সেই জোনাকিরা (৭–৯) ৷৷ অনিরুদ্ধ সেন

2 05 2013

There are 19 sections of these memoirs, divided into 6 posts, this being the third.

বিকিকিনির হাট

যে দিন  সকালে  লুচি  হত  না,  মানে রবিবার ছাড়া অন্য কোনও দিন আমরা কলকাতায় থাকলে,  সেদিন দেশপ্রাণ  মিষ্টান্ন  ভান্ডার  থেকে  আসত  ছোলার ডাল  সহযোগে হিঙের কচুরি, অভাবে ডালপুরি আলুরদম, এবং অনুপান হিসেবে জিলিপি৷ একটু লায়েক হতেই সংগ্রহের ভার ন্যস্ত হয় আমার ওপর৷ সে দায়িত্ব অবশ্যই গুরুভার ছিল, কারণ শালপাতা ঢাকা বাঁশের চাঙারি ভেদ করে তদানীন্তন নাগরিক চিলেদের এক্স-রে নজর চলত; অন্তত দু বার তাদের নখরাঘাতে আহত হয়েছি, মনে পড়ে৷ সে যুগে ফি শীতে প্রত্যেক দোকানে কড়াইশুঁটির কচুরি হত, বলতে হত না, আর ফুলকপির সিঙাড়া৷ আটপৌরে আলুর সিঙাড়াও যত্নে তৈরি হত ছোট করে কাটা, জুঁই ফুলের মত সাদা আলু-ছেঁচকি দিয়ে, আজকের মত রোগামোটা, অপটু হাতে তড়িঘড়িতে কাটা কালোকোলো আলুর ঘ্যাঁট দিয়ে নয়৷ রাজভোগের ঠিক মাঝখানটিতে থাকত একটা প্রমাণ সাইজের ক্ষীরের গুলি, ভিমটোর বোতলের গুলি ছিপির মত; নকুলদানার ভেজাল সে তুলনায় নিতান্ত অর্বাচীন৷

তামাম বালিগঞ্জ অঞ্চলে ভদ্রপদবাচ্য রেস্তরাঁ ছিল না একটাও৷ এখন যেখানে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ দিয়ে গড়িয়াহাট বাজার যেতে ডানহাতি গলির মুখে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, যে গলি দিয়ে ঢুকে হিন্দুস্থান পার্ক, সেই গলিতে মাঝামাঝি কোথাও, একতলায়, প্রথম একটা রেস্টুরেন্ট হল, নাম নিরালা৷ অনেক বছর পর সেটার স্বনামে স্থানান্তরণ ও অধঃপাত হয় ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলির দোতলায়৷ সাতের দশকের মাঝামাঝি ক্ষণস্থায়ী সফ়ারির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল গড়িয়াহাট  রোডে, বিধায়ক সুব্রত মুখার্জির বাড়ির কাছে৷ ডান দিকের দু নম্বর হিন্দুস্তান মার্টে জুতোর দোকান, ছবি তোলার স্টুডিও ইত্যাদি ছিল৷ বাঁ দিকের এক নম্বর হিন্দুস্তান মার্টের ভেতর ছিল উল হাউস, পুজোর পরেই মা সেখানে মকর সংক্রান্তির আগমন যাচ্ঞা করে হানা দিতেন: বেড়াল ছানার মত ছোট ছোট রংবেরঙের উলের বল, নতুন প্যাটার্ন বই, বুনবার কাঁটা, লেসের কুরুশ, সবই পাওয়া যেত সেখানে৷ তার ধারেকাছেই ছিল মায়ের তথাকথিত দেওরের দোকান — মালিক মাকে বৌদি বলে ডাকত তো! সেখানে অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা হ্যাম বেকন তো পাওয়া যেতই, আর পাওয়া যেত ফুলকাটা কাচের গেলাসে মধু এবং তিন চার কিসিমের চীজ়, ওই কাচের গেলাসেই আসতো ক্রাফট চীজ়, অপেক্ষাকৃত সস্তা, কালিম্পঙের সত্যিকারের টফ়ি — ললিপপের মত কাঠি গাঁথা, তা ছাড়া মহিলাদের প্রসাধন সামগ্রী এন্তার৷

