল আর পেছনে, স্কাউট’স ডেনেরও পেছনে, চুরাশি একর জঙ্গল পেরিয়ে; বাঁশবেড়ের হংসেশ্বরী-বাসুদেবের মন্দির ছাড়িয়ে ত্রিবেণীর গাজির ঢিপির কাছ বরাবর; উল্টোবাগে পুরনো পোস্টাপিস, পেরেক কল, ব্যান্ডেল চার্চ, হুগলি বালির মোড়, চকবাজার ডিঙিয়ে ওলন্দাজদের শহর চুঁচড়োর ঘড়ির মোড় অবধি৷ বন্ধুদের সংখ্যাও জ্যামিতিক হারে বাড়ছিল, ইশকুলের বা পাড়ার বন্ধু ছাড়াও এদিক ওদিক সেদিকের বন্ধু৷ যদিও, কোনো কারণে, অবশ্যই আমার নিজেরই দোষে, আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুর সংখ্যা চিরকালই কম; এখন যত তখনও প্রায় ততজনই৷ সম্পর্কের গন্ডি বাড়তে থাকলে, এবং চোখ কান মনের দরজা হাট করে খুলে রাখলে, মানব বৈচিত্র্যের একটা ঝাপসা মত আন্দাজ পাওয়া যায়, যে আন্দাজ অনেকের পরিণত বয়সেও অকুলান৷ সেটা মানুষের দোষ নয়, ইন্দ্রিয়ের অসুখ; একরকম অন্ধত্ব, বধিরতা; দরজা খোলার মত কাজে আলস্য৷ তা ছাড়া, তখন আমাদের টিউশনের চাপ, গান শেখা, ক্রিকেট শেখার, পেট থেকে পড়েই ডাক্তার এঞ্জিনিয়ার আই.এ.এস. বনবার বাড়তি চাপ ছিল না, তাই হয়ত নিজেরা নিজেদের মত ইচ্ছেশিক্ষা করতে পারতাম।

একদিকে, সেই ব্যাঙের কুয়োর মত বদ্ধ দুনিয়ার নিম্নতম থেকে সর্বোচ্চ স্তরের স্ব-স্ব চেহারা আর তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, অথবা সম্পর্কের অভাব — কয়েকটি ধানের শিসের উপর কয়েকটি শিশির বিন্দু — নিজের চোখে দেখতে আর চিনতে শিখলাম, একটু একটু করে — শিশু যেমন আস্তে আস্তে অ-আ-ক-খ শিখে তারপর যুক্তবর্ণে উন্নীত হয়, চেলাগিরির সময় পোটো যেমন আগে আধমাটির কাজ শিখে বয়সকালে দুগ্গা গড়তে শেখে৷ চরিত্র পাঠে অবশ্য কাজের কাজ কিছু হয়না, বরং ক্ষতি অনেক, সাত পাঁচ দেখে তখন মনে দশ রকম অকারণ ভয় জন্মায় — সম্পর্ক গড়ার ভয়, সম্পর্ক ভাঙার ভয়, মানুষকে অজান্তে আঘাত করে ফেলার ভয়, অন্যের ক্ষতি করে নিজের আখের গোছানোর অব্যক্ত আশংকা! অন্যদিকে বই পড়া জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তবকে মিলিয়ে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম ওই অল্প কয়েকটা বছর৷ লাভের মধ্যে কেবল জটিল বীজগনিতের মত অনেকগুলো সমাধান সুত্র আমার মনের মধ্যেই জড়ো হয়ে গেছে, চাই বা না চাই; তাতে আখেরে লাভ হয়না, তবে লোকসানও নেই কিছু। এখন, বয়সকালে, হাতে যখন অঢেল সময়, সেই সব গাণিতিক সমাধান অনেকখানি একলা সময়ের মধ্যে মনের মধ্যে যৌবনের ভোমরার মত গুনগুনিয়ে ওঠে থেকে থেকে; ভাগ্গিস কেউ মন পড়তে পারে না!

সেই যে অসিত হালদারের ছড়া আছে না —

আহ্লাদি পুতুলের তিনটি ছেলে

খিদে পেলে খায় না কো মাকে ফেলে

কাঠখোদা কুকুরের বড় করে ভয়

তাই তারা সর্বদা মা’কাছে রয়

 তাদের মত ঘরকুনো, মা ঘেঁষা হলে আজীবন কাঠখোদা কুকুরদের ভয় করে চলতে হত। (প্রসঙ্গত, আরেকটা মা ছেলের ছড়া হঠাৎ মনে পড়ল —

পাঁচির মায়ের পাঁচটি ছা

পাঁচটি ছায়ের পাঁচটি পা

পাঁচটি পায়েই পাঁচড়া ঘা!

—  কার লেখা মনে নেই তবে বেশি মা ঘেঁষা হলে দেখছি চর্ম রোগও হতে পারে!)

কুন্ডু পুকুরের অনতিদূরে একটা ইটের ইমারতের ধ্বংসাবশেষ থেকে পাঁচটা রং জ্বলা কড়ি আর গোটা দুই প্রাচীন, কলঙ্ক ধরা তামার পয়সা পেয়েছিলাম একবার, পিটর আর আমি; সে কোন কালের কে জানে! বিস্তর খোঁড়াখুঁড়ি করতে হয়েছিল ওইটুকু প্রত্ন লাভের জন্য। পিটরের ইচ্ছে ছিল কোদাল গাঁইতি নিয়ে আরো গভীর করে খুঁড়ে দেখে; বর্ষা নেমে যাওয়ায় তা আর হয়ে ওঠেনি৷ তার পর পিটর অনিচ্ছায় যেখানে পৌঁছে গেল, সেখানে গুপ্তধনের কোনও দরকার হয়না। তবু যেন মুঠো মুঠো গুপ্তধন না চাইতেই পেয়েছিলাম নিজের অজান্তে; শুধু ধ্বংসস্তুপের আনাচে কানাচে নয়, পারিপার্শ্বিকের থেকে, অনেক মানুষের গায়ে গা ঘষার ফলে, তাদের ভাষা ব্যবহারের, সংস্কারের, বিশ্বাস অবিশ্বাসের অবচেতন বিশ্লেষণে৷ তাতে অভিজ্ঞতার ঝুলি আপনিই ভরে গিয়েছিল সারা জীবনের মত।

###

Other posts in <aniruddhasen.wordpress.com> and <apsendotcom.wordpress.com>





সেই জোনাকিরা (১০–১২) ৷৷ অনিরুদ্ধ সেন

3 05 2013

There are 19 sections of these memoirs, divided into 6 posts, this being the fourth.

১০ হাট বসেছে শুক্রবারে

বারো কোয়ার্টার এবং তার বাইরে, শা’গঞ্জ বাজার, কারখানা, স্পোর্টস গ্রাউন্ড পেরিয়ে স্টাফ কোয়ার্টারে, সেই যেখানে আন্টি ডি’ক্রুজের স্কুল, কোনওখানেই বন্ধুবান্ধবের অভাব ছিলনা আমার৷ গুচ্ছের তুতো ভাইবোন ছিল দুনিয়া জুড়ে, মায় খামারপাড়াতেও দেবুদা আর শঙ্কু — তাদের ঠাকুমাকে আমরা ছোটোমা বলতাম, বাবার খুড়িমা৷ দেবুদাদের বাবাকে আমি দেখেছি বলে মনে পড়ে না৷ ছোটোমার অন্য দুই ছেলে নিলুজ্যেঠা (সত্যেন সেন, পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য) আর লুকুকাকা (লোকেন সেন, শা’গঞ্জেই কর্মরত)৷ লুকুকাকার সঙ্গে খামারপাড়াতেই থাকতেন ছোটমা৷ রত্নগর্ভা তো বটেই, অসাধারণ রান্নার হাত ছিল, চৌষট্টি ব্যঞ্জন নিরামিষে নানার চেয়েও ভালো; আর আমসত্ত আচার মোয়া নাড়ুতে সিদ্ধহস্ত; ঘরেই তৈরি করতেন যাবতীয় পাঁপড়৷ বিজয়ার পর পদ্মচিনির চাক দিতেন অন্যান্য স্বহস্ত রচিত লোভন খাবারের সঙ্গে: পদ্মের চাকাপানা ভেতরটা, পাপড়ির আড়ালে যেটা থাকে, সেটা সন্তর্পনে বের করে হালকা চিনির রসে আসাতে হয়, তারপর শুকিয়ে নিলে পদ্মচিনির চাক — মুখে মিলিয়ে যায় আপন সুবাস সমেত, মিষ্টত্বের রেশও থাকেনা, শুধু স্মৃতিটুকু থেকে যায়৷

আর কলকাতায় তো তখন আত্মীয়স্বজনের ছড়াছড়ি! ঘড়ির কলকবজার মত ফি শনিবার আমরা কলকাতা যেতাম, ব্যান্ডেল স্টেশন থেকে দুপুর একটা কুড়ির ধূলায় ধূসর ইন্টার ক্লাসে৷

আমার বড়মাসি আর মেসো, সসন্তান ঢাকা উর্দু রোডের শঙ্কর ভবনে থাকতেন৷ দেশ ভাগের পর চন্দননগরে ছিলেন কিছুদিন, সেখানে তাঁদের ভাঙা হাটের পুনর্নির্মিত ঢাকা আয়ুর্বেদিক ফার্মেসির কারখানা৷ দিপুদা আর অপু দুজনে আমার ভাইক্কে ভাই, বন্ধুক্কে বন্ধু; বোনেরা ভবিষ্যতের গর্ভে৷ ওরা ছাই রঙা দশনসংস্কার চূর্ণ দিয়ে দাঁত মাজত, দেখে দেখে আমিও কিছুদিন তাই; আমি অবশ্য বলতাম, দশম সংস্করণ , হয়ত নিবিড় পুস্তকপ্রেমের মোহে! ওরা ডিম ভাজা, মানে ফ়্রায়েড এগকে বলত পোচ (বেশিরভাগ বাঙালি অবশ্য এখনও তাই বলে), খেত নুন-মরিচের বদলে হজম-সহায়ক ভাস্কর লবণ ছিটিয়ে, অতএব আমিও৷ ওদের চন্দননগরের বাড়িটা আবছা মনে আছে, তবে কলকাতায় পাকা আস্তানা ছিল শঙ্কর ভবনের বদলে পাওয়া, লেক মার্কেটের উল্টো দিকে ঠাকুরবাড়ি রোডের একটা বাড়ি, টিপু সুলতানের অনেক কলকাতাস্থ বংশধরদের কারু আবাস ছিল আগের জন্মে, দিপুদা অন্তত তাই দাবি করত, দৃশ্যমান কোনও সুলতানি আভাস ছাড়াই৷ সেখানে ফাউ হিসেবে পেয়েছিলাম অপুদের জ্যেঠতুতো ভাই, আশিসকে৷ কেউ যদি জিজ্ঞেস করত আমরা ক ভাইবোন, দুহাত দুপা মিলিয়ে কুড়িটা আঙ্গুলেও কুলোত না; জ্যেঠতুতো খুড়ততো মাসতুতো পিসতুতো মামাতো আর পরস্মৈপদী সবাইকে জুড়তে হবে তো!

শা’গঞ্জে বসেই বেশ কিছু নাগরিক আকর্ষণ উপভোগ করতাম আমরা৷

বুধবার বুধবার ব্ল্যাক জাপান করা তোরঙ্গ মাথায় কেকম্যান আসতো বিকেল চারটে নাগাদ৷ যখনই আসুক, তারহীন টরেটক্কায় পাড়ার শিশু মহলে খবর পৌঁছে যেত লহমায়; তাদের আরক্তমুখ মাতৃকুল লজ্জা রাখার জায়গা পেতেন না৷ সরভাজা সরপুরিয়াওয়ালা, নিয়ম করে নয়, যখন ইচ্ছে তখনই আসতো৷ শীতের পরিযায়ী পাখিদের সঙ্গে আসতো খেজুর গুড়ের নাগরি পাটালি আর মোয়া নিয়ে জয়নগরওয়ালা৷

ওই শীতেই ব্যাঞ্জো আর একর্ডিয়ন নিয়ে কলকাতার বো ব্যারাক থেকে আসতো ফিরঙ্গ গায়ক, সচরাচর দুজন, শুক্র শনি রবি বাদ দিয়ে হপ্তায় যে কোনও এক দিন সন্ধ্যায়, ফ্র্যাংক সিনাট্রা আর আর্থা কিটের গুড় মাখানো গান গুলো গাইতে৷ ক্যারল গান আমি তাদের মুখেই প্রথম শুনি … “টিল রিঙিং সিঙিং অন ইটস ওয়ে,/  দ্য ওয়র্ল্ড রিভ়লভ়ড ফ়্রম নাইট টু ডে,/ আ ভ়য়স, আ চাইম, আ চান্ট সাবলাইম/ অভ় পীস অন আর্থ়, গুড উইল টু মেন …৷” ছোটদের জন্যেও গাইত তারা দুএকটা গান৷ একটা গানের কথা আমার স্মৃতিতে গেঁথে গেছে: “শি’ল বি কামিং রাউন্ড দ্য মাউন্টেনস, হোয়েন শি কামস, সিঙিং আই আই য়িপ্পি য়িপ্পি আই৷” এখানে বলে রাখা ভালো, গানটার লিরিক নিয়ে আমার একটা ধন্দ আছে; আমার স্মৃতিতে “শি’ল বি ওয়্যারিং সিল্ক পাজামাস, হোয়েন শি কামস” একই গানের অঙ্গ, কিন্তু রসিক জন বলছেন সেটা বিশ্ব যুদ্ধের সময়কার অন্য একটা বড়দের  অর্থবহ গানের কলি, হয়ত বাবা তাঁর মার্কিন সহবৈমানিকদের কাছ থেকে শিখে নিজের মনেই গাইতেন — আমার স্মৃতিতে তার অনধিকার প্রবেশ হয়ত সেই সূত্রে৷

বাংলা গান — দাশু রায়ের পাঁচালি কিংবা রামপ্রসাদী — গাইতে আসতো হুগলি ঘাটের অশীতিপর নন্দ ধীবর৷ জাত গাইয়ে, দানাদার বলিষ্ঠ গলা, যদিও গায়কিটা গ্রাম্য ধাঁচের৷ তার একটা গানের এক কলি আজও মনে আছে: “শুনেছি লোকে শেখে, লোককে দেখে,/হাবা লোকে ঠেকে শেখে” — কার বাঁধা গান কে জানে! মাকে বলেছিল, “আমরা জেলেকৈবত্ত বটি কিন্তু ভালো ঘর, আমার বাপ ছেল ম্যাকলয়ড ঠিকেদারের ফদ্দোনবিশ৷” ফার্সি নবিশ  ডেজ়িগনেশনটার মানে বুঝেছি পরে৷ অনেক বছর পর একটা সিনেমায় মরিস শেভ়ালিয়রের গান শুনে নন্দ জেলের কথা মনে পড়েছিল — নিশ্চয়ই মিল পেয়েছিলাম কোথাও!

শুক্কুরবার বুকম্যান আসতো, তার ঝোলায় কাগজ মলাটের রগরগে হত্যা রহস্য, আন্টিদের জন্য মিলস অ্যান্ড বুন জাতীয় দ্বিপ্রাহরিক রোম্যান্স, কাকিমা মাসিমাদের জন্য বাংলা উপন্যাস, গুচ্ছের ম্যাগাজিন আর প্যাটার্ন বই, দিস্তা দিস্তা কমিক: যথা ডেল, লুনি টিউনস, সুপারম্যান আর ক্লাসিকস আখ্যার ডক্টর জেকিল এন্ড মিস্টার হাইড, টেল অভ় টু সিটিজ় জাতীয় গল্প৷ মিকি মাউজ় বা ডনাল্ড ডাকের ডিজ়নি কমিক তার কাছে দেখিনি (সে সব পাওয়া যেত হাওড়ার হুইলারে কিংবা নিউ এম্পায়ারের উল্টোদিকের দোকানে) তবে সুপার ডাক বলে একটা অ-ডিজ়নীয় সিরিজ ভালোই লাগত পড়তে৷

কোম্পানির অডিটোরিয়ামটা, নির্ভেজাল সিনেমা হলের রূপ ধারণ করার আগে, যথার্থই বহুমুখী ছিল৷ সকালে বাংলা স্কুল চতুর্থ শ্রেণী অবধি, যদ্দিন না আলাদা স্কুল বাড়ি তৈরি হয়৷ হপ্তায় পাঁচ দিন, বিকেল চারটে থেকে রাত নটা পর্যন্ত সেটা অনেকগুলো তাসের, কয়েকটা ক্যারমের আর গুলতানির টেবিল এবং একটা টেবল টেনিস বোর্ড সম্বলিত ক্লাব ঘর, চা চানাচুর সিগারেট আসতো মুনসির দোকান থেকে; তত্ত্বাবধানে ক্লাব চাটুজ্জে, তাঁর পিতৃদত্ত নামটা তখনই অনুদ্ধারণীয়৷ একটু দুরে কংক্রিটের টেনিস কোর্ট, বল সংরক্ষণের জন্য খেলার সময়টুকু লাইনিঙের পর্দা দিয়ে ঢাকা৷ কারখানায় ব্যবহৃত মোটা সুতির তাগড়া লাইনিং অল্প ছিঁড়ে গেলে বাতিল করা হত; তাপ্পি মেরে নিলেই খাসা বল আটকানোর পর্দা৷ শীতকালে ক্লাবের পেছনে  ব্যাডমিন্টন কোর্ট কাটা হত৷ ক্লাবের একপাশে একটা রেস্টলিং পিট —  আসলে  ধুলো করা গঙ্গা মাটি দিয়ে বোঝাই একটা আয়তাকার গর্ত, সিজ়ন টাইমে ঈষৎ তৈলাক্ত, তার চেয়েও বেশি ঘর্মাক্ত, ভর বর্ষায় সকর্দম৷ যাদের আমরা হিন্দুস্থানী বলতাম, সেই হিন্দিভাষীরা রোজ ভোরে সেখানে ধুপ ধাপ করে পরস্পরকে আসমান দেখাত৷ শুক্কুর শনি দুই এবং তিন শোয়ের সিনেমা; শুক্কুরের রাত আটটার শোতে বাছাই করা ইংরেজি ছবি, বাছাই করতেন স্বয়ং পিতৃদেব৷ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রগুলো — বাইসিক্ল থীভ়স, সিটি লাইটস, হাউ গ্রীন ওয়জ় মাই ভ়়্যালি — সেই হলে দেখা৷ ওয়েস্টার্ন বলে পরিচিত ব্যাং ব্যাং (মার্কিন ভাষায়, অবশ্যই সংস্কৃতে ভেক ভেক নয়) ছবি, যা দেখেছি, সব সেখানেই৷ সিনেমার দিন অবস্থা বুঝে ছোলা বাদাম ওয়ালারা জমায়েত হত, বাদাম ভাঙার মড়মড় (বানান অভ্রান্ত!) ধ্বনিতে গোটা হল শব্দায়মান, পায়ের তলায় — শুকনো পাতা নয় — খোলা ও ঠোঙা মথনের মর্মর ধ্বনি (এটাও নির্ভুল!)৷ মশলামুড়ি-ওয়ালাও আসতো; তবে, দক্ষিণের ভারত মহাসাগরটুকু বাদ দিয়ে আসমুদ্রহিমাচল যারা ভিন্ন ভিন্ন নামে দাপটে রাজত্ব করে, সেই ফুচকা পানিপুরি গোলগাপ্পা ঘুপচুপওয়ালাদের সেখানে দেখেছি বলে মনে পড়ে না৷ তারা বসত শহরের স্কুলগুলোর কাছে, হুগলি কিংবা চুঁচড়োয়, বড় সিনেমা হল রূপালি আর কৈরির পাশের গলিতে — কলকাতার পেশাদারি ফুচকার কাছে স্বাদে বা পরিবেশনে নগন্য!

ওই অডিটোরিয়ামেই ডিসেম্বরের একটা দিন বসতো মহিলা সমিতির বিকিকিনি মেলা; সেখানে আমরা মহানন্দে লাকি ডিপ (এলেবেলেদের জন্য), হুপলা (বেতের রিং ছুঁড়ে সাজানো প্রাইজ়ে গলানো), কোকোনাট শাই (কেঠো বল ছুঁড়ে বাঁশের মাথায় স্থাপিত নারকেল ফেলা), লাকি স্কোয়ারের জুয়ার খেলা খেলতাম, মা মাসিদের হাতে তৈরি খাবার এবং নিষিদ্ধ বাজারি খাদ্যাখাদ্য সকল কিনে খেতাম৷

হাসি আর প্রতিমার বাবা মারা যান ক্ষয়রোগে; হাসির মা — তাঁকে আমার বেশ মনে আছে — সেলাই ফোঁড়াই করে দিন গুজরান করতেন৷ তাঁর সাহায্যের জন্য বিকিকিনি মেলা শুরু হয়, আসলে ছিল বিলিতি ভ়িকারেজ ফ়েয়ারের নকলে সেল অভ় ওয়ার্কস, সঙ্গে যার যা কিছু বাতিল বা বাড়তি সামগ্রী (হোয়াইট এলিফ়্যান্ট) বাড়িতে জঞ্জাল হয়ে আছে — যথা পেপারব্যাক নভেল, উপহারে পাওয়া ফুলদানি, অসহ্য চড়া রঙের শাড়ি, মলিন হয়ে যাওয়া ফ্রেম সুদ্ধ ছবি — তাদের বিদায়্করণ৷ জুয়ার রোজগারটা উপরি৷ মা ছিলেন একজন পালের গোদা; উমাদি, শান্তিনিকেতনের উমা দত্ত (২০১৩-র ৪ঠা নভেম্বর নিরুনব্বুই পার করেও তাঁর মাথাটা এখনও তারিফ করার মত পরিস্কার, ক্বচিৎ কদাচিৎ ফ়োন করলেই চিনতে পারেন, আলাপচারী চালান যেন কালকেই আমাদের বাক্যালাপ শেষ হয়েছিল), বিকিকিনি নামটা বেছেছিলেন; আর সে যজ্ঞের প্রথম অগ্নিহোত্রী ছিলেন মিসেস জ্যাকসন৷ ক্রমে সেই বিকিকিনি বৃহত্তর স্বার্থে বাৎসরিক মেলায় উন্নীত হয় এবং ক্রমে ক্রমে চরিত্র হারায়৷

স্কুল বলুন, ক্লাব হাউস বলুন, সিনেমা বলুন, গুদাম ঘরের মত ওই ইমারৎটিতে অনেক ইতিহাস তৈরি হয়েছে একদা৷

সামনেই ছিল প্রায় আড়াইটে প্রমাণ সাইজ ফুটবল মাঠের মত সাবেক স্পোর্টস এবং প্যারেড গ্রাউন্ড৷ সেখানে সারা বছর দেদার ফুটবল, হকি আর ক্রিকেট খেলা হত৷ মাঝে মাঝে ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের মত বড় দল প্রদর্শনী খেলা খেলে যেত; শৈলেন মান্না বদরু ব্যানার্জি থঙ্গরাজ সালে কিট্টু ইত্যাদি নাম একেকটা সেরকম খেলার পরে বহু দিন ধরে লোকের মুখে ফিরত অঙ্গভঙ্গি সহকারে৷ বছরে একদিন কোম্পানির বাৎসরিক স্পোর্টস উৎসব হত ঘটা করে — তার নেপথ্য খাটনির সিংহভাগ বাবার ঘাড়ে৷ ক্লাব-ইভ়েন্ট ওপেন-ইভ়েন্ট মিলিয়ে সারা দিনমানের স্পোর্টস;  পুরস্কার  বিতরণের আগে শেষ  দুটো ইভ়েন্ট ছিল গো-অ্যাজ়-ইউ-লাইক এবং কোম্পানির দমকল ও রক্ষী বাহিনীর দড়ি-টানাটানির লড়াই৷ দমকলের লোকেরা নাকি বসে থেকে থেকে খুঁটি হওয়ার যুগ্যি মোটা হত আর খাস সৈন্যবাহিনী থেকে আসা দরোয়ানরা আদতে পালোয়ান৷ বিতরণের নিয়মটা কি ছিল সঠিক জানিনা, তবে যাদের কাছেই স্পোর্টসের প্রোগ্র্যাম বই থাকত, তার পেছনে ছাপা একটা নম্বরি কুপনের বদলে সমবেত দর্শকবৃন্দকে একটা করে এলাহি খাবারের বাক্স দেয়া হত, আর তা ছাড়াও একটা করে বাছাই কমলালেবু; খোসা ছাড়ানো যায়না এমন পঞ্জাবি কিনু নয়, পাতিলেবুর মত দার্জিলিংও নয়, বোধহয় বিশুদ্ধ কর্নাটদেশীয় নাগরঙ্গ!

বাবার আমলেই বেঙ্গল অলিম্পিক এসোসিয়েশন তাকে প্রথম শ্রেণীর স্পোর্টসের মর্যাদা দেয়৷ তারপর কারখানার বাড়তি কাজের দরকারে কারাপ্রাচীরের করাল গর্ভে ঢুকে যায় সেই মাঠ, সেই প্রথম শ্রেণীর বনেদিয়ানা৷ ঠিক যেমন করে বন কেটে মানুষের বসত দরকার মত বাড়ে, যেমন করে খান্ডব বন জ্বালিয়ে অযুত মৃগপক্ষিকুলের বসত, অরণ্যচারী শবরদের জীবনযাপন নষ্ট করে সভ্যতার বিকাশ হয়৷

###

১১ অনুসন্ধান

এক অনুপম সুন্দরীকে তিনি দূর থেকে কালবৈশাখীর বিদ্যুল্লতার মত এক ঝলক দেখেছিলেন; তাকে আরেকটিবার দেখার জন্য সব কিছু — এমনকি সমরকন্দ বুখারার তামাম ঐশ্বর্যও — বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন সেই রহস্যের কবি হাফ়েজ়়৷ অত অনুভব, অত রহস্য, অত ঐশ্বর্য, কাঙ্গাল আমি পাব কোথায়! তবু সেই শ্রাবণের অনন্যসাধারণ জোনাকিদের আরেকটিবার দেখার জন্য আমি আমার সর্বস্ব দিয়ে দিতে পারতাম, নিশ্চিত৷ আমার বুকের ভেতর ধিকিধিকি করে তুষের মালসার মত যে আগুন জ্বলছিল তাদের দেখার পর, তাতে কালেকালে অনেক ইন্ধন যুগিয়েছে আমার পারিপার্শ্বিক৷ সেই দেওঘরে একদিন হাড় কাঁপা শীতে হিরালাল তুষের মালসা দিয়ে গিয়েছিল ঘরে৷ যতক্ষণ জেগেছিলাম, দেখেছি, হয় মা, নয়তো বাবা, তাতে আরো তুষ, আরো তুষ, শেষকালে কয়েকদিনের জমানো খবরের কাগজ গুঁজে দিয়ে জিইয়ে রাখতে চাইছিলেন তার ওম, কিন্তু কটু ধোঁয়ায় ঘর ভরে গেল বলে সে চেষ্টা ছেড়ে দিলেন অবশেষে৷

অনেক দিন সেই মৃগতৃষ্ণা আমার পিছু ছাড়েনি, বহু বছর … কাঁচা সুপুরি যেমন চর্বণে চর্বণে নির্মূল হয়ে যাওয়ার পরও তার কষা স্বাদ আর হালকা মাথা ঝিমঝিম বহুক্ষণ থেকে যায়, শেষের দিকে ভালো লাগে না আর, মনে হয়, আপদ! কোথাও হয়ত তার একটুখানি রেশ থেকে গেছে দীর্ঘ কাল৷ তার পর অনেক জোনাকি দেখেছি সারা জীবন, তবু তেমনটি দেখলাম না আর!

বাবার মৃত্যুর তিন বছর পর কেওটা-লাটবাগানে বাবারই কেনা জমিতে একটা বাড়ি তুলেছিলেন মা৷ সেখান থেকে কোম্পানির কারখানা সিধে পথে পৌনে মাইল, গাড়ি নিলে ঘুরপথে যেতে হয় বলে মাইল আড়াই৷ কি সাইকেলে, কি গাড়িতে, সন্ধেবেলা কোম্পানির ক্লাবে যাওয়ার সময় সর্পিল শরৎ সরণি দিয়ে ওই ঘুরপথটাই বেছে নিতাম অজান্তে৷ শরৎ সরণিই একদা ছিল শাহি সড়ক — দ্বিতীয় যুদ্ধের সময় মার্কিন সেনা সরলতর, প্রশস্ততর গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড নির্মাণ করা অবধি৷ পরে সেটা স্থানীয় রাস্তা হয়ে গেল, অপ্রশস্ত, কোথাও দুপাশে সরু ইটের সাবেক হর্ম্যশ্রেনীর মধ্যে শুঁড়ি পথ৷

আমার  পছন্দ  ছিল  কেওটা  থেকে  জি.টি. রোড পর্যন্ত বৃক্ষগুল্মময় আঁকাবাঁকা একটা ক্ষুদ্র অংশ৷ অর্ধশিক্ষিত নেতারা মিলে (যেমন তাঁদের দস্তুর) সেই সর্পিল রাস্তার নব নামায়ন করেন যে ঔপন্যাসিকের নামে, তাঁর সাতগাঁয়ের ভিটে, বা হুগলি শহরের ব্র্যাঞ্চ স্কুল যেখানে দত্তা-র তিন বন্ধু লেখাপড়া করতেন, কস্মিনকালেও সে পথের আওতায় ছিল না৷ বরং, দেবযানের বিভূতিভূষণ সে পথের বালির মোড়ে বিলীন একাংশে ছিলেন কিছুকাল, এবং প্রসন্ন গুরুমশাইয়ের পাঠশালা ছিল অনতিদূরে কোথাও, ছোট্ট অপু পড়তে যেত সেখানে৷

শরৎ সরণির যে ছিন্ন অংশটা আমার পছন্দের, তার অরুন্তুদ নিস্তব্ধতা ভেদ করত ঝিঁঝির আর মত্ত দাদুরির ডাক — উভয়েই আষাঢ় শ্রাবণে সূর্যাস্তের পর মিলনপিয়াসী৷ পির বাবার উপেক্ষিত ইটের মাজারটা পেরিয়ে চুলের কাঁটার মত যে বাঁক, সেখানে ছিল অনেকগুলো ঝাঁকড়ামাথা আশশ্যাওড়া, দেখেই বোঝা যেত অনেকদিনের, হয়ত পাবড়া ছোঁড়া ঠ্যাঙ্গাড়েদের বলি অনেক নিরীহ পথিকের শব সার সঞ্চার করেছে তাদের ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠায়৷ আধা জ্যোৎস্নার সিলুয়েটে দেখলে একটা গাছের মাথা সগ্রীব উটের মত লাগত; আমার প্রিয় গাছ ছিল সেটা, আকাশমুখী হয়ে নিশ্চিন্তে জাবর কাটা উট৷ অবশ্যই উটের গ্রীবার মত  উদ্ভট সেই জনহীন শ্যাওড়াতলার নিস্তব্ধতা৷ জায়গাটা সাদামাটা, গেরস্ত জোনাকিদের খুব পছন্দের, তারা সেখানে মহানন্দে নাচ দেখাত৷ কিন্তু তাদের সে জলুস কই? উজ্জ্বলতা বুদ্ধি গ্ল্যামার ও যৌন আবেদন? তবু একেকদিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খুঁজতাম তাদের, যদি ভুল করে দেখা দেয়!

আমার বিয়ের ক’মাস পরে বর্ষায় সেখানে একবার গাড়ি থামিয়ে উট গাছটা চেনাচ্ছিলাম আমার স্ত্রীকে৷ ভালো করে দেখানোর জন্য গাড়ি থেকে নেমে একটা ভ়্যান্টাজ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছিলাম দুজনে৷ যে আটপৌরে জোনাকির দল সেখানে ঘোঁট পাকিয়ে বেহায়াপনা করছিল, তাদের দেখেই মুগ্ধ হয়ে গেল রিনি: “দেখো কত জোনাকি ওখানে!” কি করে তাকে বোঝাই যে তারা আমার ছেলেবেলার সেই জোনাকিদের বাঁ পায়ের কড়ে আঙ্গুলের নখের যুগ্যি নয়!

…একটা মিশ্র আবহাওয়ায় বড় হয়েছিলাম আমি: মিশ্র ভাষা ও সংস্কৃতি; মিশ্র কাল: যুদ্ধোত্তর শান্তিকামী দুনিয়া, মন্বন্তরের পর আপাত স্থিতাবস্থা, স্বাধীনতার ইউফ়়োরিয়া, দেশভাগের হাহারব; মিশ্র স্থানভেদ: শা’গঞ্জ, শান্তিনিকেতন, কলকাতা৷ কখনও ধানখেতের আলিপথ ধরে হেঁটেছি, কখনও নাগরিক ফুটপাথ়ে৷

একদিকে আমরা শনিবার শনিবার ট্রিংকাতে চা পেস্ট্রি খেতাম, সুযোগ পেলেই ম্যাগনোলিয়া বা হ্যাপি ভ্যালি আইসক্রীম, বিদেশি হ্যাম আর চীজ়, অন্যদিকে রেশনের চিনি ফুরিয়ে গেলে বাবা-মা এখো গুড়ের চা খেতেন, কালোবাজারের চিনি কিনতেন না, দৌরলার চৌখুপি চিনিও নয়৷ একদা শা’গঞ্জ দর্শনে আসা তদানীন্তন খাদ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনকেও গুড়ের চা খাইয়েছিলেন মা৷ কি করবেন, মন্ত্রী মশাইয়ের সঙ্গে অত লোকজন, তাদেরও তো দিতে হবে, নাকি! রেশনের ক্বচিৎ কখনও পাওয়া অপেক্ষাকৃত ভালো চালটা আমার জন্য যথেষ্ট জমিয়ে রেখে বাবা মা খেতেন অখাদ্য চাল, শ্যামদেশ বা বর্মা থেকে পি.ডি.এস.-এর জন্য আমদানি করা গোল দানা, ভাত রাঁধার সময় বদ গন্ধ বেরুত৷

সেভাবে  বাড়তে বাড়তে  এক  দিকে  যেমন  একটা  মূল্য  ধরে  দিতে  হয়েছিল,  অন্যদিকে  দুনিয়াদারির রাস্তাগুলো সাফ হয়ে গিয়েছিল — মানুষের সঙ্গে নিষ্কারণ সংঘাত এড়াতে শিখেছি অল্প চেষ্টায়, মানিয়ে নিতে পেরেছি যে কোনো জায়গায়, রকমারি পরিস্থিতির সঙ্গে৷

বয়ঃসন্ধির অমোঘ চিহ্নগুলোও কষ্ট করে কেউ চেনায়নি  আমায়, এদেশে সে রেওয়াজই নেই, পশ্চিমে যা মধুমক্ষিকা ও বিহঙ্গের প্রিয়মিলনের নমুনা দিয়ে বোঝানো বাপ মায়ের দায়িত্ব। চোখের সামনে এত বেড়াল কুকুর, গোয়ালে গোরু, খেতিকাজের বলদ! একবার সেই ১১৬ নম্বরের লনে সাপের শঙ্খ লাগা দেখেছিলাম আমি আর টুকু৷

কেষ্ট মালির হাতে বারো নম্বরের ছোট বাগানও মরশুমে ঝলমল করত, ১১৬ নম্বরের বড় বাগান তো বটেই; বাকি সময় বেল-রজনীগন্ধা, বছরভর গোলাপ — সানন্দে শেখাত আমাকে কলমের কারসাজি৷ শান্তিনিকেতনে একবার পেছনের ধানক্ষেতে পায়েস রাঁধার মাতাল গন্ধ পেয়েছিলাম, হরিপদদা বুঝিয়েছিল, “ধানের বুকে দুধ এয়েচে যে!” স্তোকভারনম্রা যে শ্যামস্বর্ণাভ ঝিউড়িরা জীবনানন্দকে মুগ্ধ করেছিল, আমিও তাদের কাছ থেকে দেখেছি, ঈশ্বরবাগ চন্দনপুর হরিহরগঞ্জে, হাওয়ার দোলায় আপন খুশিতে লুটোপুটি খেতে৷ কোথাও একদিন দেখেছিলাম, বরিশাল না গিয়েও, শ্বেতাঙ্গ লক্ষ্মীপেঁচা মিলনরত যুগল ব্যাং ছোঁ মেরে তুলে নিল বর্ষাস্নাত সন্ধ্যায়, শ্বেতাঙ্গদের যেমন দস্তুর ছিল এদেশে একদা৷  গলিত স্থবির  ছিল না সেই দাদুরী মিথুন, দু –একটি মূহুর্তের ভিক্ষা  মেগেছিল কিনা প্যাঁচাই জানে!

গন্ধেশ্বরী ঘাটে যারা দাহ করতে আসতো তাদের শোকদুঃখধর্মগন্ধহীন বীভৎস হরিবোল আর মাতাল হুল্লোড় বারো নম্বর থেকে স্পষ্ট শোনা যেত নিশুত রাতে৷ সব মিলিয়ে ব্লেকের বা জীবনানন্দের জন্য তৈরি হয়ে গিয়েছিল মন, আমার নিজের মনেও সেই গহন ছায়া — শরতের রোদ্দুরে ঝলমল ভাগীরথীর পাশাপাশি! সেই ভাগীরথীরই মুক্তবেণী ত্রিবেণীর মেলায় বিক্রি হত কাঠখোদা বেনেবউ, মৃন্ময় পেঁচা — সেই সাদা রঙের লক্ষ্মী পেঁচা, মাটির কোলা ব্যাং, খাদ্য ও খাদক, ডোরাকাটা উজ্জ্বল বাঘ, চিরন্তনতার প্রতীকের মত৷

তবু তারা কেউ — কেষ্টমালি, হরিপদদা, ব্লেক আর জীবনানন্দ — আমার সে মোহময় জোনাকিদের ঝোপজঙ্গল গাছগাছড়া পেরিয়ে, কালোকোলো লোহার সেপাইদের এড়িয়ে, গজগামিনীর মত মিলিয়ে যেতে দেখেনি৷

###

 ১২ দক্ষিণে চাই, উত্তরে চাই

বিচারবুদ্ধি শানিয়ে ওঠার আগে মানুষছানাদের মন খুব স্পর্শকাতর থাকে; দুর্বল নয়, শুধু ছাপ তোলার গালার মত নরম৷ কোনও একটা খেলনা হারিয়ে গেলে, কাছের বন্ধু দুরে চলে গেলে, চেনা মানুষের মৃত্যুতে কিংবা চেনা পারিপার্শ্বিক থেকে সরিয়ে নিলে একটা বঞ্চনার বোধ তাদের ভর করে৷ হয়ত সে বোধ কারু সঙ্গে ভাগ করে নেয়ার মত প্রকাশ ক্ষমতাও থাকে না তাদের৷ সে সব সংকটের সময় বড়দের ভাবভঙ্গি গোলমেলে খুব৷ কখনও তারা নিজের কথারই বিরোধিতা করে, কখনও একে অন্যের সঙ্গে ঝগড়া করে; মোট কথা তারা পাকা মাথায়,  ঠান্ডা  মাথায়  ভাবতে পারে  না তখন৷ ছোটরা তখন মনের দুঃখ মনে চেপে বড়দের ছেলেমানষি দেখে আর তাদের অন্তর্নিহিত পরস্পর বিরোধিতার শিকার হয় নীরবে৷ সে অবস্থাটা সুখের নয় খুব৷ দাদু তখন তিলতিল করে মৃত্যুর দিকে কিন্তু তখনও তাঁর বোধশক্তি টনটনে; আমাকে বলেছিলেন ছোটখাটো খুঁটিনাটি সব দেখে রাখতে, সব আপাতবিরোধিতা, সবার অবুঝপনা, রোজ কত কি ঘটে যাহা তাহা  যত তুচ্ছই হোক; “মনে রাখবা, নিজির চোখে দেখা আর নিজির কানে শুনার উপর কুনও সইত্য নাই!”

ফার্স্ট আর্টস পাশ করে, অষ্টাঙ্গ আয়ুর্বেদ চর্চা না করে বেঙ্গল মেডিকাল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন দাদু (শচীন্দ্রনাথ), তাঁর সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন দাদা (ক্ষিতিমোহন) — তিনি সে পাঠ শেষ না করেই অন্য পথে হাঁটেন, সেই সঙ্গে অষ্টাঙ্গ আয়ুর্বেদের পূর্ণ পাঠও শেষ করেছিলেন৷ দুজনের কেউই জানতেন না, বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হবে তাঁদের মধ্যে, এক প্রজন্মের তফাতে৷ দুরারোগ্য অ্যানথ়্রাক্সে বিস্তর ভুগে দাদু কোনক্রমে প্রাণ নিয়ে বেঁচেছিলেন নানার আপ্রাণ সেবায়৷ ছোট ছোট তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে তিনি যখন যমের সঙ্গে লড়াই করছেন, নিকট কুটুমরা এক কড়াও সাহায্য করেননি, ছোঁয়াচে রুগিকে আশ্রয় দেয়া তো দূর অস্ত! সমস্ত গয়না বিক্রি করে দাদুকে তিনি নিশ্চিত মৃত্যুর দোরগোড়া থেকে ফিরিয়ে আনেন৷ এসব কথা বাবা জ্যেঠার কাছে পরে শুনেছি৷

যে দাদুকে আমার মনে আছে তিনি মিতবাক কিন্তু স্বভাবে রসময়, এবং অনেক বিষয়ে আশ্চর্য পন্ডিত৷ সেযুগেও ডাক্তারদের মধ্যে পলিম্যাথ়ের সংখ্যা হাতে গোনা; তিনি ছিলেন সেই বিরল প্রজাতির একজন৷ দাদু তখন মুরারই, নসিপুরে ইত্যাদি প্রত্যন্ত জায়গায় ডাক্তারি করেন; সেখানে তাঁর ছেলেরা কষ্ট করে, জলকাদা ভেঙে, বিস্তর হেঁটে স্কুলে যেতেন; বিকল্প ছিল হাতি — বুয়ার পক্ষে দুষ্কর সেই দুস্তর পদাতিক বৃত্তি৷ তাই আমার পিসি স্কুলে পড়েননি কখনও৷ দাদু নিজেই তাঁকে পড়াতেন, বিদ্যাদানের জন্যই পড়াতেন এবং নিজের বিদ্যাদানের ক্ষমতা ছিল বলেই, কারণ পাশ করানোর তাগিদ ছিল না কোনও৷ প্রাইভ়েটে স্কুল পাশ করে বুয়া কলেজে ভর্তি হন, পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. করেন৷ আমার এক দিদি, নমিতাদি, নানা দাদুর কাছে থেকেই কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত; তাকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পড়াতেন দাদু৷ ডাক্তারি বিদ্যের বাইরের বিদ্যা তো ছিল বটেই৷ নমিতাদি জনান্তিকে আমার কাছে আক্ষেপ করে বলত,  “মেজদামনি প্রফেসরদের ওপর এক কাঠি!”

শুনেছি, কিছু অন্যায় বাতিক ছিল তাঁর, কিছু যুগ ও সমাজোপযোগী গোঁড়ামি, কিন্তু অন্য দিকে অনেক মুক্ত মনের মানুষের চেয়ে বেশি খোলামেলা মনে হত তাঁকে৷ বুড়োকাকা যখন বিজয়া পিসিকে বিয়ে করে, পয়োগ্রাম বাড়িতে ছীছিৎকার ও শোকের আবহ তখন নানা দাদুই ছিলেন তাদের পেছনে৷ সেটা দ্বন্দ্বের যুগ, নতুনের সঙ্গে পুরনোর, হিন্দুত্বের সঙ্গে ব্রহ্মবাদিত্বের, দমনের সঙ্গে নারীমুক্তির৷ আমি তাঁর বিচারের অধিকারী নই, এত যুগ পরে বিচারের দরকারই বা কি? যে দাদুকে আমি দেখেছি, তিনি নাকের ডগায় পুরু পরকলার চশমা লাগিয়ে বারান্দার রোদে পিলগ্রিম’স প্রোগ্রেস পড়ছেন, অথবা সেই কোন সত্য যুগের বাঁধানো স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজ়িন, দুটিই বহুপঠনে জীর্ণ; নিম্নাঙ্গে মালকোঁচা মারা ধুতি, শীতকালে পরনে একটা ছোট হাতার পাশবোতাম ফতুয়া, গ্রীষ্মে খালি গায়ে মার্জিত উপবীত৷ আমি মুগ্ধ ভক্ত ছিলাম তাঁর, তাঁর অন্তিম নিজে দেখো, নিজে শোনো  উপদেশ উপেক্ষা করার কে?

তার আগেই অবশ্য এই দুনিয়ার ক্যালাইডোস্কোপে উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করেছি নিজে নিজেই৷ তাতেই কাল হল আমার৷ নজরটা তীক্ষ্ণই ছিল; অনেক গুরুজন আমার নজরদারির অভ্যেস ভালো মনে নিতেন না — অভিভাবকদের কাছে নালিশ যেত৷ তাইতে আমার নজর ছুটল মাঠেঘাটে, পথচলতি লোকজনের দিকে এবং গুরুজনদের নীরব নিরীক্ষণে৷

বারো কোয়ার্টারের ছোট মাঠের উত্তর-পশ্চিমে দুটো ঝোপের পাশে অনেকটা খালি জায়গা ছিল, আমাদের সদর থেকে তেরছা করে৷ তার একটা চৌখুপিতে একবার কেউ উৎসাহভরে ভুট্টা লাগিয়েছিল৷ লাগোয়া আরেকটা চৌখুপিতে কেষ্টকে দিয়ে বাবা লাগিয়েছিলেন সূর্যমুখী — বোস কাকা বলেছিলেন, “তার চেয়ে কি একটা কিচেন গার্ডেন ভালো হত না, এ.কে.?” বাবা নিজেই একেকদিন পোকা বাছতেন, মায়ের সেলাই বাক্সের আলিগড় কাঁচিটা নিয়ে পোকা ধরা পাতা, পুঁয়ে পাওয়া ডাল ছেঁটে দিতেন সযত্নে৷ আর পাঁচটা সূর্যমুখীর চেয়ে অনেক বড় সাইজ়ের ফুলের মেলা বসে গেল শেষকালে: প্রায় চায়ের পিরিচের মত বড়, ভ্যান গহ্-র সূর্যমুখীর মত, ব্লেকের বাঘের মত উজ্জ্বল হলুদ৷ ভুট্টার শিসেও তখন রস এসেছে — রথের মেলার আগেই তোলা দরকার৷ দেখতে দেখতে একদিন পঙ্গপালের মত একঝাঁক খাটিয়ে কিন্তু আমুদে টিয়া নেমে এলো দুটো চৌখুপিতেই, অবিশ্বাস্য পান্না রঙের, মারামারি করলনা, ঝগড়া ঝাঁটিও নয়৷ কেষ্টমালি ছাতা নিয়ে হুশ হুশ বলার আগেই সমান ভাগে আহার করে উড়ে গেল অন্যত্র৷ পরের দিনও পুনরাবৃত্তি৷ বুঝলাম, তারা মানুষের মত আমার আমার  রোগে ভোগে না৷

খোকাদার কাছে কাজ করত চিত্তদা, মা বলতেন, “চটপটে, চালাক চতুর, আমাদের হরির মত নয়৷” আমার একটা ট্রাইসাইকেল জুটেছিল, বড়দের সাইকেলের মত চেন-স্প্রকেটওয়ালা — বিদায়ী কোনও সাহেবের থেকে কেনা৷ সেটা নতুন চালাতে শিখছি যখন, চিত্তদা দেখি অফ টাইমে মাঞ্জা দিয়ে বেরুবার জন্য প্রস্তুত৷ আমাকে শুধালো, “বাজারের দিকে যাচ্ছি, তুমি যাবে?” অমনি আমি দু প্যাডেলে খাড়া! আমরা খোশমেজাজে গল্প করতে করতে বাজার গেলাম, চিত্তদা সিগারেট লজেন্স আর লিলি বিশকুট খাওয়ালো৷ বেলা গড়িয়ে ফিরছি যখন, দেখি বাবা মা খোকাদা সহ দুনিয়ার লোক গেটের সামনে; পুলিসে খবর দেয়নি কেউ তখনও, সার্চ পার্টির প্ল্যান ছকছে সবে৷ সেটা বোধহয় আমার প্রথম একলা অ্যাডভেঞ্চর, একলা বলতে বাবা মা বা অন্য গুরুজন অথবা তাঁদের অনুমতি ছাড়া৷ আত্মপ্রসাদটা মাঠে মারা গেল যখন বুঝলাম চিত্তদার কাজ গিয়েছে আমার জন্য, আমাকে একটু সাবালক হতে সাহায্য করার জন্য৷ বুঝলাম, বড়রা কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, কতটা বেমরমী!

###

ক্রমশ

Other posts in <aniruddhasen.wordpress.com> and <apsendotcom.wordpress.com>





সেই জোনাকিরা (৭–৯) ৷৷ অনিরুদ্ধ সেন

2 05 2013

There are 19 sections of these memoirs, divided into 6 posts, this being the third.

বিকিকিনির হাট

যে দিন  সকালে  লুচি  হত  না,  মানে রবিবার ছাড়া অন্য কোনও দিন আমরা কলকাতায় থাকলে,  সেদিন দেশপ্রাণ  মিষ্টান্ন  ভান্ডার  থেকে  আসত  ছোলার ডাল  সহযোগে হিঙের কচুরি, অভাবে ডালপুরি আলুরদম, এবং অনুপান হিসেবে জিলিপি৷ একটু লায়েক হতেই সংগ্রহের ভার ন্যস্ত হয় আমার ওপর৷ সে দায়িত্ব অবশ্যই গুরুভার ছিল, কারণ শালপাতা ঢাকা বাঁশের চাঙারি ভেদ করে তদানীন্তন নাগরিক চিলেদের এক্স-রে নজর চলত; অন্তত দু বার তাদের নখরাঘাতে আহত হয়েছি, মনে পড়ে৷ সে যুগে ফি শীতে প্রত্যেক দোকানে কড়াইশুঁটির কচুরি হত, বলতে হত না, আর ফুলকপির সিঙাড়া৷ আটপৌরে আলুর সিঙাড়াও যত্নে তৈরি হত ছোট করে কাটা, জুঁই ফুলের মত সাদা আলু-ছেঁচকি দিয়ে, আজকের মত রোগামোটা, অপটু হাতে তড়িঘড়িতে কাটা কালোকোলো আলুর ঘ্যাঁট দিয়ে নয়৷ রাজভোগের ঠিক মাঝখানটিতে থাকত একটা প্রমাণ সাইজের ক্ষীরের গুলি, ভিমটোর বোতলের গুলি ছিপির মত; নকুলদানার ভেজাল সে তুলনায় নিতান্ত অর্বাচীন৷

তামাম বালিগঞ্জ অঞ্চলে ভদ্রপদবাচ্য রেস্তরাঁ ছিল না একটাও৷ এখন যেখানে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ দিয়ে গড়িয়াহাট বাজার যেতে ডানহাতি গলির মুখে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, যে গলি দিয়ে ঢুকে হিন্দুস্থান পার্ক, সেই গলিতে মাঝামাঝি কোথাও, একতলায়, প্রথম একটা রেস্টুরেন্ট হল, নাম নিরালা৷ অনেক বছর পর সেটার স্বনামে স্থানান্তরণ ও অধঃপাত হয় ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলির দোতলায়৷ সাতের দশকের মাঝামাঝি ক্ষণস্থায়ী সফ়ারির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল গড়িয়াহাট  রোডে, বিধায়ক সুব্রত মুখার্জির বাড়ির কাছে৷ ডান দিকের দু নম্বর হিন্দুস্তান মার্টে জুতোর দোকান, ছবি তোলার স্টুডিও ইত্যাদি ছিল৷ বাঁ দিকের এক নম্বর হিন্দুস্তান মার্টের ভেতর ছিল উল হাউস, পুজোর পরেই মা সেখানে মকর সংক্রান্তির আগমন যাচ্ঞা করে হানা দিতেন: বেড়াল ছানার মত ছোট ছোট রংবেরঙের উলের বল, নতুন প্যাটার্ন বই, বুনবার কাঁটা, লেসের কুরুশ, সবই পাওয়া যেত সেখানে৷ তার ধারেকাছেই ছিল মায়ের তথাকথিত দেওরের দোকান — মালিক মাকে বৌদি বলে ডাকত তো! সেখানে অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা হ্যাম বেকন তো পাওয়া যেতই, আর পাওয়া যেত ফুলকাটা কাচের গেলাসে মধু এবং তিন চার কিসিমের চীজ়, ওই কাচের গেলাসেই আসতো ক্রাফট চীজ়, অপেক্ষাকৃত সস্তা, কালিম্পঙের সত্যিকারের টফ়ি — ললিপপের মত কাঠি গাঁথা, তা ছাড়া মহিলাদের প্রসাধন সামগ্রী এন্তার৷

তখন বাঙালি মধ্যবিত্ত কথায় কথায় নিউ মার্কেট যেত না, আর শপিং মলগুলো দূর ভবিষ্যতের গর্ভে৷ আমরা সপ্তাহান্তে কলকাতা আসার সময় হাওড়া থেকে ট্যাক্সি নিতাম পার্ক স্ট্রীট পর্যন্ত৷ ট্রিংকা’স তখনও টী-শপ, সেখানে বাবা মা চা খেতেন, একটা বাড়তি পেয়ালা আমার জন্য, আর, এক পট চায়ের সঙ্গে আসত পেস্ট্রিগাছে দুটো পেস্ট্রি, দুটোই আমার; আলাদা করে তার বরাত দেয়া হত বলে মনে পড়েনা৷ পার্ক স্ট্রীট থেকে ট্রাম ধরে কলকাতার বাড়ি৷

ততক্ষণে সূর্যদেব অস্তমিত, গোটা চৌরঙ্গি অঞ্চল আলোয় আলোময়৷ আমরা মফসসলবাসী গাঁইয়ারা চোখ ট্যাড়া করে দেখতাম৷ পার্ক স্ট্রীটে পৌঁছবার আগেই চোখে পড়ত বিশাল বিশাল সব আলোকিত বিজ্ঞাপন৷ একটা লিপটনের টী-পট কাত হয়ে স্বর্ণাভ চায়ের ধারায় ভরে দিচ্ছে একের পর এক পেয়ালা, নীল নদের ক্যাটারাক্টের মত৷ আরেকটাও আমার নজর কেড়েছিল অন্য কারণে:  একটি লোক,  নাম গোত্র পরিচয়হীন,  একটা উদুখলের মধ্যে দড়ি বাঁধা মন্থন দন্ড ঘোরাচ্ছে অবিশ্রাম, নিচে লেখা টি.এ.এস.৷ দেখে আমার ধারণা হয়েছিল দধি মন্থন করে নস্য তৈরি হয়!

ছবি আঁকার সরঞ্জাম কিনতে বাবা যেতেন জি.সি.লাহায়৷ তার অনতিদূরে ছিল ক্যামেরা এনলার্জার ইত্যাদি সারাইয়ের দোকান, অতুল দাস এন্ড সন্স৷ ফিল্ম কাগজ আর পরিস্ফুটনের রসায়ন কিনতে গ্র্যান্ড হোটেলের কাছে অন্য একটা দোকান৷ মনে আছে, প্রথম চিনে খাওয়া খেয়েছিলাম পার্ক স্ট্রীটের পিপিঙে, খাইয়েছিল আমার পিসেমশাই (সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়), তাঁকে তাতু  বলতাম আমি৷ কেকের সরঞ্জাম মা কিনতেন নিউ মার্কেটের একটা বিশেষ দোকান থেকে৷

শা’গঞ্জে আমাদের বেশির ভাগ রসদ স্থানীয় বাজারেই জুটে যেত; একটু বেয়াড়া সামগ্রীর জন্য ছিলেন তুলসীবাবু, তাঁর আসল নাম, শুনেছি, হরিসাধন ভড়, হুগলি চকবাজারে তাঁর দোকান ছিল৷ আমরা তাঁর দোকানে বিশেষ যেতাম না, তিনিই আসতেন সাইকেল চালিয়ে ঘরে ঘরে, ডেলিভারি অর্ডার লিখে নিয়ে যেতেন: মোহন মিকিন্সের কর্ন ফ্লেক্স (বাক্সের একপিঠে খাসা মুখোশ, ফুটকি বরাবর কেটে নিলেই হলো), কোয়েকার ওটস, মোহন মিকিন্সের কর্ন ফ্লাওয়ার, পলসনের এক পাউন্ডের চীজ়ের টিন, আমার কেডসের সাদা রং, মঙ্ঘারামের বিমিশ্র বিশকুটের টিন, বাবার জন্য প্লেয়ার্স নাম্বার থ্রি সিগারেটের কৌটো এক কার্টন ভর্তি, আর সোলান নাম্বার ওয়ানের দুটো বোতল — তুলসীবাবুর আবগারি লাইসেন্স নিশ্চয়ই ছিলনা কখনও! একটা বড় মাপের পারিবারিক আঘাতের পর নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন তুলসী বাবু৷ চেশায়ার ক্যাট হাসতে হাসতে মিলিয়ে যেত, স্মিতাননের হাসির রেশ টুকু ফেলে রেখে; তুলসীবাবু যখন আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেলেন, তাঁর জীবনের বিষাদের আভাস আমার মনের মধ্যে জেগে রইলো দীর্ঘকাল।…

তখনও এদেশে কনজ়িউমারিজ়মের ৎসুনামি আছড়ে পড়েনি৷

তা বলে কি চাহিদা কম ছিল আমাদের? উপরের ফিরিস্তি দেখেই বুঝতে পারছেন, মোটেই তা নয়৷

নতুন জামাকাপড়ের দরকার হলে গোবিন্দবাবু, যাঁর পেশাদারি নাম নেম কার্ডের বয়ান অনুযায়ী গবিন্স, মানে গবিন্স অভ় গবিন্স এন্ড রবিন্স, নিয়ার রক্সি সিনেমা, ক্যালকাটা৷ পাঁচ মাইল দূরের চুঁচড়ো থেকে সাইকেল ঠেঙিয়ে শনিবার ধরে আসতেন; মল্লিকাশেম হাটের কাছে বাড়ি, পরনে মিলের ধুতির ওপর হাত-গুটোনো তৎকালীন সামনে-বন্ধ হেমন্ত কুমার শার্ট, গলায় ঝুলত ট্রেড মার্ক ফিতে৷ খুব মৃদুস্বরে কথা বলতেন, প্রেমালাপের মত, তবে কানে খাটো, তাঁর সঙ্গে চেঁচিয়ে কথা বলতে হত৷ “খোকার জন্য দুজোড়া ট্রাউজার্স বানিয়ে দিই, সার, দেখুন এক নম্বর মাখম জিন আছে চারটে রঙে, খাপি, সেই সঙ্গে চারটে শার্ট!” বলাই বাহুল্য, তখনও আমার ট্রাউজার্সে উন্নয়নের কয়েক বছর বাকি!

ফুলিয়া বসাকপাড়া থেকে নবীন বসাক আসতো দু গাঁঠরি শাড়ি নিয়ে; সে ফেল করলে আসতো ধনেখালির শাড়িওয়ালা৷ শাল, ব্রয়ডার করা স্কার্ফ নিয়ে আসতো কাশ্মীরওয়ালা, সঙ্গে কয়েকটা আগাপাশতলা নিপুন কাজ করা হাতবাক্স আর আখরোট কাঠের ফোল্ডিং টেবিল৷ আমাদেরটা একদা তার কাছেই কেনা৷ অ্যাপ্লিকের আর চিকনের কাজ নিয়ে মেটিয়াবুরুজ থেকে আসত মিতবাক ওসমান, তার একটা পা ছিল ছোট৷

কেকম্যানের কথা অন্যত্র বলেছি, বলা হয়নি পার্ক সার্কাসের বিশকুটওয়ালা হোসেনের কথা। সেও আসত কালো সিন্দুক মাথায়: তার মধ্যে থাক থাক সাজানো নানখাটাই, বাকরখানি, সুজি তক্তি, পিলা তক্তি, হরা তক্তি, দুধিয়া ইত্যাদি হরেক মুসলমানি বিশকুটের সম্ভার। ডিমের সাদা, মিহি চিনি আর অনেকটা হাওয়া দিয়ে ফেটিয়ে তৈরি ফেনি বাতাসার মত ম্যাকারুন, হোসেনের জবানিতে তার দেশি নাম মকরন্দ্, অ-কারান্ত সংস্কৃতে যার মানে ফুলের মধু, মুখে দিলেই মিলিয়ে যেত পি.সি.সরকারের (অবশ্যই কালের নিরিখে সিনিয়র এবং তখনও একমেবাদ্বিতীয়ম!) জাদুর মত। বিজাতীয় নামগুলো আমার নবলব্ধ বৌদির মুখে প্রায়শই গুলিয়ে যেত৷ একবার মকরন্দ্ দেখতে না পেয়ে সে হোসেনকে শুধিয়েছিল, “খন্দখান আনোনি?” আমি ছিলাম সে রসনাস্খলনের একমাত্র সাক্ষী। তার সঙ্গে আমার কবিখ্যাতি লোভ মিলে গিয়ে দিকে দিকে রটি গেল ক্রমে যে বৌদি “বলেছে খন্দখান, তাহার করিব পিন্ডদান!”

সোফা সেটির নতুন আপহোলস্ট্রি চাই, রং জ্বলে ভ্যাসটা হয়ে গেছে? খাটের পুরনো গদিটা মিউনিসিপ্যালিটির বরাতে তৈরি রাস্তার মত দেবে গেছে কয়েক জায়গায়, চাই নতুন ছোবড়ার ফেস লিফট? ইশাক তো আছেই, খবর দিলে তড়িঘড়ি আসবে, পাছে বাঁশবেড়ের ঘনশ্যাম বরাতটা তুলে নেয়৷ কাঠপালিশের মাস্টার ছিল শরৎ সরণির ইসমাইল, মুখটা সর্বদা হাঁ করা, খয়েরের ছোপ ধরা অবশিষ্ট কয়েকটা দাঁত, ঘোলাটে চোখ দিয়ে সর্বদা জল ঝরছে৷ সে কাছে দাঁড়ালেই স্পিরিটের গন্ধ পাওয়া যেত৷ ন্যাকড়ার নেচি বানিয়ে গালা, রং আর কি কি সব স্পিরিটে গুলে কাজটা করত কিন্তু নিখুঁত! মায়ের ধারণা ওই স্পিরিটের ভাপে তার সদা অশ্রুময় চোখ; বাবা বলতেন, “স্পিরিটটা ঠিকই ধরেছ, ফেমিনিন ইনটিউশন; তবে যতটা পালিশে লাগে তার দশ গুণ ও গলায় ঢালে৷”

মাছি আটকানোর সুইংডোরের আর জানলার তাম্রময় ঊর্ণাজাল কোন ইন্দ্রজালে প্রায়ই ফেটে যেত৷ অল্প ফাটলে কোম্পানির কার্পেনট্রি ডিপার্টমেন্ট থেকে আসতো ‘বাঙাল’, ম্যাচিং (মানে কম বা বেশি কলঙ্ক ধরা) তার দিয়ে ফাঁসা জায়গাটা রিপু করে দিত বেমালুম৷ বেশি ফাটলে, দরজার কিংবা দেয়াল আলমারির কাঠের কাজ থাকলে বাঙালকে সঙ্গে নিয়ে আসতো ছেদিলাল ছুতার৷ সে ছিল আমার রোল মডেল, সেই যখন আমি বড় হয়ে তুরপুন করাত রেঁদা হাতে ছুতোর হওয়ার খোয়াব দেখতাম৷ আই.ও.কিউ. ছেড়ে এস্টেটে যাওয়ার পর আমাদের সাফাই করত ঝগড়ুর মা; ঘরবারান্দা ঝাড়ামোছা, জানলা সাফ, ব্রাশ দিয়ে মশারি-জাল সাফ, স্টেটসম্যান ভিজিয়ে জানলা আর স্কাইলাইটের কাচ সাফ, বাথরুম সাফ তো বটেই৷ তার ছেলে কোম্পানির পারমেন্ট সুইপার — সোজা কথা! ঝগড়ুর মা সঙ্গে নিয়ে আসতো দুই নাতনি এতোয়ারি আর জামেলিয়াকে, তারা দুটিতে আমার ভাইকে সামলাতো৷ ওই এতোয়ারির কাঁখে চেপে বুগনু স্কাইলাইটের জালের বাইরে বাসা বাঁধা চড়াইদম্পতি কে দেখত, দেখত চড়াই শিশুদের ক্রমাগত খাওয়ানোর প্রয়াস, আর আবিস্কারের বিস্ময়ে চোখ বড়ো বড়ো করে, ঢোঁক গিলতে গিলতে দিনান্তে আমাদের বলত, “তোতো পাকি মার দুদু কায়!”

আই.ও.কিউ.তে সাফাইয়ের কাজ যে করত, নোয়াখালির সেই বিশ্বনাথকে দেখে আমার ঝাড়ুদার হওয়ার ইচ্ছেও হয়েছিল একবার৷ রাজা হওয়ার মত চেহারা ছিল তার, মুখের ভাষা অবশ্য কখনও বুঝতে পারিনি চেষ্টা করেও; না মা, না আমি৷ তারপর আলটপকা মরেই গেল লোকটা৷

খোকাদা-বৌদির খাস খানসামা ছিল রমণী৷ দারুন মটন রোস্ট বানাত,  রোস্টান্তে ধারালো ছুরি দিয়ে পাঁচ মিলিমিটর মোটা করে নিখুঁত কাটা, সঙ্গে ব্রাউন সস আর জ্যাকেট পোট্যাটো; আর খোকাদার রোজ কার কাজের দিন, নিয়ম করে সকাল দশটায় বৌদির জন্য আগে থাকতে আধ সেদ্ধ করে রাখা আলু দিয়ে আঙ্গুলের মত মোটা মোটা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই! ছুটি থাকলে আমিও যথা সময় বৌদির কাছে উপস্থিত হতাম৷ একটু দেরি হলে বৌদি শুধাত, “রমনী, আলু ভাজো নি?”

###

কলকাতা কলকাতা

আমাদের কলকাতার আস্তানা, ২০২ রাসবিহারী অ্যাভ়িনিউ, আধুনিক বাংলা কবিতার ঠিকানা হিসেবে তামাম কবিতাপ্রিয় বাঙালির চেনা, অন্তত এক কালে তাই ছিল৷ ডোভ়র লেনের দিক থেকে রমণী চাটুজ্যে স্ট্রীট দিয়ে সোজা এসে রাসবিহারী অ্যাভ়িনিউ পেরুলে যে কালো লোহার দু পাল্লার গ্রিল গেটটায় থমকে দাঁড়াতে হয় (আজকালকার ফঙ্গবনে সেকশন ওয়েল্ড করা নয়, দস্তুরমত ঢালাই করা মাল), সেটাই ২০২, অবশ্য হকারদের নিবিড় অরণ্য ভেদ করে যদি এখন দৃষ্টি যায়! আমার শিশুকালের গড়িয়াহাট অনেক পরিপাটি ছিল, ফুটপাথে অনেক গাছ, অ্যাভ়িনিউ নাম সার্থক: রাসবিহারী বিথী৷ ঠাকুদ্দা ঠাকুমার ঘরের জানলা দিয়ে রমণী চাটুজ্জে বরাবর নজর চলত বহু দূর — কংক্রিটারণ্যে ঠেকে যেত না৷

ট্রামের ঝঞ্ঝনায় একেকদিন কাকভোরে ঘুম ভেঙে গেলে সেই জানলায় দাঁড়াতাম, দেখতাম বাতিওয়ালা রাস্তার আলো নেভাচ্ছে, কালো লোহার ফ্রেমের চার দিকে কাচ, উলটোনো পিরামিড ফ়্রাসটাম বাতি৷ মই ঠেস দেওয়ার জন্য বাতিস্তম্ভের যুতসই জায়গায় চ্যাপলিনের নেকটাইয়ের মত দুটো আধ-হাত খানেক গোলমুন্ড হাতল৷ ভিস্তিওয়ালারা মোষের চামড়ার ভিস্তি কাঁখে রাস্তা ধুচ্ছে রোজকার রোজ৷ আমাদের বাড়ির কাছে গঙ্গাজলের নলধারা ছিল সতত প্রবহমানা; দমকলের একচেটিয়া সেই হাইড্র্যান্ট খুলে দিয়ে জীবনানন্দের কুষ্ঠরোগীর পক্ষে জল চেটে নেয়া সম্ভব ছিলনা কোনমতে, কারণ হয়ত প্রবাহরোধের কলকব্জা, ম্যানহোলের ঢাকনাগুলোর মত, চুরি হয়ে গিয়েছিল কবে, অথবা সে হয়ত বা একদিন গিয়েছিল ফেঁসে; তাই হোজ় দিয়ে জল দেবার সুযোগ ছিল না আর! আর জন্মান্তরের উপেক্ষায় অনপহৃত পড়ে ছিল প্রাগৈতিহাসিক বিশাল বিশাল দুটো ঢালাই লোহার চৌবাচ্চা, ট্রামের দীর্ঘবিলুপ্ত ঘোড়াদের জল খাবার জন্য, জানলা দিয়ে যে দৃষ্টিপথ তার কিছুটা বাইরে৷

ওই ভিস্তিওয়ালাদের জনৈক আমাদের স্নানঘরের দু-দু’টো মস্ত ড্রামে রোজ ভরে দিত স্নানের জল — একেকদিন দুবার — কারণ প্লাম্বিং এর দোষে সরকারি জলে কোনওমতে রান্নাঘরের জলাধার গুলো আধভরা হত৷ পেতলের গাগরি ভরে টিপকল থেকে খাবার জল আনত খ্যান্ত পিসি, পরের দিকে ষষ্ঠীর মা; পেছনের বারান্দার রেলিঙের বেদিতে সার সার মাটির কুঁজো, কলসি আর সুরাইতে জল ইভ়াপোরেশনে ঠান্ডা হয়ে থাকত দারুণ গ্রীষ্মে — দাদু বলতেন, “এলিমেন্টারি ফিজ়িক্স!” বাতিওয়ালা সন্ধের মুখেও আসতো মই কাঁধে বাতি জ্বালাতে৷ ওরিয়েন্টাল কোম্পানির গ্যাস, কর্পোরেশনের বেতনভুক বাতিওয়ালা৷

দাদু চালচুলো,   মানে  ফিটিং জামা  প্যান্ট  জুতো আর লম্বা চুল,  পছন্দ করতেন না৷ আমার শার্টের পুট প্রায় কনুই অবধি, আর হাঁটু-প্লাস-চার-ইঞ্চি হাপপ্যান্ট — বেল্ট না কষে, গ্যালিস না ঝুলিয়ে পরা যেত না কোনমতে; পাদুকালয়ে মাপ দিইয়ে দু-সাইজ বড় জুতোর বরাত দিতেন, নতুন জুতো পরতাম তুলো গুঁজে — সেসব বাড়তি বয়সে অনেক কাল চলতো৷ (ভাগ্যে দাদাদের হ্যান্ড-মি-ডাউন জামাকাপড় ছিল, নইলে লোকসমাজে বেরুনো দুষ্কর হত; আমি নাকি অচেনা জামা প্যান্ট পেলেই জিজ্ঞেস করতাম, “এটা কের ছিল?”) পরামাণিক কাকাকে ডেকে পাঠাতেন ঘনঘন, পেছনের বারান্দায় টুলের ওপর আনন্দবাজার মুড়ি দিয়ে বসতাম, দুএকবার আমি দাদা বাবা জ্যেঠা ও দাদু স্বয়ং মাথা পেতেছি পরের পর, যদিও বাবার মাথায় তখনই ইন্দ্রলুপ্তির করাল গ্রাস! পরামানিক কাকিকেও কয়েকবার দেখেছি — নানার, মায়ের, জ্যেঠির বা নমিতাদির হাত-পায়ের নখ কেটে দিচ্ছে, পায়ে তেল মাখিয়ে, মালিশ করে, ফাটার ওপর ঝামা ঘষে মরামাস তুলে আলতা পরিয়ে দিচ্ছে।

ওই পেছনের বারান্দার ঠান্ডা সিমেন্টের রেলিঙে চিবুক রেখে দাঁড়ালে দেখা যেত হিন্দুস্তান পার্কে সুনীতি চাটুজ্যে মশাইয়ের বাড়ি (এখন, হায় ভাষাচার্য, সেখানে ফ্যাব ইন্ডিয়ার দোকান) আর সযত্নলালিত বাগান, বিস্তীর্ণ বাগান — অন্তত আমার শৈশবে সেটা বিস্তীর্ণ দেখাত৷ তারও ওপারে অখিল হাউস  নামাঙ্কিত বাড়ি৷ কবে একদিন সুনীতিবাবুর বাগান জুড়ে, দাদুর বারান্দা থেকে স্পষ্ট দেখা যাওয়া অখিল হাউস ঢেকে, গজিয়ে উঠলো একটা স্বভাবসিদ্ধ, কদর্য বহুতল৷

সুনীতিবাবুর বাড়িতে দু’একবার গেছি বাবার সঙ্গে৷ তাঁর বাগানের একান্তে কয়েকটা কলাগাছ ছিল, হয়ত নিস্ফল বাহারি কলা৷ রাতের অন্ধকারে পেছনের বারান্দা থেকে তাদের আবছা দেখা যেত, হালকা হাওয়ায় পাতা দোলাচ্ছে; শিশুমন দিয়ে দেখলে মনে হত অনেকগুলো ডাইনি বুড়ি — ইংরেজিতে গোটা একটা কোভ়়েন — আমাকে ডাকছে, আয় আয়৷ কল্পনাবিলাসী চোখে আমি অখিল হাউসের ছাদে অনেক ছোট ছোট পরি ও পর দেখতাম৷ শৈশবটা আসলে রূপকথারই দুনিয়া: রাজপুত্তুর রাজকন্যে নিয়ে মেয়েরা ভাবে হয়ত, আমার জগতে পরি পর, ডাক ডাকিনী, দৈত্য দানবরা যত্রতত্র বিচরণ করত৷ রুনকি, আমার পিসির (করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়, দাদা দিল্লির রেওয়াজে ডাকতো বুয়া, অতএব আমিও) মেয়ে, ঠিক দশ মাসের ছোট আমার চেয়ে; আমার ওপর তার অগাধ বিশ্বাস৷ তাকে বলেছিলাম সুনীতিবাগানের সেই ডাইনিতত্ত্ব, এবং পত্রপাঠ সে বিশ্বাস করেছিল; যদিও আমি নিশ্চিত জানতাম দিনের আলোয় কোভ়েনটা আটপৌরে কলার ঝাড় হয়ে যায়৷ রুনকি সে কথা কি করে জানবে, ওরা যে গড়িয়াহাট মার্কেট পেরিয়ে, আলেয়া সিনেমা পেরিয়ে, গিনি ম্যানশনেরও ওপারে  সেই সুদূর একডালিয়ায় থাকে!

দাদারাও, মানে জ্যেঠা জ্যেঠি দাদা, আগে কলকাতায় থাকতনা; ওদের ডেরা রাজধানী শহরে৷ গ্রীষ্মের এবং/অথবা পুজোর ছুটিতে আসতো৷ দিল্লি থেকে স্কুলের শেষ পরীক্ষা দিয়ে তারপর ওরা কলকাতায় এলো পাকাপাকি৷ আর আমরা, মানে বাবা মা আমি, থাকতাম একঘোড়ার শহর শা’গঞ্জে, কলকাতা থেকে স্থলপথে চল্লিশ মাইল দূর, রেলপথে হাওড়া টু  ব্যান্ডেল চল্লিশ কি.মি. ছাপা থাকত উত্তরছাপ্পান্ন টিকিটে৷ হ্যাঁ, ১৯৫৬-তে হাওড়া-ব্যান্ডেল রেলপথের বিদ্যুতায়ন হয়, অল স্টপ এক ঘন্টা, গ্যালপিং ৪০ মিনিট, আগে লাগত দেড়-পৌনেদুই ঘন্টা; এখন নতুন করে আবার তাই, আমরা পিছু হটছি কিনা! লিউইস ক্যারলের বাচ্চা অ্যালিস সাচ্চা বুঝেছিল, এক জায়গায় থাকতে গেলেও প্রাণপন দৌড়োতে হয়; আমাদের জননেতারা সেটা ঠিক বোঝেননি এখনও!

ফি শনিবার আমরা সপরিবারে কলকাতায় যেতাম, ফিরতাম হয় রবিবার বেশি রাতে, নয়তো  সোমবার  খুব  ভোরে৷  রাতের  ট্রেনে ফিরলে আমি উৎসুক হয়ে লজেন্সওয়ালা শম্ভুকে খুঁজতাম: হাতে মস্ত একটা তারের বলয়, তা থেকে নানা বর্ণ-গন্ধের ল্যাবেনচুষের সেলোফেন প্যাকেট ঝুলত, “প্যারি  লরেন, প্যারি লরেন, নেবেন ভাই, প্যারি লরেন, নেবু লরেন, অরেন লরেন, হজমি লরেন!” আর উঠতেন শ্বেতকেশ বলাইবাবু, নেমে যেতেন মানকুন্ডুতে; তিনি আমাকে ইসকা মন্তর ফিসকা মন্তরের জাদু শিখিয়েছিলেন জোরদার, নিমেষে জোড়া আঙুলের দৈর্ঘ্য পরিবর্তনের অমোঘ, নজর কাড়া জাদু! কদাচিৎ ভোরের ট্রেনে ফেরার সময় এক শ্মশ্রুগুম্ফময় গেরুয়াপরা ভেকধারীকে দেখতাম; সে দোতারা বাজিয়ে মাঝে মাঝে কন্যাদায়গ্রস্তদের উদ্দেশে গাইতো “টাটা-বাটা-**** বড়, সেথায় জামাই সন্ধান কর” (নক্ষত্র চতুষ্টয়ের জায়গায় যে কোনো একটা তৎকালীন, লাগসই, বহুজাতিকের নাম কল্পনা করে নেবেন), তবে সে বাউল ছিলনা বোধহয়৷

সেই শা’গঞ্জ তখন এক ঘোড়ার শহর তো বটেই! ব্যান্ডেল স্টেশনে তখন একটা, মানে একটাই, সার্থকনামা স্টেশন ওয়াগন ছিল, সবুজ রঙের, সাতটা থেকে সাতটা, সুপ্রাচীন ফোর্ড, তার পেছনের একটা দরজা কেরোসিন কাঠের; সওয়ার ভর্তি হলে অথবা ড্রাইভার সাহেবের মর্জি হলে ছাড়ত৷ আর ছিল মজিদ মিঞার এক-ঘোড়ার ছ্যাকরা৷ সাইকেল রিকশা অবশ্যই থাকত তবে সংখ্যায় নগন্য, বেশি রাতে তারা জুজুর ভয়ে বাড়ি যেত শুতে; মাথায় থাকুক অন্ন চিন্তা — আপনি বাঁচলে বাপের নাম! জি.টি. রোডে ক্যাম্বেল দম্পতির হত্যা কাণ্ড পাবলিক অতো দিন পরেও মনে রেখেছিল৷

তখন হাওড়া স্টেশন থেকেও অবশ্য ঘোড়ার গাড়ি নির্বাসিত হয়নি — সীমিত রাস্তায়, কাছের রাস্তায় চলত; আলাদা স্ট্যান্ড ছিল বোধহয় আজকের স্টিমারঘাটার টিকিটঘরের কাছে৷ অশ্ববরে মাখামাখি হয়ে থাকত তাদের পার্কিং লট। একবার ভারি বর্ষণে কলকাতা অর্ধনিমজ্জিত, যন্ত্রযান অকুলান, হাওড়ায় নেমে অসহায় আমরা গ্র্যান্ড হোটেল অবধি ঘোড়ার গাড়িতে গিয়েছিলাম — আবছা মনে আছে — সেখান থেকে ট্যাক্সি৷

আমি যখন কলেজে (১৯৬২-৬৩ থেকে ৬৪-৬৫), গড়িয়াহাটের স্বর্গ হইতে পতন  তখন থেকে শুরু৷ ১৯৬৩ বা ৬৪র ঝড়বাদলে অনেক গাছ পড়ে যায়, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, বিচ্ছিন্ন ট্রামের বিজলি, জল থইথই ডোভ়র লেন৷ এখন যেখানে এল.আই.সি.-র কদাকার, শ্রীহীন আবাসন, সেখানে ছিল নয়নাভিরাম ফাঁকা মাঠ, ফি শীতে সঙ্গীত সম্মেলন হত৷ পড়ে যাওয়া গাছগুলো আর ফিরে লাগালো না কেউ৷ বাংলা নববর্ষের সময় একমাস, দুর্গা পুজোর সময় একমাস, ফুটপাথে সেল সেল হোল সেল বসত, আবার উঠেও যেত৷ রাস্তা ধোয়া বন্ধ হয়েছিল আগেই, ক্রমে ক্রমে ভিড়ভাট্টা বাড়তে লাগলো, হিন্দুস্তান মার্টের জলুস খসে নতুন নতুন দোকান খোলা হল৷ আর জনসেবায় শাড়ি কেনেনা কেউ, পাদুকালয়-জাতীয় ব্র্যান্ড পদমর্যাদাহীন জুতোর দোকান টিমটিম৷ তখন থেকে সাবেক দক্ষিণের অনাদর শুরু, পরে এলো মধ্য কলকাতার সাহেবি পাড়ার পালা৷ তারপর থেকে অদ্যাবধি শহরের পরিধি বেড়েছে, নিঃসন্দেহে, কিন্তু অপশাসনের গতি রুদ্ধ হয়নি৷ দুচারটে ফ্লাই-ওভার দিয়ে কি শহরের চরিত্র পালটায়?

সম্ভবত ১৯৭১-এর পাক-ভারত যুদ্ধের পর তোলাবাজরা রাজনৈতিক দাদা দিদির সাজে হকারদের সঙ্গে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে — সায়েবি আমলের জমিদারি প্রথার অনুকরণে। মুক্তির দশক  সত্তরের  দশকে  মুহুর্মুহু  বিদ্যুৎমোচনও শুরু হল, থামল অনেক পরে অরাজনৈতিক বিদ্যুৎমন্ত্রী শংকর সেনের হাতযশে, যদিও বামাচারী সরকার অন্ধকারমুক্তিকে সাঙ্গঠনিক কীর্তি বলে দাবি করতেন৷ তারপর একদিন হকার্স’ বুলেভ়ার্ড উঠে গেল উড়াল পুলের খাতিরে, কিন্তু পঙ্গপালের মত নিত্যনতুন হকার রাস্তার এপার ওপার দখল নিল পাকাপাকি৷ সে অন্য গল্প৷ ইদানীংকার নীল সাদা রঙের ঘনঘটা আর রামকৃষ্ণদেবের মত ত্রিমুদ্রা বাতিদান অন্যবিধ পরিবর্তন  সূচিত করছে হয়ত, যদিচ আমার বয়স্ক ম্লান দৃষ্টিতে এখনও বাড়তি কোনও চিহ্ন দেখিনি — সেটাও অন্য গল্প, অন্য যুগের কাহিনি৷

কালো গেটের ডানদিকের পাল্লায় একপা ফাঁসিয়ে অন্য পায়ের ধাক্কায় আমরা মহানন্দে ক্যাঁচকোঁচ করে দুলতাম — দীর্ঘকালীন মজবুতির পরীক্ষায় সসম্মানে পাশ করেছিল ঢালাইয়ের কারিগর — তবে দরওয়ানজি দেখতে পেলে তেড়ে এসে বিনীত ভঙ্গিতে তুলসীদাসি সুর করে বলত, “ভেঙ্-গে গেলে গির পড়োগে, চোট লাগেগা, বুঢ়াবাবুকো নুকসান হোবে!” গেটের ডানদিকে ফুটপাথ থেকে খাড়া উঠে গেছে একটা তিনতলা বাক্সবাড়ি৷ তার রাস্তামুখী একতলায় কয়েকটা দোকান: আগে ছিল সীবনী, পাদুকালয় আর টাইমকো, তারও আগে সীবনীর জায়গায় ছিল দরোয়ানজির একটি মাত্র পা-কলের দোকান, পর্দা সেলাই, থানকাপড় বা ধুতি দিয়ে লুঙ্গি সেলাই, মায় উজ্জ্বলা ছুটকির ফ্রক (আমারও একটা কামিজ় একবার) সেলাই হত, পুজোর আগে রড থেকে ঝুলত বেশ কিছু অর্ডারি শার্ট প্যান্ট৷ এখন সেখানে সার সার শাড়ি আর রকমারি রেডিমেড জামাকাপড়ের দোকান — চেনা দায়!

মাস পড়লে দরওয়ানজি এসে বাড়ি ভাড়া নিয়ে যেত বাড়িউলির প্রতিভূ হয়ে; পারসি বাড়িউলিকে আমি অন্তত দেখিনি কখনও৷ দুর্গাঠাকুর ভাসানের সময় দরওয়ানজি নানা দাদুকে দোকানের দুটো ভাঁজ করা কেঠো চেয়ার সসম্মানে বের করে দিত: “বাবুজি, মাজি, আরাম কোরেন, নহি তো থক জাওগে!” দাদু বলতেন ‘অতিভক্তি…!’

গেটের বাঁদিকে মদনের এক চিলতে পানবিড়ির দোকান, তবে সেখানে ভিমটো লেমনেডও পাওয়া যেত, পরের দিকে কোকাকোলা জুসলা৷ নরম করে চাইলে বেগনি লুঙ্গি, হাপহাতা গেঞ্জি আর হাতে গলায় অনেক মাদুলি তাবিজ পরা মদন মাঝেমধ্যে এক আধ চিমটে মিষ্টি মশলাও দিত — নিতান্ত অনিচ্ছায়৷ এখন সেখানে অনেকটা জায়গা জুড়ে বাটার দোকান৷

লোহার গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে ডানদিকে, দোকানের পেছনে, এক নম্বর ফ্ল্যাট: সেখানে এক বৃদ্ধ তাঁর দুই বয়স্থ ছেলে আর নববিবাহিত জ্যেষ্ঠ পুত্রবধুকে নিয়ে বাস করতেন৷ মা বলতেন মলিনা নামের মেয়েরা দুঃখী হয়; মলিনা কাকিমাও আমাদের চোখের সামনে কাঁচা বয়েসে বিধবা হন, টি.বি., তবে শ্বশুর ছোট ছেলের সঙ্গে তাঁর আবার বিয়ে দিয়েছিলেন৷ কালো গেট দিয়ে ঢুকেই সামনে অবশ্য একটা প্রশস্ত বাঁধানো চাতাল, আমাদের ফুটবল ক্রিকেট কিৎকিৎ খেলার জায়গা, কিন্তু পিট্টুর পক্ষে স্থান অকুলান৷ চাতাল পেরিয়ে আরেকটা তিনতলা বাড়ি, গেট যতটা চওড়া ততটা অফ়সেট করে সমান্তরাল; বহিরঙ্গে মনে হত হুবহু এক৷ দুটোরই ঠিকানা ২০২৷ ফুটপাথের ওপর যে বাড়িটা তার দোতলায় দু নম্বর ফ্ল্যাটে থাকতেন বুদ্ধদেব বসু — সেটাই কবিতাভবন, সেখান থেকেই কবিতা  পত্রিকা প্রকাশ হত, এবং বৈশাখী, আর এক পয়সায় একটি  সিরিজের চটি কিন্তু মূল্যবান কাব্যমালা৷ সুনীল বসুর মিলিতা  তার অন্যতম; তাঁর ঘোঁড়া   কবিতাটা চন্দ্রবিন্দুদোষে জ্যেঠার নাপসন্দ —  আমার পছন্দ ছিল কেঁচো  বলে কবিতাটা: “কেঁচো চেয়েছিল মাটিকে জানতে/ খানা খন্দলে দেহলি প্রান্তে…৷” আমিও যে আসলে মাটিকেই জানতে চেয়েছিলাম সেটা বুঝেছি অনেক অনেক পরে৷

ও বাড়ির মিমি রুমি আমার চেয়ে অনেকটাই বড় — দিদি পদবাচ্য, কিন্তু অকালমৃত পাপ্পা (শুদ্ধশীল) আমার সমবয়সী৷ তিনতলার তিন নম্বর ফ্ল্যাটে ছিলেন আরেক বিখ্যাত কবি, অজিত দত্ত; সেখান থেকে বেরুত দিগন্ত৷ তাঁর এক ছেলে, বাবলুদা, বাবা যে সংস্থায় চাকরি করতেন সেখানে শিক্ষানবিশী করেছিলেন কিছুকাল, তাই তাকে চিনতাম; শঙ্কুদাকে ততটা নয়; মেয়ে ঝুমাদি, রীতিমত সুন্দরী, বেতসলতার মত ছিপছিপে আর ব্যক্তিত্বময় — গড়িয়াহাটের সব তরুণ তাকে ফিরে ফিরে দেখত৷ এখন শর্বরী দত্ত নামে বিখ্যাত৷ (যখন ও-বাড়িতে থেকে কলেজে পড়ি, আমার জ্যেঠতুত দাদা যাদবপুরে, তখন বুঝতে শিখেছি ড্রেনপাইপ শোভিত যতেক ছোকরা গড়িয়াহাটের মোড়ে মেয়ে দেখতে জমায়েত হত, তার বারো আনা বেপাড়ার — দাদা বলত, চোখ যে ওদের ছুটে চলে গো! ধনের বাট, মানের বাট, রূপের হাট গড়িয়াহাটে তো বটেই৷ তা বলে দাদার চোখ কি ইতিউতি ছুটত না, আর আপনাদের বশংবদ তো চিরকাল সুন্দরের নীরব পুজারী!)

লব, কুশ আর পাপ্পা ছিল চাতালে আমাদের ক্রিকেট কিংবা ফুটবল, নিদেন মিনিপিট্টু খেলার সঙ্গী৷ চাতাল পেরিয়ে যে বাড়িটা, তার একতলায় চার নম্বর ফ্ল্যাট সিংহ পরিবারের; মিউকাকিমার বা তাঁর বড় জায়ের বাচ্চারা আমার চেয়ে অনেকটাই ছোট৷ পাঁচ নম্বরে আমার ঠাকুদ্দা ঠাকুমার আস্তানা৷ তেতলার ছ নম্বরে বিশ্বাস পরিবার; তাঁর দুই মেয়েও দিদিস্থানীয়; ছেলে, দেবুদা, আমার জ্যেঠতুতো দাদা কাজলের চেয়ে একটু ছোট৷ পরবর্তীকালে সে বাড়িতে তাদের আত্মীয়স্হানীয়, আমার নিকটবয়সী, দুই ভাই বোন থাকত কিছুকাল, হয়তো তাদের বাবাও, বোনের নাম পদ্মা, ভাইয়ের নাম মনে পড়ছে না, দুজনেই আমাদের চাতালখেলার সঙ্গী৷ চাতালের অন্দরপ্রান্তে একটা দু গাড়ির গেরাজ ছিল, তার দোতলায় একটা ছোট্ট এক কামরার আস্তানা, সেখানে চার সদস্যের এক পরিবার থাকতেন; পদবি মনে নেই, তবে উজ্জ্বলা আর ছুটকি দিদিবাচ্য হলেও লুকোচুরি খেলার সময় আমাকে অবজ্ঞা করত না — তখন অবশ্য আমার ফুটবল ক্রিকেটের বয়েস হয়নি! আমার বয়স হবার ঢের আগে অন্য কোথাও উঠে গিয়েছিল ওরা, আমার জ্ঞানত ২০২ থেকে সেই প্রথম প্রস্থান — দাদুররও আগে৷

ছবি তোলার জন্য স্বাভাবিক আলো দরকার হলে, অথবা গুরুজন পরিবৃত ফ্ল্যাটে সিগারেট খাওয়ার সুযোগ অকুলান হলে বাবা ছাদে যেতেন৷ দাদুর ফ্ল্যাটের এজমালি ছাদে একটা ভাঙা ট্রাইসাইকেল ছিল; ছিল মানে তার ভগ্নাবশেষ আরকি! কখনো ভাবিনি কার সাইকেল — দাদার না দেবুদার — হয়ত শিশুসুলভ অধিকারবোধে ভাবতাম আমারই! মনে আছে, তার বিচ্ছিন্ন দ্বিচক্র চক্রদন্ডটা দুহাতে বারবেলের মত মাথার ওপর তুলতাম অল্পায়াসে — বাবার তোলা একটা ফিকে হয়ে যাওয়া ছবি এখনো বোধহয় মায়ের ফেলে যাওয়া সযত্ন সংগ্রহের মধ্যে খুঁজলে পাওয়া যাবে — স্মৃতিটা হয়ত সেই ছবিটারই শুধু৷ ওই ছাদে দাঁড়িয়ে পাশের বাড়ির — যে দিকটায় এখন বাটার দোকান — খনাদি মনাদির সঙ্গে জমে গিয়েছিল আমার, আমারই মারফত আমাদের হাঁড়ির খবর তারা জানত —  মায়ের কাছে বকুনি খেতাম তাই৷ একেকদিন খাবার নিয়ে দুষ্টুমি করলে মা  এক  হাতে থালা অন্য হাতে আমার ঘেঁটি ধরে ছাদে ঘুরে ঘুরে খাওয়াতেন৷

…কোনো অজ্ঞাত কারণে হঠাৎ একসময় ছাদটা আমাদের অনধিগম্য হয়ে যায়; প্রথম প্রথম মিস করতাম খুব, পরে সয়ে গেল আর পাঁচটা বঞ্চনার মত৷ ছেলেবেলার কথা লিখতে বসে দীর্ঘকাল পরে সেই ছাদের কথা মনে পড়ল, যে ছাদটাকে শৈশবের স্বল্প পরিচয়ের পর আর দেখিনি কোনোওদিন, দেখবও না!

আর মনে পড়ল, গ্রীষ্মের দুপুর বেলা যখন ঠাকুদ্দা ঠাকুমার শয়নকক্ষের সব কাঠের জানলা বন্ধ, খড়খড়ির সূক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে তীব্র সূর্যালোক লখিন্দরের বাসরের ছিদ্রান্বেষী সাপটার মত অলক্ষিতে ঘরে ঢুকে পড়ত, তার মধ্যে আপন মনে নাচত লক্ষ ধুলিকণা৷ একেকদিন নিদ্রাহীন আমি দেখতে পেতাম সাদা পরদার ওপর রঙিন শাড়ির উলটো ছবি, রঙিন এবং সীমিত চৌহদ্দিতে চলিষ্ণু, খনাদি মনাদিদের বাড়ির মতির মা বেলায় কাচা কাপড় মেলছে: পিন হোল ক্যামেরার দ্য ভ়িনসীয় যাদু! দীর্ঘ, দীর্ঘতর নিশ্বাসের মত নির্জন আর বিধুর স্মৃতি সব, ফিকে হয়ে যাওয়া ফ়োটোগ্রাফের মত — জানিনা তার কতটা বাস্তব আর কতটা মায়া!

তবে, ওই বাড়ির কোনার ঘর, যেটা আগে ছিল বাবা মায়ের শয়নকক্ষ, মধ্যযুগে খাবার ঘর, সবশেষে দাদা বৌদির বাসর, সেটাই আমার জন্মস্থান; আমার চিকিৎসক দাদু নিজের হাতে আমায় আলো দেখিয়েছেন৷

###

যুগপতন

ঠাকুদ্দা (শচীন্দ্রনাথ সেন)-কে আমি দাদু বলতাম, ‘ওগো’ দাদু, কারণ ঠাকুমা (সুধা, ডাকনাম ননি) তাঁকে ‘ওগো’ বলেই ডাকতেন৷ পঙ্কজ মল্লিকের “ওগো তুমি পঞ্চদশী, তুমি পৌঁছিলে পূর্নিমাতে…” আটাত্তর আর.পি.এম. রেকর্ডটা বহু পুরনো — বাবাকে জিজ্ঞেস করে পঞ্চদশী মানে জেনেছিলাম এবং আন্দাজ করেছিলাম দাদুর পনেরো বছর বয়স; এমন আর কি! ঠাকুমাকে, হিন্দি বলয়ের লজিক উলটে, ডাকতাম নানা, দিল্লিবাসী দাদার দেখাদেখি৷ নানা ছিলেন বাঙালি মহিলাদের তুলনায় বিশালদেহী, লম্বা এবং চওড়া, ততটাই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, ডাকসাইটে সিভ়িল সার্জনের মেয়ে৷ আমার মনে পড়ার বয়সে ক্রমহ্রসমান স্থুলত্বের দরুন তাঁর গলার (আমি বলতাম গলকম্বল) এবং বাহুর (যেখানে বাজুবন্ধ পরত সেকালের এয়োতিরা) চামড়া ঝুলে পড়েছিল; ওজন কমলেও তেজ কমেনি এক রতি! বিস্তর বাংলা সাহিত্য পড়েছেন — নিজে কবিতা লিখতেন একদা — এমনিতে রাগিধাপি তবে সহজেই অশ্রুময়ী৷ দাদু তাঁর নিত্য হরিজন  পত্রিকা পড়া অন্ধ গান্ধিভক্তি নিয়ে কটাক্ষ করতেন সুযোগ পেলেই; সুযোগ জুটতোও সহজে৷

রাত থাকতেই অ্যালার্ম বাজিয়ে ঘুম ভাঙত নানার, তারপর বিছানায় শুয়েই হাততালি দিয়ে রামধুন৷  তাতে দাদুর এবং ঘরে বাইরে অনেকের ঘুমের ব্যাঘাত হত, কারণ নানার কন্ঠ জোরালো হলেও তাঁর কবিতার মত মিঠে ছিলনা মোটেই! রামধুনের পর আবার ‘বিপদে মোরে রক্ষা কর…৷’ তারপর বিনা চেষ্টায় ঘুমিয়ে পড়তেন নিজে, নাক ডাকতো অনতিমৃদু স্বরে; অন্যেরা তখন চারটের ট্রামের ঝঞ্ঝনার সঙ্গে ভেড়া গুনছে৷

শুনেছি, বাড়িতে প্রথম মশকনিবারণী স্প্রে-গান ও  ফ্লিট আসার পর দাদু  হস্তিশিকারির ভঙ্গিতে বিজাতীয় যন্ত্রটা ম্যানলিকারের মত বাগিয়ে ধরে নানার দিকে তাক করে বললেন, “আসো, তুমারে আগে শ্যাষ করি!” সেদিন নানার অশ্রুধারা বাগ মানাতে আমার বাপ মা ও বুয়াকে বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল! আমি আর দাদা মহানন্দে ছবি আঁকতাম: নানার চোখের জলে ধরিত্রী ভেসে যাচ্ছে, সেই জলে তৃপ্ত সাঁতার কাটছেন দাদু, ঠোঁটের কোনে চেশায়ার মার্জারের মত হাসি — ছবির নাম হত নানাশ্রম  কিংবা অশ্রুগঙ্গা৷

আমার ভ়িরুলেন্ট হেপাটাইটিস সনাক্ত করেছিলেন স্বয়ং পিতামহ, ডাক্তারি জীবনে তাঁর একেন উন অন্তিম রোগনির্নয়; অন্তিম ডায়াগনসিসটা ছিল তাঁর নিজের কর্কট রোগ৷ প্রথমে লিভ়র, সেখান থেকে প্যাংক্রিয়াস, তা থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে মধুমেহ, এবং শেষকালে অবশ্যম্ভাবী বহু-অঙ্গ হানি৷ আমরা সবাই তাঁর মৃত্যুর জন্য তৈরি ছিলাম৷ লুক লিখিত সুসমাচারে আছে, ভিষক, নিজের চিকিৎসা কর আগে;  দাদু নিজের রোগ নির্মূল করতে পারেননি কারণ তখন কর্কট রোগের কোনও দাওয়াই ছিলনা, কিন্তু নির্ণয় করতে ভুল হয়নি।

মফসসলে চাকুরিরত আমার বাবা কিংবা দিল্লিস্থ জ্যেঠার পক্ষে অনির্দিষ্টকাল কাজ ছেড়ে পিতৃসেবা সম্ভব ছিল না৷ অতএব, আমার মায়ের কাঁধে সে গুরুদায়িত্ব পড়ল৷ আমি তখন সদ্য কামলার স্বর্ণাভা মুক্ত কিন্তু সম্পূর্ণ সুস্থ নই, স্কুলে যাইনা, বাড়ির বাইরেও নয়, কারণ ঠাকুদ্দার আশংকা ছিল তাতে আবার সেকন্ডারি ইনফ়েকশন হতে পারে৷ আমিও তাই সে যাত্রাতেও মায়ের পদাঙ্কে কলকাতায়৷ গৌরীমাসি ঠিক করে দিয়েছিলেন কৃষ্ণাদিকে — একটি সদ্য এম.এ. পরীক্ষা দেয়া মেয়ে — ঘন্টা খানেক আমাকে লেখাপড়ার তালিম দিত রোজ৷ রজনীকান্তের গান ভালো গাইত বলে নানা একেকদিন তাকে কবজা করে নিতেন; তাইতে হয়তো আমার বিদ্যে বুদ্ধি বিশেষ এগুলো না!

কেউ কেউ বলেছিলেন, এত ছোট ছেলেকে সাক্ষাৎ মৃত্যু, যন্ত্রনাদায়ক মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে রাখা অন্যায়, তাতে শিশুমানসে ধাক্কা লাগে, আখেরে ক্ষতি; কেমন মা বাপ তোমরা? কি জানি, তেমন ধাক্কা বোধহয় লাগে নি, নয়তো শিশু মনস্তাত্ত্বিকরা ঘন্টা জানে!

ভৌমিক ছিলেন পাড়ার একটা ওষুধের দোকানের কম্পাউন্ডার, আমরা বলতাম ডাক্তার ভৌমিক, নাকের নিচে আদরে ছাঁটা প্রজাপতি গোঁফ, চেহারায় কোথাও যেন জহর রায়ের আদল, একেকটা অ্যাঙ্গলে দ্য গ্রেট ডিক্টেটর৷ তিনি ওই লাফানে মধুমেহ পর্যায়ে রোজ দাদুর প্রস্রাবের চিনি মাপতেন৷ তাঁর কাছে দেখে দেখে শিখেছিলাম দুরূহ টাইট্রেশনের খুঁটিনাটি আর রং দেখে চিনির মাপ ঠিক করা৷ দুদিনেই হাত পাকা হয়ে গেল; ভৌমিক ডাক্তারকে আর রোজ কষ্ট করে আসতে হত না — মাঝে মাঝে আমার নির্ণয় অডিট করতেন শুধু৷ সংকট যখন ঘনিয়ে আসছে, মা আর নানার পক্ষে সামলানো মুশকিল, তখন জ্যেঠি আর বুয়ার তলব পড়ল; অনতিবিলম্বে বাপ জ্যেঠারও৷

দাদু যখন সুস্থ ছিলেন, কলকাতা এলেই আমাকে বিকেলের মরা রোদে লেকে হাঁটতে নিয়ে যেতেন তিনি৷ হাঁটা তো নয়, চলমান আউটডোর ক্লিনিক! দু পা যেতে না যেতেই কোন না কোনও পরিচিত লোক গতিরোধ করত তাঁর৷ চেনা লোকের সংখ্যাও কি কম! কেউ ভিস্তিওয়ালা, কেউ রিকশা টানে, কেউ পাশে মুখুজ্যেবাড়ির বাসন মাজা ঝি, কেউ ভদ্রলোক — দাদুর ভাষায়, “দ্যাশ  ভাগের  পর  অবোস্তা  পড়ি গেছে৷”  সবাই তাঁর বিনি পয়সার রুগি৷ দাদু তাঁদের কুশল প্রশ্ন করতেন, হালহকিকতের কথা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, নিপাট গল্প করতেন কারু কারু সঙ্গে৷ ফেরার সময় সিধে রাস্তায় নয়, এ গলি সে গলি দিয়ে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা অথবা জানলার অন্তরালে অপেক্ষারত তাঁর কম বয়সি, মাঝ বয়সি, শেষ বয়সি চেনা জানাদের সঙ্গে দুটো কথা বলার জন্য — তাঁদের বেশির ভাগই মহিলা!

দাদু তাঁর অননুকরণীয় খুলনাই দখনে ভাষা ও ভঙ্গিতে ইলিয়াড অডিসির গল্প বলতেন আমায়, আরব্য উপন্যাসের গল্প, বুদ্ধের ভিষক জীবকের গল্প, চরক সুশ্রুতের দ্রব্যগুণের কথা, তাঁর চিকিৎসক জীবনের দু একটা অভিজ্ঞতার কাহিনি (“মহেশপুরে সেবার এক পাগল ভর করিছিল আমার ঘাড়ে; রোগ নাই বললি মানে না, ওষুদ দিতি হবে; শিশিতে দাগ কাটি কাটি দিতাম তারে খড়ি গোলা জল; মাস ঘুরতি পেত না, আবার আসতো; শেষ মেষ…”)৷ বৈদ্যকুলে জন্ম তবু একবার বলেছিলেন, “বড় হয়ে ডাক্তার হোয়োনি; আমাদের বংশে কেউ চাইতে শেখে নাই — মহাশয় সব, মুখচোরা — মহাশয় হলিই মহৎ বিষয় আশয় হয় না!”

জ্যেঠা জ্যেঠির সঙ্গে দাদাও এসেছিল, তাই আমার পক্ষে দাদুর অন্তিম যন্ত্রণা চাক্ষুষ করা, সহ্য করা সম্ভব হয়েছিল৷ শেষ দিকে নানা প্রশ্ন করতেন, “কিছু খেতে সাধ যায়?” দাদু গোঙাতে গোঙাতে বলতেন, “ব্র্যান্ডি দাও, নইলে বিষ!” মৃত্যুতে সেই অসহ যন্ত্রণার থেকে রেহাই পেয়েছিলেন দাদু, আমরা সকলেই রেহাই পেয়েছিলাম৷…

শ্রাদ্ধাদি চুকে বুকে যাওয়ার পর একদিন বাবা আমাদের তিন ভাই বোনের মন মেজাজ ভালো করার জন্য টেন কম্যান্ডমেন্টস দেখাতে নিয়ে গেলেন, বোধহয় লাইট হাউসে৷ সেসিল বি.ডি’মিলের সেই বহুতারকাখচিত, বহুব্যয়ী ছবিতে ইউল ব্রাইনর সেজেছিলেন মুণ্ডিতমস্তক দ্বিতীয় রামেসিস৷ আমাদের সামনের পেছনের কয়েকটা পংক্তির তাবৎ লোকজন, সিনেমা দেখবে কি, ঘুরে ঘুরে বাবাকে দেখছিল, অবিশ্যি শ্রাদ্ধান্তের মুণ্ডন বাবার গভীর ইন্দ্রলুপ্তিতে খুব একটা দাগ কাটতে পারেনি!

…একঘোড়ার শহরে, বারো কোয়ার্টারের চার দেয়ালের মধ্যে আমি তিল তিল করে বড় হচ্ছিলাম৷ যে শহরটায় অতঃপর আমাকে অনেকগুলো দশক কাটাতে হবে, তার স্বপক্ষে অনেক ভালো ভালো লাগসই যুক্তি ছিল, কুপমন্ডুক হয়ে বেঁচে থাকা যদি দূষনীয় না হয়৷ তবু শোক আর বঞ্চনার একটা ধোঁয়াশা তখন কাটতে চাইছিল না কিছুতেই; বারো কোয়ার্টার ছেড়ে নতুন এস্টেটে যাওয়া সেই ধোঁয়াশারই আরেকটা উপাদান৷ শৈশব আর বাল্যের মধ্যে যে সময়, কৈশোর আর যৌবনের মধ্যেও, তখন নাকি বাড়ন্ত হাড়ের টানে গ্রোথ প্যাং হয়, বয়ঃসন্ধির অব্যক্ত যন্ত্রণা৷ তার অনুরণন মনের ভেতরেও নীরবে বাজে৷ সেই যন্ত্রণার তখন সবে শুরু, শেষ হতে অনেক পথ বাকি৷

দাদুর অসুখ এবং তাঁর মৃত্যুর খুঁটিনাটি আমার মনে আছে সব: তাঁর প্রাক্তন সহপাঠী, চুনিলাল গাঙ্গুলি আর বিধান রায়, পর পর দুদিন দেখতে এসেছিলেন দাদুকে; একেবারে শেষদিকে বুয়া-তাতু জ্ঞান মজুমদারকে ডেকেছিলেন৷ বিধান রায় নানাকে একান্তে বলেছিলেন, “শচি নিদান হাঁকা ঘরের ছেলে, ওর ডায়াগনসিসের নড়চড় হয়না৷”

দাদুকে ভালবাসতাম খুব, তবু সেই জোনাকিদের হারানোর শোকের মত তাঁর মৃত্যু দুঃসহ হয়ে বাজেনি; হয়ত দীর্ঘ প্রস্তুতির জন্য, হয়ত বয়সটা একটু বেড়েছিল বলে৷

ক্রমশ

Other posts in <aniruddhasen.wordpress.com> and <apsendotcom.wordpress.com>





সেই জোনাকিরা (৪–৬) ৷৷ অনিরুদ্ধ সেন

2 05 2013

There are 19 sections of these memoirs, divided into 6 posts, this being the second.

জগৎ পারাবারের তীরে

কেহ বা কাহারা সেই কোন আদ্যিকালে ছোটদের শিশুনারায়ণ আখ্যা দিয়েছেন পরম ভ্রান্তিতে৷ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ শিশু ভোলানাথ  লিখেছিলেন অনুরূপ সংস্কারে৷ মথি লিখিত সুসমাচারেও হোলি ইনোসেন্টদের কথা আছে — বেথলেহেমের সেই সব হোলি  নবজাতক, হেরড যাদের নির্বিচারে হত্যা করেছিল; তারা রক্তের হোলি-তে রাঙ্গা বটে কিন্তু সত্যিই কি আলোচ্য অর্থে ইনোসেন্ট  ছিল?

কে না জানে, শিশুদের মত জাত শয়তান বিরল — স্বয়ং হেরডও যা দুহাজার বছর আগে  জানত! বাংলার ভৌতিক (চন্দ্রবিন্দুর সুবাদে নয়,  প্রাচীনতর অর্থে) ঐতিহ্যে সনাস “বাঁবা,  মাঁ,  পাঁ বেঁতা কঁরছে, কোঁলে নাঁও,” ক-জন বাপমা হাড়ে হাড়ে প্রত্যক্ষ করেননি? যাহা চাই তাহা এক্ষুনি চাই, তর সইবে না, কেঁদে কেটে আকাশ মাথায় করবে! যে সব শিশু এতটা করে না তারা একটু ভেড়ুয়া গোছের, আমি যেমন ছিলাম৷ শিশুনারায়ণ জাতীয় বনিয়াদি ভ্রান্তির উৎস কেউ কখনও যাচাই করে দেখেছেন, নাকি তা নিয়ে গভীর গবেষণা হয়েছে কোথাও?

যাচাই না করাটাই ভারতীয় দস্তুর৷

বাপ, তস্য বাপের শ্রাদ্ধের দিন, পবিত্র নারিকেল রজ্জুতে পাঁচটি শ্বেত-লোহিত মার্জার বেঁধেছিলেন দৌরাত্ম্য থেকে বাঁচতে (মৎস্যমুখের মাছ কি মাগনা!), যমদুয়ারের দিকে যে পনস বৃক্ষ, তার ডালে৷ ব্যাস, হয়ে গেল! তাঁর সন্তানসন্ততি বিনা জিজ্ঞাসায় বংশপরম্পরায় বাপের শ্রাদ্ধে বেড়াল বাঁধবে, পাট বা শনের দড়ি চলবে না, দরকার হলে ফড়েদের কাছে চড়া দামে স্পেসিফিকেশন মাফিক বেড়াল কিনতে হবে, গুরুপুর নার্সারি থেকে টবস্থ কচি কাঁঠালগাছ ভাড়া করে উত্তরে সংস্থাপন করবেন পুরুত মশাই কিঞ্চিদধিক দক্ষিণার বিনিময়ে৷

সংস্কারগ্রস্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা বাতিকের মধ্যে বয়ঃপ্রাপ্ত হয় — মানবিক করুণার অত্যল্প দুধটুকু পর্যন্ত ওই দড়িবাঁধা পাঁচ বেড়ালে খেয়ে যায় — তাকে নাকি হিঁদুয়ানি বলে! কালে কালে তারা অমানুষ প্রমাণিত হলে আমরা কপাল চাপড়াই৷ যে শিশু বেড়ে উঠছে সাংসারিক কুটকাচালি, নর্দমার রাজনীতি, দুর্নীতির আবহাওয়ায়, সে কি ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে বাঁচে? ছোটরা ভালো হলে, পড়াশুনোয় খেলাধুলোয় ব্যবহারে ভালো হলে, লোকে নিরন্তর বাহবা বাহবা বললে, বড়রা মানুষ করার ক্রেডিট দাবি করেন; অন্যথায় ডিসক্রেডিটটা কি নারায়ণের?

ভেবে দেখবেন, ছোটদের পছন্দের সাহিত্য কি? কুরুক্ষেত্রে ভ্রাতৃহত্যার মহাকাব্য, পর্ণকুটির থেকে পরস্ত্রীহরণ ও রাম কর্তৃক সীতার অপমানের আখ্যান, সম্পূর্ণ স্বদেশী রাক্ষস খোক্কস, ঠাকুমার ঝুলি এবং ক্লেদাক্ত রক্তাক্ত অন্যান্য সব গল্প৷ (এখন অবশ্য দিনকাল, বিচারের মাপকাঠি, মায় পারিবারিক শিক্ষার রকম-সকম পাল্টে গেছে, পাল্টে গেছে বইগুলোও, হয়ত কমিকসের অধিকতর অনুপ্রবেশ ঘটেছে, এবং অবশ্যই দৃশ্যমান ও শ্রুতিগোচর জঙ্গম মনোরঞ্জনের; কিন্তু শিশুদের রক্তারক্তি রুচিবোধ তিলমাত্র পাল্টায়নি, তা সে মায়েরা যতই আড়াল করার চেষ্টা করুক!) সে কি নারায়ণত্বের লক্ষণ? ছোটরা যে আসলে তাবড় তাবড় মানুষের বনসাই মিনিয়েচার, বড়দের মতই তীক্ষ্ণ অথবা অল্পবুদ্ধি, বড় হতে না হতে সেটা ভুলে যান বয়ঃজ্যেষ্ঠরা৷ ছোটদের পাপ পুণ্যের বোধ কিংবা ধর্মবোধ না থাকতে পারে, কিন্তু নিজস্ব ঠিক বেঠিকের জ্ঞান টনটনে!

নানা ভাষাভাষী, বিবিধ অঞ্চলের, বারো জাতের পরিবার একত্রে বাস করলে তাদের ছেলেমেয়েরা বহুভাষিক তো হয়ই, বহুখাদকও হয়৷ আমরা বাঙালিদের পাপড়ের মত কড়া আমসত্ত, হরেক রকম বড়ি, উপাদেয় শুঁটকি মাছের বিভিন্ন দফা  রান্না; দক্ষিণী মুড়ুক্কু এবং সাম্বর চাটনি সহযোগে ইডলি (দোসার নাম তখনও শুনিনি); ফিরঙ্গ সমাজের নানাবিধ দ্বিপদ চতুষ্পদ নিষিদ্ধ আমিষ — রোস্ট পাই গ্রিল স্টু কাটলেট ক্রোকে বুলি কর্ন্ড ইত্যাদি বিভিন্ন অবতারে, তৎসহ নানান মজাদার ডেজ়ার্ট; পঞ্জাবি সর্সোঁ দা সাগ এবং দেসি ঘি ভাসানো মা দি দাল; আম কুল গাজর বিট এঁচোড় রসুন লঙ্কা ওল কচুর মিশ্র উৎসের আচার এবং বিস্তর খাদ্যাখাদ্যে অভ্যস্ত  হয়ে  উঠেছিলাম৷ সেই যে ভূমার স্বাদে রসনার শিক্ষানবিশি শুরু হলো,  এখনও তার রেশ চলছে ক্রমায়ত আগ্রাসী হাঁ-হাঁ-কারে৷ নইলে প্রায়োপবাসে সাধের প্রাণটা বেঘোরে যেত; কাজের খাতিরে নিজের এবং পরের দেশে বিস্তর ঘুরতে হয়েছে তো, অখাদ্য কুখাদ্য খাওয়ার দস্তুর সেখানে, ভাত ডাল চচ্চড়ি পাব কোথায়! উপরি লাভ হলো কুনো বাঙালি হয়ে বাঁচতে হয়নি৷

চার বছর বয়স হতে না হতে আমি গুরু মেনেছিলাম চার নম্বরের বড় কাকিমার ছেলে ননতুকে, কারণ আই.ও.কিউ.তে চারদিকে ধ্রুব আর প্রহ্লাদের মত ক্ষুদে জল্লাদ, বির মত আগ্রাসী শিশুশত্রু বালখিল্য বাহিনী, শত্রুর কি শেষ আছে! ননতু আমাকে দুরাত্মাদের হাত থেকে রক্ষা করার আশ্বাস দিয়েছিল — না চাইতেই৷ নিজেদের বাগান থেকে বর্তুল এবং দৃশ্যত লোভন কুলে লঙ্কা তুলে এনে ভাগ করে খাইয়েছিল৷ “তোর দুটো, আমার দুটো; কুলের মত টক টক আর লঙ্কার মত ঝাল ঝাল হবে নিশ্চয়ই, বাবু বলেছে!” তার পরের ঘটনাটা আই.ও.কিউ.-এর খেলোয়াড়ি ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা — জল এবং চিনির সন্ধানে দুজন দুদিকে ধাবমান — স্প্রিন্টের সে রেকর্ড ছেলে বুড়ো ভাঙতে পারেনি কেউ৷

হেদার ক্যাস্টেলারিও ননতুর কাছে আশ্রয় চেয়েছিল: “নানটুবাবু,নানটুবাবু, বি হমকো মারটা হায়৷” ননতু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললে, “তো হম কেয়া করেগা?” ধাক্কা খেয়ে তখন আমার সর্বজনবিদিত ডাকনাম ফিরঙ্গ জিহ্বায় বিকৃত করে সে নালিশ করত, “বাঙ্গি, বাঙ্গি, ডেকো, ডেকো, নানটুবাবু বাট নহি সুনটা!”  এদিকে আমি শ্যাম রাখি, না কুলে লঙ্কা রাখি!

ক্যারল ওয়ালিংটন সে তুলনায় সাবালিকা, প্রায় হান্টারওয়ালি পর্যায়ের; বলত, “মাদার সেজ়় আই’ম আ উইচ…হোয়েন আই গ্রো আপ আই শ্যাল মেক আ টোড অভ় নানটুবাবু!” তবে এরা কেউ, যাদের নাম করিনি, সেই হাসি ড্যানিয়েল, মৃত্যুঞ্জয় মুখুজ্যে মশাইয়ের যমজ মেয়ে বড়ি-ছুটি, সেনরায় বাড়ির খোকনদা স্বপনদা, তারাও, আমার ব্যক্তিগত বাস্তব এবং গোপনতম স্বপ্নের দুনিয়াটা চিনত না৷…

আমাকে ট্যাঁকে গুঁজে অনেক জায়গায় যেতেন বাবা৷ সুনীতিবাবু, রাজশেখরবাবু এবং পুলিনমামার বাড়ি — যেখানে হয়ত অজান্তেই ভাষাজ্ঞানের উন্মেষ হয়েছিল আমার এবং সাহিত্যপ্রীতির৷ সুনীতিবাবু আমাকে আইরিশ উপকথার দেরদ্রিউয়ের গল্পাংশ শুনিয়েছিলেন; ঠিক শিশুপাঠ্য নয় গল্পটা, তবে মনে এতটাই দাগ কেটেছিল যে বড় হয়ে সে কাহিনি সংগ্রহ করে পড়ে তবে শান্তি! শিল্পী রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বাবার প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন, একই সিটিঙে বাবা কাঠকয়লায় তাঁর৷ রমেন বাবুর একটা ভিলেজস্কেপের এচিং আমাদের বসবার ঘরে ঝুলত৷ একেকদিন আলোকচিত্রী শম্ভু সাহার সঙ্গে বাবা মেতে যেতেন প্রিনটিঙের ম্যাজিকে৷ ডোভ়র লেনে থাকতেন পরিতোষকাকা, চিত্রকর৷ মাঝে মাঝে রবিবার সকালে হাঁটতে হাঁটতে সেখানে যেতাম বাবার সঙ্গে, সুষমাপিসিদের বাড়ি থেকে ফেরার পথে৷ একবার রাসবিহারীর মোড়ের উল্টোরথের মেলায় একটা লাফানে হনুমান কিনে তাঁর বাড়ি গেছি, খয়রি প্যাস্টেলের কয়েকটা আঁচড়ে পুরনো খবরের কাগজের ওপর লাফানে হনুমান সুদ্ধ আমার একটা আদল আঁকলেন; বাবা শুধোলেন, “দুটো হনুমান আঁকলি কেন?” পরে একদিন দেখি আমার সেই প্রতিকৃতির একটা বর্ধিত তৈলরঙিন সংস্করণ এগজ়িবিশনে ঝোলানো৷ আর নিয়ে গিয়েছিলেন এডোয়ার্ড স্টাইচেনের ভ্রাম্যমান ফোটোগ্রাফির প্রদর্শনী দ্য ফ়্যামিলি অভ় ম্যান  দেখাতে, তাতে পথের পাঁচালি-র বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত স্নেহস্মিত বুয়ার ছবি ছিল, অপু ও বড়ো দুর্গা সমভিব্যাহারে৷

সেসব দেখে একটা ঝাপসা নান্দনিক বোধ তৈরি হচ্ছিল মনের গভীরে কোথাও৷

বৌবাজারে পয়োগ্রামের পালটি করা বাড়িতে সাবেকিয়ানা আর যৌথ ঐতিহ্যের একটা আলগা মাপের আন্দাজ পেয়েছিলাম৷ ধর্ম জিনিসটার মাপ পেয়েছিলাম গাঁজা পার্কের পাশে ব্রাহ্ম সম্মিলনী সমাজে — হয়তো এগারোই মাঘ, অথবা হয়তো কোনও শ্রাদ্ধবাসরে, স্মরণ নেই — এবং শান্তিনিকেতনে পৌষোৎসবের মন্দিরে প্রায় প্রতি বছর চোখ বুজে নির্জীব বসে থেকে দাদার বক্তৃতা শোনা; একবার গোরাদা(অর্ঘ্য সেন)-দের কীর্তনমুখর বাড়িতে; ভবানীপুরে জনৈক তারাপ্রসন্নবাবুর বৈঠকখানায় তাঁদের শনিবারের সান্ধ্য বৈঠকে চা তেলেভাজা সহযোগে গান শুনে৷ বাবা সেখানে মাঝে মাঝে যেতেন ওই গানের টানে৷ সগুণ নির্গুণ দয়াল ভয়াল হরির গান যে সুদর্শন ভদ্রলোক দরাজ গলায় গাইতেন, গাইতে গাইতে অকাতরে গড়িয়ে পড়ত নয়নধার, পরে শুনেছি তিনি স্ত্রীকে হত্যা করে শ্যালিকাকে বিয়ে করেন৷ আইন তাঁকে ছোঁয়নি, কারণ কর্পাস ডেলিক্টি বলে কি একটা জটিল ব্যাপারের হদিস মেলেনি কখনও৷ সত্যি মিথ্যে জানিনা তবে তাঁর কন্ঠে ভয়াল হরির অপার দয়া ছিল, সন্দেহ নেই৷

ব্যান্ডেল চার্চে মাস্ দেখেছি, গুরদোয়ারায় সৎনাম শুনে হালুয়া প্রসাদ খেয়েছি, ইফ়তার খেয়েছি বহুবার, এমন কি আইভ়্যান কিংবা ডেভ়িড ইজ়েকিয়েলের বার মিৎজ়ভ়ার নিমন্ত্রণ — তাও৷ সেই থেকেই বোধহয় — বাঁশবাগানে ডোম কানা — ধর্মে আর মতি হল না আমার! আমার চর্মচক্ষে ধর্মের যে দিকটা ধরা দিয়েছিল, সেটা হয় চোখ বুজে পিতানোঽসি  শোনা, নয়তো বৌবাজারের বাড়িতে তুমুল কাঁসরঘন্টা আর ঢাকের বাদ্যির সঙ্গে এত ধোঁয়া যে ভক্তি ছাড়াও আপনি নয়ন মুদে আসে, নতুবা স্ত্রীহন্তারক দুর্বৃত্তের সাশ্রুধার কীর্তন৷

অথবা হয়ত পারিপার্শ্বিকের মধ্যে একটা গোপন ছন্দ, একটা বৃহত্তর ধর্মের খোঁজ পেয়ে গিয়েছিলাম, অজান্তে, খেপার পরশপাথর খুঁজে পাওয়ার মত৷

###

তুঁহু মম শ্যাম

শ্যামাচরণ ছিল জাত ঠ্যাঙাড়ে, হুগলির খেঁটে-পাবড়া নিক্ষেপকারী ডাকাতদের (শরৎচন্দ্র স্মর্তব্য) সাক্ষাৎ বংশধর৷ শুনেছিলাম, আসলে সে জিরেট-বলাগড়ের লোক৷ জায়গাটা কোথায় তখন জানতাম না, কিন্তু ওই দোনলা স্থাননামের মধ্যে যে প্যানমুন্ডারি, ফার্সি (ভেবে দেখেছেন, আমরা বাংলায় বলি বেওয়ারিশ বেপরোয়া, হিন্দিভাষীরা বে-র বদলে লা  দিয়ে একই কথা বলে; শব্দগুলো আসলে বহিরাগত, আরবি আর ফার্সির মিশ্রণ) আর আর্য ভাষার মিলিত রহস্য, যেমন শা’গঞ্জ-কেওটা বা ঘুরিষা-ইছাপুর, নিদেন সুতানুটি-কলকেতা, তারই মায়ায় জিরেট-বলাগড় নামটা দাগ কেটে বসে গিয়েছিল৷ কোনও একটা বিশেষ দুষ্কর্ম, হয়ত নরহত্যা করে সে গেরুয়া জটাজুট রুদ্রাক্ষ কমন্ডলু ধারণ করে অকুস্থল থেকে গা ঢাকা দিয়ে বারো কোয়ার্টারে জবরদখল আশ্রয় নিয়েছিল৷ ছদ্মবেশের অঙ্গ হিসেবে সে নাকি বেজায় দুর্বোধ্য হিন্দিতে কথাবার্তা বলছিল৷ কাজের লোকেরা আর বউ ঝিরা তো ভয়ে কাঁটা! বাবার কানে যেতে ওয়াচ অ্যান্ড ওয়ার্ডের অপেক্ষাকৃত কম ধর্মভীরু কয়েকজন শ্যামা খুনেকে ধরতে এলো৷ সেয়ানা শ্যামা বেগতিক দেখে, পরনের শেষ সুতোটা পর্যন্ত খুলে রেখে, সটান বেলগাছে, পরে যেখানে ব্যাচেলরস’ হস্টেল হয়েছিল, তার পাশে৷ সেই উচ্চাসন থেকে সে তার নিজস্ব হিন্দিতে অবিরাম গালি নিক্ষেপ করে গেল, সঙ্গে ধুপধাপ পাকা বেল৷ শেষমেশ দমকলের লোকেরা এসে জলের তোড়ে নামালো শালাকে!

মনে থাকার কথা নয়, তবু মনে আছে, কারণ হয়ত নিস্তরঙ্গ জীবনে বিশেষ কিছু ঘটত না৷

তাই বোধহয় মনে আছে ভাটির টানে কলার ভেলায় ভেসে আসা ডুরে শাড়ি পরা সেই কিশোরীটিকে, সাপে কাটা মেয়ে, যাকে তার প্রিয়জনেরা কে জানে কোথা থেকে ভাসিয়ে দিয়েছিল হুগলির জলে, যদি তার ভাগ্যে কোনও ঘুমভাঙানিয়া গুনিন থাকে ভাঁটির পথে৷ আরও মনে আছে বেনুগোপাল বিজয়লক্ষ্মীদের বিধবা আয়া গঙ্গার কথা, যে দুধওয়ালা গোবিন্দের সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে কাঁচরাপাড়ায় ঘর বাঁধে৷ জি.টি.রোডের ওপারে ফরাদ (ফ়িরহদ্?) আলি সাহেবের বাগানে দলছুট একটা বাঘ ধরা পড়েছিল একদা৷ প্রমাণাভাবে সার্কাস পালানো বাঘ বলা চলেনা৷ কোত্থেকে শা’গঞ্জে উপস্থিত হলো কেউ বলতে পারেনি৷ মেছো বা গুলে বাঘ নয়, খাস রাজকীয় বাঙালি! তাকে কোনওক্রমে খাঁচায় ভরে দুদিন রাখা হয়েছিল আলি সাহেবের বাগান বাড়ির হাতায়, এক আনা করে টিকিট; গঞ্জ-বেগঞ্জের অন্যান্য গাঁইয়া মানুষের মত চিত্তদার সঙ্গে ননতু আর আমি দেখতে গিয়েছিলাম৷ পরে বাঘটাকে চিড়িয়াখানায় দেয়া হয়৷ ফরাদ আলির বাগান হেজে যাবার অনেক পরেও বিলায়েৎ আলির পুকুরসহ বাগানটা টিঁকে ছিল। সেটাও জি.টি. রোডের ওপর তবে কাটোয়া রেলগেট ছাড়িয়ে কিছুটা উজিয়ে। সেখানে রোমাঞ্চকর তেমন কিছু ঘটেনি, তবে লুকিয়ে সিগারেট খাবার পক্ষে খাসা ছিল জায়গাটা!

আরেকটা ধুম্রাক্ত জায়গা ছিল কাটোয়া রেলগেটের বাঁ দিকে যে রেল কোম্পানির কালভ়ার্ট, সেটা। ধুম্রায়ণের অনেক আগে থেকেই সেখানে আমার যাওয়া আসা; কানাই শিখিয়েছিল, লাইনের ওপর একটা তামার পয়সা রেখে ঘাপটি মেরে কালভ়ার্টে বসে থাকতে। একটা দুটো চাকা তার ওপর দিয়ে গেলেই ছিটকে পড়ে যেত বিকৃতাবয়ব পয়সাটা, ট্রেন চলে গেলে একটু কষ্ট করে খুঁজতে হত পয়সাটা — ঘর্ষণে তার লালিমা ও চাকচিক্য ফিরে যেত, আকারটা শুধু অপটু হাতে বেলা রুটির মত লম্বাটে আর পাতলা।…

আমার পুরাতনতম স্মৃতিগুলো, যাদের স্বচ্ছন্দে স্বোপার্জিত স্মৃতি বলে দাবি করতে পারি, সবই বারো কোয়ার্টার কেন্দ্রিক৷ আমাদের বারো নম্বর বাড়ির ঠিক সামনের রাস্তা পেরিয়ে কয়েকটা বাহারে পাতাবাহার ছিল৷ এক উজ্জ্বল সাতসকালে তার একটার মধ্যে, দৃশ্যমান পাতার আড়ালে, সযত্নে গড়া একটি পাখির বাসা আবিস্কার করেছিলাম স্বচেষ্টায়; আমার দেখা প্রথম পাখির বাসা৷ কেউ বলে দেয় নি সেটা কি, তবু আমার চিনতে ভুল হয়নি এক চুল৷ তার মধ্যে ছিল খয়রি ছোপ ধরা তিনটে ছোট ছোট ফিকে নীল ডিম, আমার প্লাস্টিকের হাট্টিমাটিমটিমের অনবরত পাড়া ডিমের মত বর্তুল নয়, অতোটা ছোটও নয় হয়ত৷ জিজ্ঞাসু চৈতন্য আমাকে বার বার ডেকে নিয়ে যেত সেই বাসার কাছে, তবে কাউকে কখনও বলিনি তার কথা, সে আমার নিজের আবিস্কার, একান্ত আমার৷ শুধু প্রথম স্মৃতি নয়, আমার প্রথম অধিকার বোধও সেটা, সেই জোনাকিদেরও আগে৷ চোখের সামনে সেই পক্ষীযুগল পালা করে তা দিল, একদিন ডিম ফুটে বিষ্ঠা মাখা নোংরা চেহারার রোমসর্বস্ব হলুদবরণ বাচ্চাগুলো বেরিয়ে এলো, বিশ্বরূপ দেখানোর মত অসম্ভব মুখব্যাদান করে থাকত তারা, অহরহ বাপমায়ের মুখনিঃসৃত আহার্যের খোঁজে৷ চোখের সামনে তাদের বেড়ে উঠতে দেখলাম (কই, আমি তো তেমন হই হই করে বাড়িনি!), তাদের শিক্ষানবিশি উড়ান প্রচেষ্টা দেখলাম, তার পর একদিন দেখলাম শূন্য বাসা, পাখি উড়ে গেছে স্বনির্ভর হতে না হতেই৷ সেই শূন্য নীড় আমার মনের গহনে রমেন চক্রবর্তীর  এচিঙের  মত  দাগ  কেটে  বসে গেল বিষাদের প্রতীক হয়ে৷ গভীরতম বোধে সেটা মৃত্যুরও প্রতীক, কারণ সেই পরিত্যক্ত গাছের নিচে সবচেয়ে কমজোরি ছানাটার শব দেখেছিলাম… তার বাপমা ভাইবোনেরা ফিরেও তাকায় নি, সেটা দস্তুর নয় বলে৷

ওই বারো কোয়ার্টারেই প্রথম মানুষেরও মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেছিলাম৷…

কিছুর মধ্যে কিছু নেই, একদিন হঠাৎ কলকাতা থেকে একটা কাচে মোড়া শববাহী গাড়ি এলো মিস্টার জোনসকে নিয়ে যেতে৷ আরক্তচক্ষু, ক্রন্দনরতা মিসেস জোনসের চেহারাটা হুবহু মনে আছে আমার৷ তিনি ড্রাইভার চালিত একটা কালো গাড়িতে পেছন পেছন গেলেন, সঙ্গে মিসেস ক্যাসটেলারি ও ওয়ালিংটন৷ আরো দুএকটা গাড়ি সঙ্গে গিয়েছিল, মনে আছে৷ তবে সেই পাখির বাসাটার মত আট নম্বর খালি পড়ে রইলো না, অপেক্ষায় অপেক্ষায় অবহেলিত, ঝোড়ো হাওয়ায় ছিন্নভিন্ন হল না৷

তার অল্প দিনের মধ্যে, যাদবপুরে তাঁর নবনির্মিত বাড়িতে গৃহপ্রবেশের কিছু কাল পর, আমার দাদামশাইয়ের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হল, এখন বলে সেরিব্রাল স্ট্রোক৷…

তাঁর গৃহপ্রবেশের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে, যেন কালকের কথা৷ আমরা সকলে গৃহপ্রদক্ষিণ করছিলাম পূজাপাঠের শেষে; খুব মজা পেয়েছিলাম — যে কোনও শিশুর মত — সেই সাড়ম্বর প্রদক্ষিণে৷ আমার পছন্দ ছিল পানাপুকুরের দিকটা, যেখানে কংক্রিটের সেপটিক ট্যাঙ্কের বেসামাল ঢাকনাটা একদিকে পা দিলেই ঢেঁকির মত ঢক ঢক করছিল৷ বাপের শরীর খারাপের খবর পেয়ে মা তক্ষুনি আমাকে নিয়ে রওনা দিলেন৷ সেই যে পড়লেন দাদু, আর চোখ খোলেননি একবারও৷ পরের দিন ভোরে শুনলাম দাদু স্বর্গে গেছেন৷ সেই ধূসর সকালে দাদুর ঘরেরই বাগানমুখি একটা জানলার হাতায় গরাদ ধরে চুপটি করে দাঁড়িয়েছিলাম আমি, বুকের ভেতর একটা ফাঁকা ভাব, যেন কিছু একটা নেই, আর ফিরে পাব না কখনো৷…

দাদামশায়ের কথা বলতে গেলে দিদিমার কথা উঠবেই — দিদিমা মানে ক্ষিতিমোহনের জ্যেষ্ঠা কন্যা, রেণুকা। তিনি আমাকে বাবুসোনা বলে ডাকতেন, তাই আমিও উল্টে তাঁকে বাবু  বলতাম। আমার গপ্পের ঝুড়ির বেশ কিছু গপ্পো বাবুর কাছে শোনা। ঢাকার চেয়ে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে তাঁর গভীরতর আলাপ ছিল; অল্প বয়সেই বিয়ে হলো ‘আইতে সাল যাইতে সাল’ বরিশালে। শ্বশুরবাড়ি যেতে না যেতেই তাঁর জ্বর হয়েছে, যত্ন আত্তি করছে সে বাড়ির নতুন আত্মীয়েরা। শ্বশুর কূলের কোনও গুরুজনস্থানীয় পুরুষ রেণুকার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “ও মনি, এখন একটু ভালোবাস নি?” সেই কচি মেয়েটা কি করে জানবে যে বরিশালের বাগ্ধারায় ‘মনি’ মানে সম্বোধনসূচক dear, আর ‘বাস নি’ মানে ‘আছ কি !’ সুনীতিবাবু কি বলেছেন কোথাও, তামাম ভারত যাকে প্রেম বা প্রীত বলে, তাকে আমরা ভালবাসা বলি কেন? নরেন্দ্র দেব মশাই তাঁর স্বগৃহের নাম কি অর্থে স্থির করেছিলেন, good house অর্থে, না কি ভালো থাকা অর্থে?

মায়ের ভাষায়, দাদু আমায় আদর দিয়ে দিয়ে মাথাটি খেতেন৷ শেষ যে জন্মদিনের উপহার তিনি সহাস্যে তুলে দিয়েছিলেন আমার হাতে, বাদামি চামড়ার পাড় লাগানো একটা জলপাই রঙের ক্যানভাস স্কুল ব্যাগ, তার মধ্যে এক বাক্স ভ়ীনস্ পেন্সিল, কাঠের ফুট রুল, বড়োসরো ইরেজ়র, রানা প্রতাপ মার্কা ড্রইং খাতা, রীভ়স ক্রেয়নের লম্বা বাক্স আর বেশ কয়েকটা বই৷ তার একটা, ডরোথ়ি জনস্টনের নো-গুড, দ্য ডান্সিং ডংকি , কৈশোরতক আমার পরম প্রিয়, খাটের পাশে সযত্নে রাখা থাকত যখন ইচ্ছে পড়ার জন্য৷ আমার চেয়ে দশ বছরের ছোট ভাই সেটার দফা সারে যখন, সে তখন গল্প শোনার পোকা৷ ভাইকে দোষ দিয়ে কি লাভ; খোকাদা একবার বিলেত থেকে আমার জন্য এনেছিল একটা দম দেয়া নাচুনে গাধা, অবিকল নো-গুডের মত; তার ভেতরে কি আছে দেখতে গিয়ে আমি তার দফা রফা সেরেছিলাম কয়েক হপ্তার মধ্যে!

খাটে চিৎ হয়ে শুয়ে জোড়া-হাঁটু শুন্যে তুলে রাখতাম, ভাই আমার পেটে পা রেখে হাঁটুর উচ্চাসনে বসত৷ আমার হাতে তখন বুড়ো আংলা  কিংবা কালোর বই  শ্যামবাজারি ঢঙে

স্–স্–স্–সনিবার তায় বৈসাখে

(তুই) ম্রেছিস আমার সেজদাকে;

সারা সিত্কাল উপুসি ভাই,

সালিক বাসায় সেঁধুলো তাই…

অবধি পড়লেই পা দিয়ে পেটে ঢুঁ মেরে বলত, “আবাল, আবাল”; তৎক্ষণাৎ আমি বলতাম, “ঢুঁ খেয়ে তো পেট ভরে না, সাধের পেটটি যাবে ফেঁসে!” কিন্তু সেই নাচুনে গাধার গল্পটা বোধহয় কখনো বলিনি তাকে৷

দাদুর মৃত্যুর কিছু পরেই আমি বাড়াবাড়ি রকমের জন্ডিসে পড়ি, সাত মাস শয্যাশায়ী, বাকি বছরটা গৃহবন্দি৷ আমার মনের গহনে সেই জোনাকিরা, নষ্ট নীড়ের নিচে পড়ে থাকা সেই উড়তে না শেখা পাখির ছানা, জোনস সাহেবের অন্তিমযাত্রা, বামনদাদুর মৃত্যুপ্রশান্ত অবয়ব, আমার অসুখ ও দিনের পর দিন সেদ্ধ মেদ্ধ খেয়ে বিছানায়, এবং চিরকালের মত বারো কোয়ার্টার ছেড়ে যাওয়া অঙ্গাঙ্গী হয়ে রয়েছে৷ সে সব স্মৃতি তালগোল পাকিয়ে মনের ভেতর একটা কষ্টের প্রতীক হয়ে বেঁচে রইলো, ঢোঁক গিলতে গলা ব্যথা করা কষ্ট৷ বহু বছর পর, সম্ভবত সাতের দশকের গোড়ায়, সেই এক ঝাঁক বুক খালি করা বঞ্চনার প্রতীকের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল আরেকটা: ত্রিবেনী শ্মশান ঘাটে যে দেয়ালহীন ইটের গোলাকৃতি ছাউনি আছে, তার একটা থামে শ্মশানেরই কাঠকয়লা দিয়ে লেখা ছিল, নিদয় হরি, কি নিলে!

###

অরুণোদয়

সে যুগে টি.ভি. না থাকায় এবং বেসামাল কামলার কল্যাণে দারুন লাভ হয়েছিল, বিস্তর পাঠ্য অপাঠ্য বই পড়েছি, উভয় ভাষায়, ছোটদের এবং বড়দের৷ সব যে বুঝেছি তা নয়: শ্রীকান্ত  প্রথম পর্ব আর দেওঘরের স্মৃতি  বাদ দিলে শরৎচন্দ্রকে নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করার কি আছে, বুঝিনি কখনও, এখনও বুঝিনা৷ তবে হ্যাঁ, ভদ্রলোকের বাংলা গদ্যটা ঝকঝকে বইকি! অধিকাংশ চলিতভাষার বইয়ের সঙ্গে সাধুভাষায় দক্ষিণারঞ্জনের অনন্যসাধারণ রূপকথা, কথাসরিৎসাগর, বেতাল পঞ্চবিংশতি  কিংবা রবিন হুড-এর অনুবাদ পাঠে বিঘ্ন ঘটেনি কখনো; রসগ্রহণে আগ্রহ থাকলে গোলমাল হওয়ার কথা নয়৷ শেষ তিনটে বইই, সম্ভবত, কুলদারঞ্জন রায়ের অনুবাদ, দিয়েছিলেন জনৈক প্রকাশক, পুরীতে একদা তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল বাবার৷ আমার সাহিত্যরসিক ঠাকুমা দেখ না দেখ যে কোনও উপলক্ষ কল্পনা করে নিয়ে বই উপহার দিতেন৷ দাদাকে দিয়েছিলেন দু সের ওজনের বিশ্বপরিচয়; সেটা হাত থেকে পড়ে গিয়ে দাদার পায়ের বুড়োআঙুল ছেঁচে গিয়েছিল৷ অমনি আমি পক্ষপাতের অভিযোগ আনলাম, আমাকেও পা কাটা বই দিতে হবে! একটা তিন-সেরি কৃত্তিবাসী রামায়ণ পেয়েছিলাম সেযাত্রা (আদরের ফাল্গুনিকে অন্য একটা পা কাটা বই: নানা), সেটা একবার কাকে ধার দিয়ে আর ফেরত পাইনি৷ তিনি যদি এখনও বহাল তবিয়তে থাকেন, এবং তাঁর চোখে যদি দৈবাৎ এই লেখাটা পড়ে, দয়া করে ফেরত দেবেন, প্লীজ়!

কলকাতার বাড়ির খুব কাছাকাছি বেশ কয়েকটা বড়োসড়ো বইয়ের দোকান ছিল তখন৷ আমাদের ফুটপাথেই ছিল আইডিয়াল বুক স্টল আর, খুব অল্প কিছুদিনের জন্য হলেও, টবকো বলে একটা তামাক এবং বইয়ের যৌথ দোকান — বাবা সেখানে গোল টিনের তিন সন্ন্যাসিনী  তামাক কিনতেন, অথবা কাঠের বাক্সে হাফ়-আ-করোনা  সিগার এবং অবশ্যই কাগজ মলাটের রগরগে খুনখারাপির বই, মিকি স্পিলেন কিংবা এলারি কুইন৷ টবকো থেকে ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পঞ্চরঙ্গ  কিনেছিলাম; কিশোরপাঠ্য পাঁচটি সাবেক গল্পের সরস সংকলন, সম্ভবত অজিত গুপ্তের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ আজও মনে আছে৷ আমার জন্ডিসের সময় কেউ টবকো থেকে কিনে এনেছিল সচিত্র বিমল দত্তের সিং খুড়োর গল্প, তার মলাট ছেঁড়া কপিটা এখনও আমার সংগ্রহে আছে৷ আদতে মৌচাকে প্রকাশিত সে গল্পসংগ্রহ আর ছাপা হয়নি কখনও; তাতেই বোঝা যায় বাঙালির পাঠরুচি কোন পথে! আইডিয়াল থেকেই সেযুগে আমার বেশির ভাগ বই কেনা; হেমেন ঘোষের বকুল পরি আর রামধনু, বিভুতিভুষণের হীরামানিক জ্বলে, সীতা দেবী শান্তা দেবীর নিরেট গুরুর কাহিনী  আর হিন্দুস্থানী উপকথা, সুনির্মল বসুর হুলুস্থুল  (কুকুরের তাড়া খেয়ে শেঠজি ছুটতে ছুটতে বলছেন, “প্রবাদ জানে হামি তুমি,/ কুত্তা তো আর তা জানেনা!”), বঙ্গানুবাদে ধনগোপালের চিত্রগ্রীব  আর যুথপতি৷

স্মরণীয়তম হল একই দিনে আইডিয়াল থেকে কেনা সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের দুটি কবিতার বই: লাইল্যাক মলাটের কুহু কেকা  আর চাঁপা রঙের বেনু বীণা৷  আজকের সমালোচকেরা সত্যেন দত্তের নাম শুনেই নাসিকা কুঞ্চন করেন৷ আমি মন্দাক্রান্তা (পিঙ্গল বিহ্বল ব্যথিত নভতল, কই গো কই মেঘ উদয় হও,/ সন্ধ্যার তন্দ্রার মুরতি ধরি মেঘ মন্দ্র মন্থর বচন কও) শিখেছিলাম তাঁর কবিতা পড়ে; বড় হয়ে মেঘদূত (কশ্চিৎ কান্তা বিরহগুরুণা স্বাধিকারপ্রমত্তঃ, কিংবা, আষাঢ়স্য প্রথমদিবসে মেঘৈর্মেদুরমম্বরম্) স্ক্যান করতে একটুও অসুবিধে হয়নি৷ বয়ঃসন্ধির ঢের আগে চার্বাক ও মঞ্জুভাষার কিশোর প্রেমের (বনপথে চলেছে চার্বাক,/ সূর্যতাপে স্পন্দিত সে বন,/ ক্লান্ত আঁখি, বিষন্ন, নির্বাক,/ বিনা কাজে ফিরিছে ভুবন) কবিতা পড়ে দস্তুরমত উপভোগ করেছি৷ আর “সব চেয়ে যে শেষে এসেছিল,/ সেই গিয়েছে সবার আগে চলে,” অপত্যশোকের সেই অসামান্য কবিতা কি সত্যিই দ্বিতীয় শ্রেণীর? পেটে পা রেখে আমার হাঁটুতে বসে ভাই …

টেঁপা টোপাটি,  তুমি দোপাটি,

তোফা খোঁপাটি, বাঃ,

বাঁকানো শুঁটি  বিনুনি দুটি

না হয় ঝুঁটি হাঃ!

অথবা, পিয়ানোর গান …

তুল তুল টুক টুক,

টুক টুক তুল তুল,

কোন ফুল তার তুল,

তার তুল কোন ফুল…

শুনে খুব মজা পেত৷ সেই সঙ্গে তৈরি হচ্ছিল আমার ছন্দের কান৷

কলকাতার বাড়ির উল্টোদিকের ফুটপাথে তেরচা ভাবে ত্রিকোণ পার্কের কাছাকাছি ছিল জিজ্ঞাসা; সেখান থেকে সুনীল সরকারের কালোর বই (কিন্তু ছড়া গুলো মামার) কিনেছিলাম, আর  গিরীন্দ্রশেখর  বসুর  অনবদ্য  লালকালো৷   কলেজ  ছাড়ার  পরে গিরীন্দ্রের ধূসর কাগজ মলাটের স্বপ্ন  কিনেছিলাম লালকালোর চেয়ে একটু কম আগ্রহে; তা থেকে মনের ‘অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলোর’ একটু আভাস পাওয়া গেল — আমার নয়, অন্যদের; আমারটা খামোখা উৎসারণ করতে যাব কেন? সুনীতিবাবুর ওরিজিন অ্যান্ড ডেভ়েলপমেন্ট অভ়় দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ  অনেক পরে সেই পতনোন্মুখ জিজ্ঞাসাতেই কেনা৷

আমার জন্মের আগেই সিগনেট প্রেস তৈরি হয়েছে; শুনেছি, টুনটুনির বই-এর সিগনেট সংস্করণ ছাপা হয়েছিল আমাদের বাড়ি থেকে সংগৃহীত বাবা-জ্যেঠা-পিসির ছেলেবেলাকার আদি সংস্করণ অবলম্বনে, কারণ অন্য কপি চটজলদি খুঁজে পাওয়া যায়নি৷ উপেন্দ্রকিশোরের স্বহস্তে আঁকা ছবি সম্বলিত খয়রি হাফটোন মলাটের পুরনো কপিটাও আমাদের কাছে ফেরত আসে৷ লীলা মজুমদারের বেশ কয়েকটা বই সিগনেটের ছাপা: হলদে কালো চৌখুপি মলাটে দিনে দুপুরে  (কেরোসিনের সুবাতাসে/ মহাপ্রাণী খইস্যা আসে,/ খাও খাও ভইরা টিন,/ কেরোসিন কেরোসিন) আর, তার বহু পরে, তাঁর বাবা প্রমদারঞ্জনের হিংস্র চোখে তাকিয়ে থাকা বাঘ মলাটের বনের খবর বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য৷ গগনেন্দ্রের ভোঁদড় বাহাদুর, অবনীন্দ্রের বুড়ো আংলা  আর সবুজ মলাটে চিনে কালিতে আঁকা, শঙ্করের ছবি সুদ্ধু, বিভূতিভূষণের চাঁদের পাহাড়  কি ভুলতে পারে কেউ! অধিকাংশ মলাটই সত্যজিতের আঁকা, যাঁকে ছেলেবেলায় মা এবং তাঁর শান্তিনিকেতনের বন্ধুকুল আবোল তাবোলের ছেলে  বলে চিনতেন৷ এখন কেন বাংলা শিশু সাহিত্যে সেই অসামান্য নক্ষত্রপুঞ্জ চোখে পড়ে না; চোখের দোষ, না বয়সের?

আইডিয়াল বুক স্টল এখনও যথা স্থানে আছে, এবং তার অন্য পাশে বি. বড়াল অ্যান্ড সন্সের মনিহারি দোকান, যদিও চেনা মুখগুলো স্বাভাবিক নিয়মেই আর দেখি না৷ দোকানই থাকে না, মানুষ কোন ছাড়!

ঠাকুদ্দা-ঠাকুমা থাকতে আমরা কলকাতায় এলেই সকালে লুচি (বিশুদ্ধ গব্য ঘৃতে ভাজা) খেতাম: সঙ্গে হয় ছোটছোট চৌকো করে কাটা আলুভাজা, সহভর্জিত শুকনো লঙ্কার অনুপান দিয়ে; নয়তো কালোজিরে কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে চৌকো কাটা আলুর বাটিচচ্চড়ি, হরিদ্রাবর্জিত, নামানোর আগে একটু কাঁচা সর্ষের তেল৷ শেষোক্তটার ঘরোয়া ডাক নাম ননি তরকারি, কারণ ঠাকুমার ডাক নাম ছিল ননি৷ সোনার মত ঝকঝকে কাঁসার থালায় গরম গরম স্তুপাকার লুচির সঙ্গে কাঁসার বাটি ভরা ননি তরকারি, দারুণ, তার সঙ্গে এট্টুস চিনি দিয়ে নিলে জমে কুলফি!

সুধী পাঠক হয়তো ভাবছেন, বেশ বই পত্তরের কথা হচ্ছিল, তার মধ্যে খাবার দাবার এলো কোন লজিকে? আহা, পেটে খেলে তবেই তো পাঠ সইবে; একটু স্বাদ বদল করতে দোষ কি — তা ছাড়া কবিও বলেছেন, “জেনো সে রসের সেরা বাসা রসনায়!”

###

Other posts in <aniruddhasen.wordpress.com> and <apsendotcom.wordpress.com>





সেই জোনাকিরা (১–৩) ৷৷ অনিরুদ্ধ সেন

18 09 2012

There are 19 sections of these memoirs, divided into 6 posts, this being the first.

হরিষে বিষাদে

না, খুলনার ভৈরব নদের কিনারে পয়োগ্রাম নামের যে অকিঞ্চিৎকর গ্রামে আমাদের পারিবারিক ভিটে, যেখানে পশ্চিমবাড়ির ঈশান কোনের ভাঙা দেউলের পেছনে ঝুরিসর্বস্ব অশ্বত্থের নিচে আমার তামাম পূর্বপুরুষের নাড়ি পোতা, সেখানে জন্মাইনি আমি৷ আজীবনের বৃন্দাবন শা’গঞ্জেও না৷ জন্মসুত্রে মহানাগরিক, খাস কলকাতায় জন্ম আমার৷ নাগরিকের অন্য এক অর্থ বিদগ্ধ বা রসিক — আদি ও অকৃত্রিম অমর কোষ, অভাবে হরিচরণের বঙ্গীয় শব্দকোষ দেখে নেবেন! আমরণ সেই বিস্মৃত অর্থের মহানাগরিক থাকতে চাই পাঁচ জনের শুভেচ্ছায়৷

তখন যুদ্ধ শেষ৷ বাবা (আর্যকুমার ) চেয়েছিলেন কোহাটের (অধুনা পাকিস্তানে) জয়েন্ট সর্ভ়িসেস হাসপাতালে আমার শুভাগমন হোক৷ তিনি তখন সেখানে বিমান বাহিনীতে কর্মরত; সদ্য রাজকীয়তা ঘুচে বাহিনী তখন শুধুই ভারতীয়৷ তাও আমার কপালে ছিলনা, কারণ, জন্মের কয়েক মাস আগে যুদ্ধকালীন শর্ট-সর্ভ়িস কমিশনের অফ়িসর, দু’নম্বর স্কোয়াড্রনের নেতা, পিতৃদেবকে তদানীন্তন সরকার বাহাদুর আরব্য উপন্যাসের জিন-পরির মত নিচের জবর জবর তিন বরের যে কোনও একটা বেছে নিতে বলেন:

(এক)  স্বক্ষেত্রে পাকাপাকি কমিশন,

(দুই)   কর্তৃপক্ষের সুবিধেমত তুল্যমূল্য অন্য কোনও সরকারি কাজ, অথবা

(তিন) পূর্ণ স্বরাজ৷

আমাদের পরিবারে, একটু আধটু ফুটানিই যা ছিল (রবিবার সকালে আকাশ ভেঙে পড়লেও লুচি হত, সিভিলিয়ান জীবনে বাবা সর্বদা ধোপদুরস্ত সাদা ধুতি পঞ্জাবি পরতেন — প্যান্ট শার্টের চেয়ে সস্তা বলে), বসে খাবার মত রেস্ত ছিল না৷ তায় আবার তখন সদ্য সদ্য যুদ্ধ শেষ হয়েছে, ওদিকে নিজের সংসার হয়েছে, একটি সন্তান হব হব৷ তিনি স্ববুদ্ধিতে পার্মানেন্ট কমিশনের হাতছানি উপেক্ষা করে, বাকি দুই বরের আপেক্ষিক ওজন যাচাই করতে, দিল্লির পতৌদি হাউসে সাময়িক আশ্রয় নিয়ে মাকে রেখে এলেন কলকাতার বাড়িতে৷

দুটো সুযোগ তাঁর সামনে সহজে এলো: বিশ্বযুদ্ধের পিঠোপিঠি, অশালীন ইয়ার্কির মত সেই ধর্মীয় সংঘাতের আবহাওয়ায়, আকাশবাণী ঢাকার স্টেশন ডিরেক্টরের পদ (বাবার জবানিতে, “অভ় অল প্লেসেজ়…!”) এবং, স্বচেষ্টায়, কলকাতার চল্লিশ মাইলের মধ্যে নাতিবৃহৎ, কিন্তু যুদ্ধাবকাশে ক্রমবর্ধমান এবং যুদ্ধান্তেও সম্ভাবনাময়, এক বেসরকারি কারখানায় জনৈক মানবসম্পদ আধিকারিকের দায়িত্ব, যদিও গালভরা সেই পদনাম তৈরি হয়নি তখনও৷ স্বভাবতই, প্রথমটাকে উপেক্ষা করে তিনি নিজের স্বকীয় মেধা, অধীত বিদ্যা এবং অর্জিত অভিজ্ঞতার অনুপযোগী সেই মফসসলের বৃত্তিটাই বেছেছিলেন; হাতে সময়ও ছিল না৷

উনিশশো ছেচল্লিশের পয়লা নভ়েম্বর তিনি কাজে যোগ দেন; সেই আঠেরোই মায়ের ডাক্তার শ্বশুরের হাতে আমার জন্ম — হাসপাতালে নয়, তাঁরই কলকাতার বাসায়, মায়ের নিভৃত শয়নকক্ষে৷ অন্য চোখে দেখলে, রুশদি যাদের মধ্যরাত্রির সন্তান  বলেছেন, রূপকার্থে তাদের চেয়ে আমি এক গর্ভবাসকাল বড় — নিঃসন্দেহে বেবি বুমারদের একজন৷ তার কিছুদিন পরই নবজাতকসহ মাকে শান্তিনিকেতনে পাঠিয়ে দেয়া হয়, শ্রীপল্লিতে, তাঁর দাদামশাই-দিদিমার কাছে: হয়ত লীগের প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক এবং ন্যক্কারজনক রক্তক্ষয় এড়াতে, হয়ত মায়ের শরীর সারানোর জন্য৷

শান্তিনিকেতনেই বিয়ে হয়েছিল মায়ের, বীরেনদার বাড়িতে৷ দাদার (ক্ষিতিমোহন সেন) শ্রীপল্লির বাড়ি তখন হয়তো হচ্ছে বা সবে হয়েছে৷ পাশেই অমিতাদির বাড়িতে কিছুদিন থাকতেন তাঁরা তদারকির ইচ্ছায়৷ গুরুপল্লির মৃন্ময় কুটির ছেড়ে নির্মীয়মান পাকাবাড়ি তৈরি যখন শেষ হয়, দাদা-দাদির ঘরে বৈদ্যুতিক পাখা লাগাবার সময় বাবা উপস্থিত ছিলেন বলে শুনেছি; লাগানো হয়ে গেলে দাদি (কিরণবালা) বাবাকে বললেন, “ছবি, ওনার এই লাঠিটা দিয়ে দূর থেকে পাখার সুইচটা চালিয়ে দিয়েই দৌড়ে পালিয়ে এস; ঘন্টা খানেক খালি ঘরেই চলুক, যদি ভেঙে পড়ে যায়!”

শুনেছি, বীরেনদার বাড়ির প্রবেশপথ পাতাসমেত স্থানীয় কমলালেবু (পাতি লেবুর মতই আকার তাদের, দেখনহাসি, ভক্ষণের মত জৈব ক্রিয়ার ঊর্ধ্বে) আর অর্ধস্ফূট পদ্ম দিয়ে সাজানো হয়েছিল৷ সে সজ্জায় এবং আলিম্পনে কলাভবনের হাত ছিল শুনেছি — অন্তত যমুনাদির ছিল৷ বিয়ের অনবদ্য পিঁড়িটাও কি তিনি এঁকেছিলেন? খুব সুন্দর, কিন্তু রংটা তেমন পাকা ছিল না; শুনেছি, অন্নপ্রাশনের দিন তাতে বসানো হয়েছিল তখনও টয়লেট-আনট্রেন্ড আমাকে — সেটা গুজবও হতে পারে অবশ্য! তবে রংটা যে ধ্যাবড়া হয়ে গিয়েছিল, তাতে সন্দেহ নেই। নন্দলাল উপহার দিয়েছিলেন স্বহস্তে জলরঙে আঁকা গৌরবর্ণ আর্য  ও মেঘবরণ শ্যামলী’র ছবি, বাবার আর মায়ের নামানুযায়ী, শুধু সকৌতুকে বাস্তবের গায়ের রং ওলটপালট করে৷ গগনেন্দ্রনাথেরও একটা আন্দাজ ৬”x৯” জলরং, আধা কিউবিস্ট ঢঙে আঁকা ‘পদ্মপত্রে জল’, মায়ের আলমারির বাঁ দিকের ওপরের দেরাজে থাকত; ফ্রেমবদ্ধ হয় নি কখনও। সেটা বিয়ের উপহার না অন্য কোনও ভাবে পাওয়া, জানা হয়নি কোনও দিন। সেই দেরাজেই ছিল তক্ষশীলার থেকে পাওয়া একটা গান্ধারযুগের সুবর্ণ মেডালিয়নের (না কি সেটা স্বাক্ষরপ্রতীম সীল!) ডিম্বাকার প্লাস্টার কাস্ট — ক্ষুদ্রব্যাস এক ইঞ্চি, বৃহদ্ব্যাস ইঞ্চি দেড়েক — বাবার যুদ্ধকালীন সংগ্রহের অন্যতম। মেডালিয়নটা, শুনেছি, এখনও আছে; তবে সেই পদ্মপত্র বহুকাল কেউ দেখেনি, উদ্বায়ী জল উবে গেছে হয়ত। সেই আলমারির অন্যত্র ছিল মেহগনি কাঠের বর্মি ওয়াকিং স্টিক, আসলে কাজিয়া করার লায়েক, দ্বি-ধার গুপ্তি; সেটাও বাবার ওয়র বুটি। হাতল দিয়ে সাতটা নিষিদ্ধ মাপের গুলি ভরা যায় এমন একটা জর্মন মাউজ়ার পিস্তলও আমৃত্যু ছিল বাবার জিম্মায়; সেটা যে কোথায় পেয়েছিলেন জিজ্ঞেস করিনি কখনও। বাবা মারা যাবার পর, আইন মোতাবেক রডা কোম্পানির জিম্মায় ছিল সেটা; পরে মহারাজ মেসো আইনসঙ্গত ভাবেই কিনে নেন৷ আকিয়াব থেকে তুলে আনা কাল-গোত্রহীন বুদ্ধের একটা ছিন্নমস্ত (সেটাও শুনেছি স্থানীয় রীতিবিরুদ্ধভাবে লম্বকর্ণ) ফেলে আসতে হয় বলে সারা জীবন বাবার দুঃখ ছিল, যদিও আমার ঠাকুমার নিজস্ব সংস্কারে গৃহীর ঘরে বুদ্ধমূর্তি রাখা খারাপ। সেই সংস্কারভঙ্গের দায়েই নাকি কয়েক বছর পর তাঁর ভাই, ছট্টি (ডাক্তার এস.কে. সেন)-এর মৃত্যু হয় — দোতলার সিঁড়ি থেকে ঠায় একতলার ল্যান্ডিঙে পড়ে গিয়ে, যেখানে স্থাপিত ছিল একটা অর্বাচীন বুদ্ধমূর্তি। …

… আমার আড়াই বছর বয়স অবধি মা কিংবা আমি বাবার শা’গঞ্জের আস্তানা দেখিনি৷

তারই মধ্যে নাকি আমার ভারত পরিক্রমা শুরু: কখনও লখনৌতে মায়ের মেজমাসির (মমতা দাশগুপ্ত, ডাকনাম লাবু) বাড়ি; কখনও নালন্দার নবোত্থিত ধ্বংসস্তুপের মধ্যে — সেখানে বাবা কিছুটা পর্যটক আর বাকিটা প্রত্নতত্ত্বের নিযুক্ত বেসরকারি আলোকচিত্রী (রোলিকর্ড ২.৬ টি.এল.আর.-এ খুব কম স্পীডের সাদাকালো কোড্যাকে স্বহস্তে তোলা এবং প্রস্ফূটিত; প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রকাশিত ‘মার্গ’ সাময়িকীতে তার কিছু ছাপা হয়েছিল, আর নালন্দাবিষয়ক বাংলা এক ইতিহাস পুস্তকে একটা); কখনও বা দু’পা দূরের পুরী কোনার্ক ভুবনেশ্বর৷ সেই পরিক্রমার দু’একটা হয়ত শা’গঞ্জে থিতু হওয়ার অব্যবহিত পর পর৷ জ্যেঠা বাবাকে বলতেন, “ছবি, তোর পায়ের তলার চাকাগুলো খোল”৷

যতদিন বেঁচেছিলেন, লাবুদি — মায়ের সেই লক্ষ্মণাবতীয় মেজমাসি — আমার এক বছর বয়সের ওজন নিয়ে খোঁটা দিতেন; কোলে তুলতে হয়েছিল তো বেশ কয়েক বার! এখনও তাঁর বড় মেয়ে, ইলিনামাসি, শত ব্যক্তিগত দুঃখের মধ্যেও সে কথা স্মরণ করেন৷ আর লাবুদি সপরিবারে খোঁটা দিতেন আমার প্রাক্–যুক্তাক্ষর শিবরাম পাঠ নিয়ে — সেটা নিশ্চয়ই পরের ঘটনা: শিবরামের লেখা কোনো কেতাবের শিরোনাম নাকি আমি পড়েছিলাম, বি.শ.ব.প.তি  বা.বু.র  অ.শ.ব.ত.র  প্রা.পি.ত — তা সে আমার হাতেখড়ির ঢের আগে!

… কলেজজীবনে মুক্তারাম বাবু স্ট্রীটে তাঁর মেসঘরে দেখা করতে গিয়েছিলাম এক বার, আমার বন্ধু আশিস (পিটু) সেন আর সেবারের পত্রিকা সম্পাদক সুকোমলের সঙ্গে; যুক্তাক্ষরের গল্পটা সভয়ে বলেছিলাম৷ আশিসের স্বর্গত পিতাঠাকুর ছিলেন এক স্বনামধন্য কবিরাজ; গিরিশ পার্কের কাছে তাঁর ভদ্রাসন ও ডিসপেন্সারির নাম কল্পতরু; শিবরাম তাঁকে বিলক্ষণ চিনতেন! আমায় বললেন, “ওহে অযৌক্তিক  পাঠক, লেখা নেবে তো কল্পতরু-র আশিস  চাও, সুকোমল  করে লিখে দেব!” অসামান্য সেই তাৎক্ষণিক শিব্রামোক্তি স্মরণ ছিলনা এতদিন৷ সেদিন, বালিগঞ্জ ট্রাম ডিপোর কাছে আমার লাইব্রেরি থেকে রমণী চাটুজ্জে স্ট্রীট অবধি হাঁটা পথে, বড্ড বেশি বুড়িয়ে যাওয়া আমারই সমনামী এক সহপাঠীর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হতে, একথা সেকথায় সে মনে করিয়ে দিল৷ কি করে ভুলে ছিলাম রসশব্দের জাদুকরের সে রসোক্তি!

অযৌক্তিক সেই মলাট-পাঠের ঘটনা শান্তিনিকেতনের বলে আমার সন্দেহ, কারণ সে উপাখ্যানের অনেক শাখাপ্রশাখা, অনেক অশান্তিজনক সাক্ষী৷ যমুনাদি সেবকদা প্রফুল্লদা পর্যন্ত অসমসাময়িক এক জ্যান্ত বেড়ালের লেজের ললালোলি, থুড়ি, নড়ানড়ি  সম্পর্কিত অন্য এক গল্প বলতেন অশ্বতরের সঙ্গে সনিঃশ্বাসে — নিমাইমামা তার সাক্ষী৷ সেই সময়েরই আরেকটা ঘটনা গোঁসাইজিকে (নিত্যানন্দ বিনোদ গোস্বামী) ঘিরে৷ একদিন যখন সেই বিরলকেশ, শ্বেতশুভ্র গুম্ফশ্মশ্রুময় সদাশয় ব্যক্তিটি মা বাবার সঙ্গে দেখা হতে কুশল বিনিময় করছেন, তে সম্পৃক্ত আমি নাকি গ্রীক নাটকের রীতি অনুযায়ী সোচ্চার জনান্তিকে মাকে শুধিয়েছিলাম, “ইনি উদো, না বুধো?” আমার কি দোষ… হাতে না হয় ট্রেডমার্ক হুঁকোটা ছিল না! যদ্দূর জানি, কথাটা গোঁসাইজির কানে গিয়েছিল — যাবারই কথা; তা সত্ত্বেও পরে আমাকে তাঁর স্বাক্ষরিত ছেলেভুলানো ছড়া  এক কপি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন সস্নেহে৷

মায়ের ছোটমাসি, অমিতাদিও মৃত্যুর কয়েক বছর আগে, অন্যান্য অপ্রকাশ্য উপাখ্যানের সঙ্গে, এই সব গল্প আমার কনিষ্ঠা কন্যাকে ফলাও করে বলেছেন৷ এতেই বোঝা যাচ্ছে, দিনের আলোর মত স্পষ্ট, মাতৃকুলে আমার প্রসিদ্ধি প্রধানত বিদূষক হিসেবে৷ এই ভূমিকাটা পিতৃদেবেরও পছন্দের; তিনি বলতেন, “রসবোধের সেরা হল সেন্স অভ় হিউমর, ওটা বাদ দিলে মানুষ গোরিলা হয়ে যায়৷”

আত্মজীবনী লেখার চেষ্টায় এ রচনা নয়৷ আটপৌরে সাদামাটা কীর্তিহীনের জীবন নিয়ে আত্মজীবনী চলেনা; পড়বে কে, রচনাই বা লিখবে কারা: “এই যে জোনাকি, ইহাদেরও মৃত্যু আছে; তাইতো কবি বলেছেন…”! কিছু আজব ঘটনা, যার পারম্পর্য এবং স্থানকালের আইনস্টাইনীয় সম্পর্ক আমার কাছে বেজায় বিদঘুটে ঠেকে, মাঝে মাঝে বেজায় মজার, গুনে গুনে পাঁচজনের সঙ্গে ভাগ করে নেয়ার জন্য স্মৃতিকথা লিখতে শুরু করেছিলাম আমার ওয়েব লগে — প্রথমে ইংরেজিতে, পরে বাংলায় — ওয়েব বা উর্ণাজালের মত তিল তিল করে বোনা স্মৃতি সব, আপাতবিস্মরণের অতল সমুদ্র থেকে খুঁজে আনা৷

যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে থাকার ইচ্ছে আমার নেই, তবে সেই সরস মুহূর্তগুলোকে কি একটু বাড়তি জীবন দেয়া যায়না!

এই বর্ধিত লেখাটা আমার নিজের সঙ্গে আলাপচারি; বলা উচিত, ফ়্রেমবদ্ধ অল্প একটু সময়ের ক্যামিও স্মৃতিচারণ৷ তবে ডায়রি রাখিনি কখনও, অনেক দরকারি ঘটনা বেমালুম লোপাট; অকিঞ্চিৎকর বহু ঘটনার বিরক্তিকর খুঁটিনাটি কিন্তু ভুলিনি! যেগুলো স্পষ্ট মনে আছে ভাবছি, সেগুলো হয়তো আত্মপ্রতারণা৷ আর মনের ফাইলিং সিস্টেমটাও গোলমেলে — চাইলেই হদিস মেলে না; যখন মেলে তখন তারা সময়ক্রম, ঘটনাক্রম, ধারাবাহিকতা বজায় রাখে না মোটে, কেমন কাটা কাটা — ধীরগতির ব্রডব্যান্ডে ইউটিউবের ছবির মত৷

তা বলে কি বলব না ছোটমার তৈরি সেই হারিয়ে যাওয়া জিরে চিঁড়ের কথা: চিঁড়ের মত পাতলা আর সরু করে কাটা নারকেল কুচি অল্প আঁচে শুকিয়ে নিয়ে চিনির রসে ফুরফুরে করে আসানো — তাতে রং ধরবেনা একটুও! কিংবা খোকনদা স্বপনদার পিসি, যাঁকে পপ বলতাম আমরা যুগল অকারান্তে, তাঁর রান্না লইট্ঠার শুঁটকি! অথবা জি.টি. রোডের থেকে একটু ভেতরে, আদিসপ্তগ্রাম স্টেশনের কাছাকাছি কিন্তু উল্টোবাগে, সরস্বতীর শুকনো খাতের অনেকটা তফাতে সেই পানাচ্ছন্ন মজা বাঁওড়, হয়তো সাবেক সরস্বতীরই কোনো কন্যা ধারা, আর বাঘ বাঁওড়  নামের গ্রাম, যেখানে প্যাট্রিক — আমার আঠেরো বছর বয়সে পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই ড্রাইভ়িং শিক্ষার গুরু — তার চেনা এক মহিলার কুটিরে নিয়ে গিয়েছিল গাড়ি খারাপ হতে৷ সেরকম সবুজ গ্রাম, ডোবা ভরা শালুক, ডোবার ধারে লুচি পাতা (টাকাপ্রমাণ গোল, ভাজলে লুচির মতই ফোলে, মা পাতলা চালপিটুলিতে চুবিয়ে মাঝেমাঝেই ভাজতেন; বর্ষায় খিচুড়ির পাতে খাসা!) আর টক টক আমরুলি পাতার (কুন্ডু পুকুরের পারেও অনেক হত, আমরা কোঁচর ভরে তুলে সানন্দে চিবোতাম) কার্পেট, গুটি সুদ্ধ পুঁই আর বনকলমির ঝাড়, আমার বুকের হাইটে ঝুলে থাকা কাঁঠাল, রেবেকামাসির ছিটেবেড়ায় লতানে মাকাল পেকে লাল টুকটুক করছে, আর চন্ডীমন্ডপের মত খোড়ো চার্চ — তার মাথায় ফুটিফাটা কাঠের ক্রস — এসব তো আর দেখবে না কেউ সর্বগ্রাসী বাজার অর্থনীতির দৌলতে!

বাংলার কয়েকটা গ্রাম, দু’একটা শহরতলি আর একটা মাত্র মহানগরের কথা, যা অনেক দেখেও আমার আশ মেটে নি এখনও, সেটা অগোছালো হলেও লিখে ফেলতে ক্ষতি কি? একটা ঝাপসা মত ছবি তো ফুটবে! কেউ পড়ুক, না পড়ুক, আজ জোনাকিদের কথা লিখব বলে আমি বদ্ধপরিকর৷

কিছু মানুষের নাম দরকার মত — আবরুর খাতিরে কিংবা অন্য কারণে — পাল্টাতে হয়েছে, উহ্য কিংবা সংকেতে রেখেছি কয়েকটা৷ পেছন থেকে ছোবল মারা সাপ, ঝোপেজঙ্গলে লুকোনো গেল-গেল-সব-গেল হাঁকা ফেউ আর মড়াখেকো নরকের কীটদের ক্ষেত্রেই সেসব বিধিনিষেধ৷ বাকিরা প্রায় সবাই স্বস্থানে স্বমহিমায় আছেন৷ সাহস করে এই অপটু, অগোছালো লেখা পড়বেন যাঁরা তাঁদের জেনে রাখা ভালো, এই স্মৃতিকথা প্রামাণিক তথ্যনির্ভর নয় — এর ওপর ভরসা করে মামলা করলে ধোপে টিঁকবে না৷ এমনকি, যে কবিতার উদ্ধৃতিগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সেগুলো যাচাই করবার কোনও উপায় নেই আমার, কারণ বইগুলোর অধিকাংশ আমার সহজ সংগ্রহের মধ্যে নেই৷

শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির একটা বয়সে হামের মত কবিতাজ্বর হবেই হবে, তার কোনও প্রতিষেধক নেই; তেমনি আবার কবিতাবয়সে দুঃখবিলাসের আমবাত বেরোয়নি এমন বাঙালি বিরল৷ খুকুমাসি, মায়েদের চার বোনের সবচেয়ে ছোট, নিবিড় শৈশবে, জুতো-মোজা পায়ে থাকা সত্বেও, ডুকরে কেঁদে উঠেছিল একদিন, “কালিপা কন কন কন!” কেন, সে রহস্য ভেদ হয় নি কখনও। তার অল্পদিনের মধ্যেই অসামান্য শ্রুতি ও স্মৃতিশক্তির নিদর্শন রেখেছিল… “তোর দিদিরা কি কি বই পড়ে রে?” “ছাছতো ছোপান, নীতি ছুদা আর হাইটোছ অভ় ইটলিচার!

কৈশোরে কবিতা ভ়াইরাসের প্রকোপে দুঃখের পদ্য লিখতে বসে যেই লিখেছে মাতৃহারা মা যদি না পায়, অমনি পেছন থেকে কঙ্করদা (ক্ষিতিমোহনের ছেলে, ক্ষেমেন্দ্রমোহন, শান্ত-শিবের বাবা) উচ্চৈঃস্বরে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মিলিয়ে দিয়েছিলেন পিতৃহারা পা পাবে কোথায়!

মাতৃহারার মা আর পিতৃহারার পায়ের মত হাসি আর কান্নাও যে পাশাপাশি থাকে, রামশর্মা নামধেয় জনৈকের কল্যাণে তা কি জানতে বাকি আছে কারু! আমার জীবনেও হরিষের চেয়ে বিষাদের ভাগ কম নয়, মিলিয়ে মিশিয়ে হরিষে বিষাদ! আমি হরিষের কথা সহাস্যে বলব, বিষাদের কথাও সরসে; দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বক্ষবাদক গোরিলা হওয়ার ইচ্ছে নেই মোটেই৷

মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যে সুখি আর দুখি জীবনদোলায় দুলছে, তারা যে আসলে একই লোক সে কথা গীতিকার খোলসা করে বলেননি৷ কেনই বা বলবেন; ধ্রুব সত্য কি কেউ দিব্যি গেলে এস্ট্যাবলিশ করে!

###

মোরা নাচি ফুলে ফুলে

ছেলেবেলায় কেউ কেউ আমাকে অকালপক্ব বলতেন৷ হয়তো তাঁদের সাত পুরনো ছেলেভুলোনো রসিকতায় হাসতাম না আমি; হয়তো যাঁরা আমার অপক্ববুদ্ধির খাতিরে আধো আধো বুলিতে কথা বলতেন — যেমন করে কুকুরছানার সঙ্গে কথা বলে কেউ কেউ — তাঁদের দেখলে আমার কচি কপাল ভ্রুকুটিকুটিল হয়ে উঠত; হয়তো আমার নিত্যনতুন শব্দের সঞ্চয়, যা অবশ্যই বয়স্যদের গুলি-টল-লেত্তি-লাটিম, টিনের বরকন্দাজ এবং ডিংকি গাড়ির সংগ্রহের চেয়ে ঢের বেশি সমৃদ্ধ ছিল, বিব্রত করত তাঁদের৷ তা বলে কি সত্যি এঁচোড়ে পাকা ছিলাম!

প্রায় একবছর সাংঘাতিক কামলায় কাবু হয়ে, দীর্ঘ গৃহবন্দিত্বের পর কোম্পানির বাংলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হলাম ১৯৫৫-তে, সে অবশ্য আমার দ্বিতীয় স্কুল যাত্রা৷ নতুন স্কুলে তখন সরকারী ত্রিভাষিক নীতি চালু৷ বাংলা অবশ্যই আমার প্রথম ভাষা, ইংরেজি দ্বিতীয়; তৃতীয় ভাষা হিসেবে বাবা আমার হয়ে বাছলেন সংস্কৃত — সে স্কুলে তার একমাত্র বিকল্প ছিল হিন্দি৷ পরে আবার হিন্দিকেও আবশ্যিক ঘোষণা করে বৎসরান্তে বাতিল করা হল নেহরুর তৎকালীন ভাষাভিত্তিক দ্বিধার দরুন; তবে সে অন্য গল্প, রাজনীতির গল্প৷ তার আগে ১৯৫১-তে চার বছর বয়স পুরতে না পুরতে ভর্তি হয়েছিলাম মিসেস ডি’ক্রুজের এলেবেলে স্কুলে, পড়েছিলাম ১৯৫৩ পর্যন্ত৷

বলছি বটে এলেবেলে, কিন্তু সেখানেই আমার ভাষা শিক্ষার উন্মেষ আর ইতিহাস প্রীতির আরম্ভ; আন্টি ডি’ক্রুজ়ের (ফ্লোরেন্স ডি’ক্রুজ়) এবং, ব্রেন্ডার কচি বয়সে অল্প কিছুদিনের জন্য তাঁর মায়ের, মত পড়ানোর সহজ ঢং আমি আর কখনও দেখিনি। মায়ের আলমারিতে অনেক পুরনো দস্তাবেজের সঙ্গে তোলা ছিল আমার সেই এলেবেলে স্কুলের খাতাপত্র। মায়ের মৃত্যুর পর সেগুলো উল্টেপাল্টে দেখতে গিয়ে চমকে উঠেছিলাম। ইজিপ্টের ভূগোল শিখতে গিয়ে নাইলের বিচিত্র গতিপথ তো বটেই, অধিকন্তু শিখেছিলাম ফ্যারাও সাম্রাজ্যের প্রথম হিয়েটাসের কথা৷

সেই লব্ধ জ্ঞানের সঙ্গে জুড়েছিল আমার গভীর কামলার সেই বছরটা যা আমাকে গৃহবন্দী রেখে পাঠতৃষ্ণা বাড়িয়ে দিয়েছিল স্বাভাবিকের চেয়ে ঢের বেশি হয়ত। ফলে বাংলা স্কুলে অঙ্ক-অনভিজ্ঞ আমি অনেকটা বাড়তি প্রজ্ঞা নিয়ে এসেছিলাম; নিজে নিজেই শিখে নিয়েছিলাম সেই প্রজ্ঞার দন্তনখরাদি সযত্নে লুকিয়ে রাখতে। বুদ্ধ-সিদ্ধার্থরও কামলা হয়েছিল; তাঁকে সারিয়ে তুলেছিলেন ভিষকরাজ জীবক। তাইতে আমার ঠাকুমা বলতেন, “আমার এই নাতি স্বয়ং বুদ্ধদেব!” …

তারও অনেক আগে নাকি আমার অক্ষর পরিচয় — বাংলা অক্ষর — যে সব ছড়া বা সহজ গপ্পের বই কণ্ঠস্থ ছিল তার চিহ্ন দেখে দেখে, আর গ্র্যামোফোনের রেকর্ড পরিচিতির দৌলতে৷ এবং সেই সঙ্গে কবিত্বের উন্মেষ, যা আমাকে টা-টা বলে বিদায় নিয়েছে ভালো করে বড় হওয়ার আগেই৷ শুনেছি, তারও আগে, আমি নিজের মনে বলতাম “আবোল তাবোল বইঃ,/ খ্যাপার গানের গইঃ”৷ গুঢ়ার্থের খোঁজ করবেন না, প্লীজ়়, আর বিসর্গ দুটো ফাউ! একদা নাকি, গুরুগম্ভীর, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বলেছিলাম, “মহাভারতের আঁধার হল গতন গতন,/ খোলো দ্বার রঘু, বঘু বঘু!” ওই বঘু বঘু টুকু বাদ দিলে বাকিটা সহজবোধ্য; আর ছন্দ সৌকর্যে কোনও ছান্দসিক, স্বয়ং প্রবোধ সেনও খুঁত ধরতে পারতেন না৷ তাইতে ঠাকুমা বলতেন, “ক্ষণজন্মা!” বেঁচে থাক আমার পিতৃকুল!

“অস্তি গোদাবরিতীরে বিশাল শাল্মলী তরু…”

এখন বুকে হাত রেখে বলতে পারব না গল্পটা কোন শ্রেণীতে পড়েছিলাম, পঞ্চম না ষষ্ঠ! সেই শিমুল গাছটার শাখায় শাখায় ছিল মেলাই পাখির বাসা৷ আর মনে করতে পারছি না একটা বুদ্ধিমন্ত কাকের গল্প, যে জাপানি বোমারু পাইলটের মত, সাবুরো সাকাইয়ের মত, মিৎসুবিশি জ়িরো বিমানের সাহায্য ব্যতিরেকেই, অভ্রান্ত লক্ষ্যভেদ করত বারংবার (কাকেন পুরীষোৎসর্গং কৃত্বা পলায়মাস), সেটা হিতোপদেশ পাঠ-এর একই কাহিনির অঙ্গ না অন্য উপাখ্যান! স্কুলজীবন শুরু হবার ঢের আগে থেকে সেই বয়ানগুলো শুনে শুনে আমার কণ্ঠস্থ ছিল৷ এখনও চোখ বুজলে দেখতে পাই আমার চেয়ে বেশ কিছুটা বড়ো এক সম্পর্কে জ্যেঠতুতো দাদা ঝুল পড়া, ন্যাংটো এবং একলা বিজলি বাতির নিচে দুলে দুলে সরল হিতোপদেশ পাঠ মুখস্থ করছে — উচ্চপাঠের সেই হিন্দোল আমার রসানুসন্ধানের পাথেয় হয়ে রয়েছে সেই শিশুর মত, যে নতুন মন্দিরের জন্য তার দোলনটুকু দিয়ে দিয়েছিল (অলোকরঞ্জন, মাপ করবেন)৷ এঁদো বাড়ি, দিনের বেলাতেও অন্ধকার, তবে সেটা পয়োগ্রামের অভ্যস্ত ভদ্রাসনের বদলে পাওয়া ব্যারাকপুরের অযুত আরশুলা অধ্যুষিত প্রাক্-মিউটিনি প্রাসাদ, যেটা পরে গঙ্গাগর্ভে বিলীন, না বৌবাজারের বাড়ির ভেতরেও অন্ধগলির বহুকক্ষের ভুলভুলাইয়ার একটা, তা মনে পড়ে না শত চেষ্টাতেও৷ পয়োগ্রামের সেই সুখের আলয়, অভ্যস্ত আস্তানা, তাদের কয়েক পুরুষের ভিটে, তখন সীমান্ত ছাড়িয়ে এক ভ়িসা পথ দূর —  প্রায় চাঁদের কাছাকাছি৷

চোখ বুজে আমি সেই গোদাবরী নদী দেখতে পেতাম, শিশু চোখে তখনও ভালো-খারাপ-মাঝারি কোনও জ্ঞানাঞ্জনই লাগেনি — তাই অপাপবিদ্ধ দেখা৷ ইন্ডিয়ান অফ়়িসার্স’ কোয়ার্টার (আই.ও.কিউ.)-এর উত্তরে, কারখানা সীমায়, ছিল একটা বড়ো নালা, উৎপাদনের বর্জ্য জল সেই নালাবাহিত হয়ে একটা ঘরে পরিশোধিত হতো, তারপর পড়ত একটা বিশাল পাইপের মুখে; পাইপটা বিষোদ্গারের লজ্জায় সীতার মত পাতালে প্রবেশ করে ফেনায় ফেনায় উদ্ধত, অপেক্ষাকৃত কম বিষাক্ত জল উদগার করত ভাগীরথীবক্ষে — দূষণের আইন কানুন তখন আলগা ছিল আরও৷ পাঁচ নম্বরের চিত্তকাকা ফেনা  শুনলেই আমার নাম জড়িয়ে বলতেন “ফাল্গুনে গগনে ফেনে ণত্বমিচ্ছন্তি বর্বরাঃ” — সেই আমার ব্যাকরণ শিক্ষার শুরু! তবে নিতান্তই পল্লবগ্রাহী সেই শিক্ষা, কারণ দীর্ঘকাল আমার ধারণা ছিল চর্মচটিকা মানে চামড়ার চটি, তৈজসপত্র  মানে তেজপাতা, আর, কেন জানিনা, মনে হত, কেলেঙ্কারি আর ইদানীং শব্দ দুটি ইংরেজি থেকে আমদানি; পক্ষান্তরে, দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, মোচার ইংরেজি কলিফ্লাওয়ার, কারণ গুরবচ্চন বলত কেলা কা ফুল৷

আই.ও.কিউ. পিতৃদেবের তদানীন্তন হাল সাকিন, অবশ্যই কোম্পানি প্রদত্ত, শা’গঞ্জে তাঁর দ্বিতীয়৷ প্রথমটা, সিনেমাপারের সেই স্টাফ় কোয়ার্টার (১৭২ নম্বর কি?), প্রথমে ছিল বাবা আর খোকাদার যুগ্ম দখলে, পরে খোকাদার একার। যারপরনাই সুন্দরী এবং যুবতী মায়ের সঙ্গে আড়াই বছরের আমি প্রথম সেই বারো নম্বর কোয়ার্টার দেখি, আগেই বলেছি জ্ঞানাঞ্জনহীন চোখে৷ মা আমার চেয়ে কুড়ি বছরের বড়ো, আমার নাতিযুবক বাবা মায়ের চেয়ে চোদ্দ বছরের৷  জন্মে  ইস্তক শুনেছি সেটা প্রেমবিবাহ —  আজ  মনে  হয় শুরুতে হয়তো একতরফা

প্রেম ছিল সেটা৷

আই.ও.কিউ. নামটা পোশাকি, বোধহয় চটকল আমলের, কোম্পানির দস্তাবেজে অনেক পরে দেখেছি৷ আমাদের সময়ে লোকে বলত, “ওই যে, নদীর ধারে বারো কোয়ার্টার!” ব্যান্ডেলে ট্রেন থেকে নেমে রিকশাওয়ালাদেরও তাই বলতে হত৷ বাবারটা ছিল বারোটা আজব একতলা বাড়ির শেষের গৃহ: দুটো শয়নাগার, ভাঁড়ার (পেটপুজোর রসদের বদলে সেটা ছিল বাবার আলোকচিত্রীয় অন্ধকূপ) আর রসুই, বসা-খাওয়ার জায়গা, আর একটা জালে মোড়া পিছবারান্দা — শীত কালে দিব্যি তেল মেখে রোদ পোয়ানো যেত উত্তুরে হাওয়া সত্ত্বেও৷ সেখানে রাখা থাকত দস্তার লাইনিং দেয়া কাঁঠাল কাঠের একটা আইস বক্স, সবুজ রং করা। রোজ সকালে ভ়্যান রিকশায় এক চাঙড় বরফ আসত তার শীতলতা বজায় রাখতে। বাক্সের পেছনে একটা সরু নল ছিল গলা জল নির্গমনের জন্য, তাই পিছবারান্দায় স্থান হয়েছিল তার। বাজারে পছন্দ মত মাছের চালান অনিশ্চিত, রাধা সিঙের দোকানে হপ্তায় তিন দিন পাঁঠা কাটা হত — তাও একেকদিন একটু দেরি হয়ে গেলে খতম। তাছাড়া একতলা বাড়িটায় গরমও ছিল খুব; সোলান নাম্বার ওয়ানের খালি বোতলে জল ভরে অথবা ভ়িমটো আর লেমনেড ঠান্ডা করা হত সেই ফ্রিজপূর্ব যুগে।

বাবা বলতেন, “অসুবিধে একটাই, কারণ স্নানঘর ইয়েঘরও একটা; এখানেও তুমি বাহির থেকে দিলে বিষম তাড়া!” কলকাতার বাড়িতেও ছিল সবেধন নীলমনি একটি মাত্র বাথরুম, তাও নির্জলা — কলঘর থেকে মগে করে পেতলের গাড়ু ভরে নিয়ে যেতে হত; নয়তো পরমাত্মীয় কোনও যোগানদার মারফত! পরে এস্টেটের যে বাড়িতে বাবার আমৃত্যু ছিলাম আমরা, সেখানেও সেই বিষম তাড়া  বাবার সঙ্গ ছাড়েনি৷ পিছবারান্দার ওপাশে বাঁধানো উঠোন আর ডাকটিকিটের চেয়ে অনেকটাই বড়ো বাগান একটা — কেষ্ট মালির দৌলতে বছরভর সপুষ্পক৷ বাগানের উত্তর সীমায় বর্শা গাঁথা পাচিল, পাচিলের ওপারে একটা তেপান্তরের মাঠ, স্থানীয় জলকলের সম্পত্তি; সেখানে মাঝে মাঝে স্কাউট ও গাইডদের শিক্ষানবিশি কুচকাওয়াজ হত৷

বারোটা একতলা বাড়ি পাশাপাশি তবু ঠিক জ্যামিতিক রেখায় ছিলনা — কোনওটা আগু, কোনওটা পিছু, কোথাও কোথাও অনেকটা ফাঁক৷ স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে তবে পাঁচ ও ছয় সংখ্যক বাড়ির মধ্যে ছিল বিস্তর অন্তর — হয়ত একটা গোটা সাড়ে পাঁচ নম্বরের জায়গা হত সেখানে৷ সেখানে সযত্নে অযত্নে বেড়ে উঠেছিল বিস্তর শিউলি, বকুল, হাস্নুহানা, অশোক, নাম না জানা অনেক গাছ, আর একটা একলা কদম, তার ক্ষীরকদম্বের মত ফুল বর্ষার পিচের রাস্তায় হেলাফেলায় ছড়িয়ে থাকত আর ততোধিক হেলাফেলায় পদপিষ্ট হত করুণাহীনতায়৷ পিটুলি গাছটা কেউ পোতেনি, কাকবিষ্ঠায় গজিয়েছিল হয়ত তার অবাঞ্ছিত শুঁয়োপোকার সম্ভার নিয়ে — নিশ্চয়ই সেই চটকলের যুগ থেকে, এত বুড়ো!

প্রতিটি গাছে অসংখ্য পাখির বাসা, তারা এতো বাঙ্ময়, এতো সশব্দ, যে হয়তো তাদের কথা ভেবেই কবি লিখেছিলেন এতোটুকু যন্ত্র হতে এতো শব্দ হয়!  কর্মব্যস্ত ও কলহপরায়ণ বিহঙ্গ-চীৎকার  রবিবার  ভোরেও  থামত না,  আমার  নিদ্রাপিপাসু বাবা-মা পাশ ফিরে দ্বিতীয় ঘুমের সুযোগ পেতেন না ছুটির দিনেও৷ দিনান্তবেলায় তারা পুনর্বার চেঁচাতো, হয়তো বা আসন্ন নিদ্রাসুখের কথা ভেবে, হয়তো স্ব-স্বভাবে৷ সেই পক্ষীকুলের সমবেত পুরীষে সাদা হয়ে থাকত নিচের পিচরাস্তার ওই ইলেকটুকু; বর্ষার অঝোর ধারার দু’মাস বাদ দিলে মনে হতো খড়ি বাঁধানো পথ৷

বড়ো নালাতে গোদাবরিত্ব আরোপ অন্যদের কাছে ঠাট্টার বিষয় ছিল নিশ্চয়, তবে নিতান্ত অমূলক ছিল না; নালার যে দিকে বিস্তর ঝোপঝাড়, সেই দিকে ছিল বনস্পতির মত উঁচু একটা কণ্টকায়িত শিমুল গাছ, বসন্তে লালে লাল হয়ে থাকত; দুঃসময়ে অনেক পাখিকে আশ্রয় দিত, সন্দেহ নেই৷

পূব দিকের ফাটক থেকে একটা কালো পিচের রাস্তা ধা পশ্চিমে গিয়ে শেষ হতো আমাদের বাড়ি একটু পেরিয়ে, তারপর আমাদের ঝোপবেষ্টিত কানামাছি আর রুমাল চোর খেলার মাঠ, ছোট মাঠ, মাঠের উত্তর-পূর্বে দুটো করুগেটেড টিনের গেরাজ — তার একটাও আমাদের নয়, গাড়িই ছিলনা আমাদের৷ ছোট মাঠের উত্তরে বইত বৈতরণীর মত, থুড়ি … গোদাবরীর মত, সেই বড় নালা৷ বড় মাঠটা বৃক্ষে গুল্মের জংলা পাড় নিয়ে বিশাল — ওই কালো রাস্তাটার দক্ষিণ দিগন্ত জুড়ে ছোট মাঠের চৌহদ্দি পর্যন্ত — সেটা বড় ছেলেদের ফুটবল খেলার মাঠ, কাকিমা-মাসিমাদের গুঞ্জনের মাঠ, ক্বচিত কখনো বিয়েশাদি-মুখেভাত হলে প্যান্ডেল বাঁধার মাঠ৷ আর ওই যে টিনের গেরাজ, তার পাশে নির্ভরশীল সাধ্বী সতিনের মত একজোড়া বেনারসি পেয়ারা গাছ সোহাগে স্বপনে বেড়ে উঠেছিল৷ বাবা বলতেন, “বাকি ভারত যাকে আমরুদ (অমৃত) বলে, বাঙালিরা নাসপাতি-পেয়ারের সঙ্গে বাহ্যিক তফাত না করতে পেরে তাকেই বলত পেয়ারা,” তা হবেও বা! সঙ্গে ছিল ডাল-মে-কালা একটা দলছুট জামরুল৷ মোদ্দা কথা, অন্দরমহলের লালিমা সমেত পেয়ারাগুলো মিষ্টি ছিল খুব; ক্ষণজন্মা জামরুলগুলোও, দাড়ি আর কাঠপিঁপড়ে বাদ দিলে, খাসা৷ শর্করালোভী দারুপিপিলিকাদের সঙ্গে লড়াই করে গাছে উঠতাম আমরা — এ ব্যাপারে আমার বয়স্য নন্তু ছিল স্বয়ং শিবের শ্বশুরের মত দক্ষ!

শ্রীযুক্ত আইজ়্যাক মোহিনীমোহন ড্যানিয়েল ছিলেন কোম্পানির দক্ষতম রসায়নবিদ; তাঁর কথা উঠলে আজও, সেদিন থেকে ছয় দশকাধিক পরে, ইয়ং বেঙ্গল যুগের বাঙালি মহাকবির কথা মনে পড়ে, হয়ত বাইবেল ও শ্রীকৃষ্ণকীর্তন থেকে ধার করা ব্যক্তিনামের যথেচ্ছ সংমিশ্রনের কল্যাণে৷ তাঁর মেয়ে, হাসি, আমার সঙ্গে পড়ত, ডাক্তার হয়েছিল পরে; ছেলে রিন্টু তখনও জন্মায়নি বোধহয়, জন্মালেও নিতান্ত ইনফ়্যান্ট; ঝন্টু তো কাকিমার মনের মাঝারে ইচ্ছা হয়েই ছিল তখন৷ বিকেল সাড়ে চারটেয় আপিস সারা হলে ড্যানিয়েলকাকা ছাতা মাথায় তাঁর প্রাত্যহিক ব্যায়াম সারতেন সেই পূর্ব-পশ্চিম দুশো গজ রাস্তায় এদিক ওদিক কয়েকবার হনহন করে হেঁটে৷ বিকেলে, কারণ সাড়ে সাত সকালে যাঁকে আপিস যেতে হয়, তাঁর পক্ষে প্রাতঃভ্রমণ দুষ্কর৷ ছাতা মাথায়, নইলে গোদাবরী তীরের যতেক বিহঙ্গ নিরস্ত্র, শিরস্ত্রাণহীন মানুষ দেখলেই চাঁদমারির মহড়া নেবে!

শ্রীযুক্ত গিও’র নামের বানান Guillot ছিল কিনা হলফ করে বলা যাবে না; সেই নাতিদীর্ঘ পৃথুল মানুষটির ছেলে, চেস্টার, আমার এলেবেলে স্কুলের সহপড়ুয়া ছিল৷ পদবির উচ্চারণটা অন্তত সঠিক৷ গিওসাহেবের মা সারা দুপুর তাঁদের ছ নম্বরের সামনের সিঁড়িতে বসে কিছু না কিছু বুনতেন: শীতকালে পশমি জামা, বাকি বছর জুড়ে লেস৷ বরিশাল-মাহিলারার শ্রীযুক্ত চিত্তরঞ্জন সেনমজুমদার কলেজে আমার পিতৃদেবের সহপাঠী ছিলেন৷ তাঁর আই.ও.কিউ.-এর আস্তানা পাঁচ নম্বরে৷ তাঁর মাতাঠাকুরানি সারা দুপুর তাঁদের সিঁড়িতে বসে ন্যাকড়ায় দেয়া বড়ি, চাটাই-কুলোর আমসত্ত আর আচারের বৈয়াম নিয়ে সতত পলায়মান রোদ্দুরের পেছনে ধাওয়া করতেন৷ (বৈধব্যসূচক কদমছাঁট পাকা মাথা; চিবুকের ওপরেও বড়োসরো আঁচিলের মধ্যে অলক্ষ্যে গজানো একটি সাদা চুল ছিল তাঁর — বিপত্তারিণীর মাদুলির চেয়ে ঢের বেশি এফ়েক্টিভ় ট্যালিসম্যান৷ চিত্তকাকার মেয়ে, পুতুলদি, সৌভাগ্যের চিহ্ন সেই নিঃসঙ্গ দাড়িটি উৎপাটন করে, জ্যামিতি বাক্সে ফুল-বেলপাতার সঙ্গে ভক্তি সহকারে ভরে, পরীক্ষা দিতে যেত৷ পরের বছর হাপইয়ার্লির আগেই আবার গজিয়ে যেত সেই মহার্ঘ্য চিকুর!) সারা দুপুর যে যার নিজের কাজ করতে করতে, সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, স্ব-স্ব মাতৃভাষায়, অনুচ্চস্বরে অনর্গল কথা বলে যেতেন দুজনেই, যেন কত না গোপন শলাপরামর্শ করছেন, অথচ কেউ বুঝতেন না কারু কথা — শুনতেও পেতেন না বোধহয়৷

অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বলুন, চাই, ইউরেশিয়ান, চারটে ফিরঙ্গ পরিবার ছিল বারো কোয়ার্টারে: ক্যাসটেলারি, ওয়ালিংটন, জোনস এবং গিও৷ আমরা আই.ও.কিউ. ছাড়বার ঢের আগে জোনসসাহেবের দেহান্ত হয়, এবং খোকাদা, সম্পর্কে আমার পিসতুতো দাদা, তাঁর খালি করে দেয়া আট নম্বরে ঢোকে৷ আট নম্বরে থাকতেই বিয়ে হয় খোকাদার, শ্রীপল্লির কালিপদদার মেয়ে কনীনার সঙ্গে (দিদিটা ভালো, আমায় ফলসা খাইয়েছিল); সে বিয়ে আমি প্রত্যক্ষ করেছিলাম, এবং স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জেগেছিল “বিয়ে হল, আগুন জ্বালিয়ে যজ্ঞ হল, তবে বিয়ের সাত দিন পরেও পুত্র হল না কেন?” তা নিয়ে এত হাসাহাসির কি!

ন নম্বরে ছিল এক পঞ্জাবি পরিবার; তাঁদের ছেলে বি আমার সমবয়সী, তাও তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হল না; হল না, কারণ তার ছিল অদম্য যৌন কৌতুহল; আড়াল পেলেই সে গোপনাঙ্গ পরখ করে দেখতে চাইতো ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে৷

সাত নম্বরে স্বল্পকাল ছিল বেনুগোপাল-বিজয়লক্ষ্মী, তাদের পারিবারিক নাম মনে নেই তবে, অ্যালফ়াবেট ক্লাসে য়্যাফ-য়্যাল-য়্যাম শুনে, তারা যে দক্ষিণী তাতে সন্দেহ ছিল না৷ ওপাড়ায় বাংলা ও হিন্দি একেবারে বলতে বা বুঝতে পারত না একমাত্র তারাই৷

এতদিনের ব্যবধানে নিশ্চয় করে বলা মুশকিল, তবে বারো ঘরের অন্তত দশটায় আমার নিকটবয়সী ছেলেমেয়ে ছিল৷ বারো ঘর মিলিয়ে এক উঠোন না হোক, একই মাঠে খেলতে-খেলতে লড়তে-লড়তে বড় হয়েছি আমরা, বহুভাষিক মিশ্রসংস্কৃতির আবহাওয়ায়; তাই হয়ত বাড়তি সংস্কারের বোঝা থেকে শতহস্ত দূরে থাকা অপেক্ষাকৃত ভাবে সহজ হয়েছে৷

###

সেই জোনাকিরা

সুদূর শৈশবের  স্মৃতিচারণ  হুগলিভাগীরথীর  তীরে  থ়িক্সোট্রপিক  চোরাকাদায়  অসাবধানে হাঁটার সামিল — আমার সুহৃদ সুবীরের মডেল গ্লাইডার একবার খেই হারিয়ে নদীর ধারে পড়াতে গোবিন্দ ঘোষের ছেলের যা হয়েছিল…৷ তখন উদ্ধারকারীকে উদ্ধার করে কে! কোনটা যে নিখাদ স্মৃতি আর কোনটা নকল পাদপ্রদীপে আলোকিত, বোঝা মুশকিল৷ একেকটা স্মৃতি, নিজেই বুঝি, গুরুজনদের কাছে অতিশ্রবণে কচলানো পাতি লেবুর মত; কোনওটা আবার আবছা হয়ে যাওয়া পুরনো ফ়োটোগ্রাফ়ে নকল টিন্ট চড়ানো; অনেকগুলোই ছোটছোট আধ-চেনা টুকরো স্মৃতির কাট-অ্যান্ড-স্প্লাইস সংস্করণ — নির্ভরযোগ্য নয় মোটেই!

আমার জন্মক্ষেত্র ২০২-এর এজমালি ছাদে ভাঙা ট্রাইসাইকেলের চাকাসমেত অক্ষদন্ড নিয়ে কুরুক্ষেত্রে কর্ণের মত বারবেল প্র্যাকটিস মনে পড়ে প্রায় বিনা চেষ্টায়৷ আমার প্রমাতামহের শ্রীপল্লি-শান্তিনিকেতনের বাড়ির কুয়োতলায় তারস্বরে কালিন্দী নদীর কুলে গাইতে গাইতে দুলে দুলে উদোম নাচের কথাও স্পষ্ট মনে পড়ে — নৃত্যের উন্মাদনায় কে বা কারা আমার দোদুল্যমান নিষ্পাপ প্রত্যঙ্গ সকৌতুকে দেখছে, তারও খেয়াল ছিল না আমার, মনের অন্ধকার কোণে সে খেয়ালের সূচনাই হয় নি তখনও৷ তবে দুটো ঘটনারই খাকি হয়ে যাওয়া কিন্তু প্রামাণিক আলোকচিত্র মায়ের সংগ্রহে আশৈশব দেখে আসছি৷ কিছুদিন আগে পর্যন্ত এমন সব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষদর্শী গুরুজনেরা বেঁচে ছিলেন যাঁরা আজীবন সেসব কথা ভুলতে দেননি৷

আমার প্রথম বাস্তব ও স্বতন্ত্র স্মৃতি বোধহয় ওই বারো নম্বরকে ঘিরে৷ তখনও আমি মিসেস ডি’ক্রুজ়ের এলেবেলে স্কুলে ভর্তি হইনি, তখনও চার পুরোতে বেশ কয়েক মাস বাকি, ঝমঝম বৃষ্টি পড়ছিল সারাদিন — পশ্চাদ্দৃষ্টিতে বুঝি ভরা বর্ষা ছিল তখন, হয়ত বা কবিকথিত মন্থর জুলাই অঙ্কের হিসেবে সেটা ১৯৫০-এর জুলাই হওয়া স্বাভাবিক৷ অবিশ্রান্ত ধারায় আমার মাঠে যাওয়া হয়নি, ডাকতেও আসেনি কেউ৷ বৃষ্টি যখন থামল তখন অস্তরবির প্রহর, স্নাত আকাশে সূর্য নেই, শুধু তার রেশটুকু আছে৷ মা তখন, অগত্যা, পেছনের বাঁধানো আঙনে ক্যাচ বল খেলার অনুমতি দিলেন৷ সে হল গিয়ে একলা ফ্যাকলা নিরুত্তেজ খেলা, মন কাড়া মত্ততা নেই তাতে৷ হয়ত এদিক ওদিক চোখ যাচ্ছিল খেলুড়েদের খোঁজে৷…

তখনই হঠাৎ চোখে পড়ে সেই রত্নমালার নাচ: অযুত-কোটি জোনাকির এক ঝাড়, যেন একটাই উজ্জ্বল নতমুখ ঝুমকো জবা, ভাস্বর এবং থরোথরো বেপথু, একেকবার জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ  আর পরক্ষণেই নিম্নপ্রভ৷ শ্রাবণের বেখেয়ালি হাওয়ায় এদিক ওদিক দুলছিল সেই জোনাকীয় সত্তা; দুলতে দুলতে, কাঁপতে কাঁপতে, ঔজ্জ্বল্যের বিস্তার দেখাতে দেখাতে সে ছোট মাঠের পশ্চিমতম কিনারের ঝোপজঙ্গল ভেদ করে আমাদের পাছ আঙনের দিকে এগিয়ে আসছিল জুলাইয়ের মতই মন্থর গতিতে৷ তারপর বর্শা গাঁথা পাচিল ডিঙিয়ে কালোকোলো লোহার সেপাই অধ্যুষিত জলকলের মাঠে ঢুকে প্যালেস বোর্ডিঙের জংলা কিনারে স্বেচ্ছায় হারিয়ে গেল৷

সে বয়সে সেই গজগামিনীর বর্ণনা করার উপযোগী বোধ বা ভাষা ছিল না আমার, যা লিখলাম তা পরিণত বয়সের স্মৃতিচারণের ফল৷ সেটা যে আদতে ধুস্তরী মায়া বা অবোধ শিশুর রজ্জুতে অজগর ভ্রম নয়, বুকে হাত রেখে আজ আর বলা যাবে না৷ এত বছর ধরে তিল তিল  করে সঞ্চয় করা জ্ঞান, অভিজ্ঞান, শিক্ষা,  দরকচা-মারা সংস্কার ইত্যাকার উপাদানের সঙ্গে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে  হয়ত ছবিটা ফুটে উঠেছে আজ৷ কিন্তু সত্যিই বিশাল ছিল সেই সত্তা, আমার লম্বা গোছের বাবার চেয়েও অন্তত দু হাত উঁচু, নিচের ঘেরটাও হবে ছ ফুট খানেক৷ মনে হচ্ছিল, সব মিলিয়ে সেটা জ্যান্ত, বুদ্ধিদীপ্ত, অনির্বচনীয় গেস্টাল্ট সত্তা যেন একটা, একটা বুদ্ধিমন্ত নেবিউলা যেন যোজন আলোকবর্ষের দূরত্ব থেকে নেমে এসেছে৷…

সেযুগে ফিরঙ্গদের পছন্দের মিষ্টান্ন ছিল ক্যারামেল কাস্টার্ড আর মোল্ডেড জেলি — পলসনের জিল্যাটিন পাউডারে জল-চিনি মিশিয়ে, ছাঁচে ঢেলে তৈরি — দুটোই নাড়া খেলে থরথর করে কাঁপত৷ আমাদের বাড়িতেও সেই সাগরবেলায় বহু টারেটময় বালুদুর্গের মত জেলি মোল্ড ছিল ছ’টা — তার একটা, আমার প্রথম সজ্ঞান পুরী ভ্রমণে, সেই যেবার খুকুমাসি গিয়েছিল আমাদের সঙ্গে, দুর্গ নির্মাণের জন্য বাবা সযত্নে প্যাক করেছিলেন মায়ের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও৷

সত্তাটা অন্তরালোকিত মোল্ডেড জেলির মত থরথর করে কাঁপছিল, শরীরের আলাদা আলাদা জায়গায়, গবাদি পশু যেমন ডাঁশ বসা ত্বকাংশ আলাদা করে কাঁপাতে পারে৷ একই সঙ্গে সে জেলিফিশের মত ত্রিমাত্রায় গতিশীল — সেই উজ্জ্বল জেলিফিশদের ছবি বড় হয়ে কেতাবে দেখেছিলাম, আর তাদের জঙ্গমতার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল গহন সমুদ্রের একটা অসামান্য ফরাসি ডকুমেন্টারি দেখে৷ নিজে নিজেই নিজের শরীর তারা টেনে লম্বা করে, পরক্ষণেই হ্রস্ব; সেভাবে তারা নিয়ন্ত্রণ করে স্বীয় চলন৷

সেদিনের সেই জোনাকীয় গেস্টাল্টটা বড় নালা, তার কিনারে গাবভেরেণ্ডার পাঁচ-ছ টা গাছের জটলা, আকন্দ, ধুঁধুল আর তেলাকুচো লতা, বিছুটি আর নিমঘেঁটুর ঝোপঝাড়, পাতাবাহার আর অযত্নলালিত জংলি গাছগাছড়া পেরিয়ে এগুবার সময়, পাচিল টপকে জলকলের মাঠে ঢোকার সময়, ইয়োইয়োর মত যথেচ্ছ ওপরনিচ করছিল সাবলীল ভঙ্গিতে, পারদের মত কাচ না ভিজিয়েই ত্রিমাত্রায় গড়াচ্ছিল৷ দেখেই বুঝেছি, জান বুঝকে নিজের গন্তব্যের ঠিকানা নিজেই খুঁজে নিচ্ছে! মনে হচ্ছিল অনন্তকাল ধরে দেখছি কিন্তু দু এক মিনিটের বেশি আমার দৃষ্টিপথে ছিলনা সেটা৷ পাচিল পেরিয়ে, হাঁটু সমান ঢালাই লোহার ফাঁপা ভেন্টিলেটরগুলোর স্থানু কুচকাওয়াজের ওপর দিয়ে, যেন তাদের কুশল প্রশ্ন করতে করতে, এগিয়ে চলল সেই সত্তা৷

ভেন্টিলেটরগুলো জলকলের সম্পত্তি, তাদের আমি লোহার সেপাই বলতাম — সাঁঝবেলায় তেমনই দেখাত তাদের, আবার সারা গায়ে লম্বা লম্বা ছিদ্র, মাথায় ঢালাই হেলমেট৷ আমার মনের চোখে দেখতাম, পনেরোই অগস্ট ময়দানে ওয়াচ অ্যান্ড ওয়ার্ডের কাতারের পিছুপিছু লোহার সেপাইদের কুচকাওয়াজ, দাপিয়ে চলেছে পতাকার দিকে মুখ ফিরিয়ে, স্থানু কনুই; ক্লাব হাউসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ইউনিয়ন প্রেসিডেন্ট নির্মল সেন মাইক হাতে বলছেন, “আজ এই পতোকার নিচে…”৷

আমিও, বক্তৃতা নয়, নিভৃত আলাপচারি করতাম তাদের সঙ্গে, তারা যে আমার জাদু জগতের সখা! তাদের পল কাটা অবয়ব দিয়ে হাওয়া বয়ে যেত — সেদিন সেই বাদলা হাওয়া নিশ্চয়ই জোরেই বইছিল অন্য দিনের চেয়ে — সানাইয়ের পোঁ ধরার মত গম্ভীর আওয়াজে৷ তখনকার অপুষ্পিত বোধশক্তিতেও মনে হয়েছিল আরও একটা বুদ্ধিদীপ্ত জাদুকরি সত্তা আমার নিজস্ব জগতের সঙ্গ চাইছে — লোহার সেপাইগুলোর মত, দক্ষিণারঞ্জনের বুদ্ধুভুতুম লালকমল নীলকমলের  মত৷  হয়ত সে  আমাকে যাচাই করতে এসেছিল সম্ভাব্য সহচর হিসেবে৷

মনে আছে, তার শরীর থেকে একটা আবছা গুঞ্জনের শব্দ আসছিল, এখন মনে হয় সজ্ঞানে মডিউলেট করা আওয়াজ: কম্পাঙ্ক আর আর আলোর মডিউলেশন, যেন সত্যিই কিছু বলছিল কোনও দুরূহ ভাষায় — সুধীন্দ্রনাথ যাকে যবনের নিবিদ  বলেছেন৷ হয়ত আমার সঙ্গে নয়, নিজের সঙ্গেই কথা বলছিল সে — এই যেমন এখন আমি কীবোর্ডে নিজের সঙ্গে কথা বলছি৷…

অনেক বছর পর একটা ট্র্যান্সফ়়র্মারের পাশে দাঁড়িয়ে আমি সে গুঞ্জন আবার শুনেছি, তবে যান্ত্রিক, তাতে ভাষাভ্রম হয়নি৷

সত্তাটা দৃষ্টিপথের বাইরে চলে যাবার পরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম আমি, ফিরে দেখার লোভে, তারপর একদৌড়ে মায়ের কাছে গিয়ে রুদ্ধশ্বাসে দৃশ্যটা রিলে করলাম৷ মা ভালো করে না শুনেই সহাস্যে মাথা নাড়লেন, ঠিক যেভাবে বড়রা অনেক কথা না বুঝে না শুনেই মাথা নাড়ে৷ আমার বাবাকে লোকে বলত বহুজ্ঞানী — তাঁকে পর্যন্ত আমি শোনাতে পারলাম না সেই অবাক করা জোনাকিদের কথা! অথচ, পরে যখন হেপাটাইটিসে হলুদ হয়ে শয্যাশায়ী আমি, এই বাবাই কত লুপ্ত হয়ে যাওয়া অতীত জন্তুদের (যাদের আজকের ছেলেমেয়েরা জুরাসিক পার্কের ডাইনোসর বলে জানে) কথা বলতেন৷ তাদের কেউ কেউ হাতির চেয়েও কয়েকগুণ বড় কিন্তু তৃণভোজী, কোনওটা বা হরিণের মাপের তবে হিংস্র মাংসাশী৷ বর্তমান যুগেও নাকি আছে সাগরের অগম্য গহনে দানবিক স্কুইড, অর্ণব সর্প (ফ্রিল শার্ক?), লক নেস দানব, আরও কতো সব অবিশ্বাস্য জীব৷ হাওড়া থেকে বাড়ি ফেরার সান্ধ্য ট্রেনে সদ্য কেনা একটা লাইফ় ম্যাগাজ়িনের ছবি দেখিয়ে বাবা বুঝিয়েছিলেন, দূরের নীহারিকা থেকে দলছুট একটা নাতিবৃহৎ গ্রহাণু পৃথিবীর সঙ্গে ধাক্কা খেলে, অথবা নাকি কান ঘেঁষে গেলেও, কিভাবে এক লহমায় শেষ হয়ে যাবে দুনিয়া! আমি নাকি তখন আশঙ্কায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিলাম৷ তখন কি অবিশ্বাস করেছি সেসব আজগুবি কথা!

…হয়ত সেদিনটাই ছিল আমার নিষ্পাপ শৈশবের ইতি, চার পুরতে তখনও চার মাস বাকি, কারণ সেদিনই বুঝে নিয়েছিলাম, বড়দের যতটা সহানুভূতিশীল দেখায়, যতটা সর্বজ্ঞ, তার সিংহভাগ মেকি; বিজ্ঞ শিশুদের নিজেরটা নিজেই দেখা ভালো৷

###

ক্রমশ

                           

Other posts in <aniruddhasen.wordpress.com> and <apsendotcom.wordpress.com>