তখন বাঙালি মধ্যবিত্ত কথায় কথায় নিউ মার্কেট যেত না, আর শপিং মলগুলো দূর ভবিষ্যতের গর্ভে৷ আমরা সপ্তাহান্তে কলকাতা আসার সময় হাওড়া থেকে ট্যাক্সি নিতাম পার্ক স্ট্রীট পর্যন্ত৷ ট্রিংকা’স তখনও টী-শপ, সেখানে বাবা মা চা খেতেন, একটা বাড়তি পেয়ালা আমার জন্য, আর, এক পট চায়ের সঙ্গে আসত পেস্ট্রিগাছে দুটো পেস্ট্রি, দুটোই আমার; আলাদা করে তার বরাত দেয়া হত বলে মনে পড়েনা৷ পার্ক স্ট্রীট থেকে ট্রাম ধরে কলকাতার বাড়ি৷

ততক্ষণে সূর্যদেব অস্তমিত, গোটা চৌরঙ্গি অঞ্চল আলোয় আলোময়৷ আমরা মফসসলবাসী গাঁইয়ারা চোখ ট্যাড়া করে দেখতাম৷ পার্ক স্ট্রীটে পৌঁছবার আগেই চোখে পড়ত বিশাল বিশাল সব আলোকিত বিজ্ঞাপন৷ একটা লিপটনের টী-পট কাত হয়ে স্বর্ণাভ চায়ের ধারায় ভরে দিচ্ছে একের পর এক পেয়ালা, নীল নদের ক্যাটারাক্টের মত৷ আরেকটাও আমার নজর কেড়েছিল অন্য কারণে:  একটি লোক,  নাম গোত্র পরিচয়হীন,  একটা উদুখলের মধ্যে দড়ি বাঁধা মন্থন দন্ড ঘোরাচ্ছে অবিশ্রাম, নিচে লেখা টি.এ.এস.৷ দেখে আমার ধারণা হয়েছিল দধি মন্থন করে নস্য তৈরি হয়!

ছবি আঁকার সরঞ্জাম কিনতে বাবা যেতেন জি.সি.লাহায়৷ তার অনতিদূরে ছিল ক্যামেরা এনলার্জার ইত্যাদি সারাইয়ের দোকান, অতুল দাস এন্ড সন্স৷ ফিল্ম কাগজ আর পরিস্ফুটনের রসায়ন কিনতে গ্র্যান্ড হোটেলের কাছে অন্য একটা দোকান৷ মনে আছে, প্রথম চিনে খাওয়া খেয়েছিলাম পার্ক স্ট্রীটের পিপিঙে, খাইয়েছিল আমার পিসেমশাই (সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়), তাঁকে তাতু  বলতাম আমি৷ কেকের সরঞ্জাম মা কিনতেন নিউ মার্কেটের একটা বিশেষ দোকান থেকে৷

শা’গঞ্জে আমাদের বেশির ভাগ রসদ স্থানীয় বাজারেই জুটে যেত; একটু বেয়াড়া সামগ্রীর জন্য ছিলেন তুলসীবাবু, তাঁর আসল নাম, শুনেছি, হরিসাধন ভড়, হুগলি চকবাজারে তাঁর দোকান ছিল৷ আমরা তাঁর দোকানে বিশেষ যেতাম না, তিনিই আসতেন সাইকেল চালিয়ে ঘরে ঘরে, ডেলিভারি অর্ডার লিখে নিয়ে যেতেন: মোহন মিকিন্সের কর্ন ফ্লেক্স (বাক্সের একপিঠে খাসা মুখোশ, ফুটকি বরাবর কেটে নিলেই হলো), কোয়েকার ওটস, মোহন মিকিন্সের কর্ন ফ্লাওয়ার, পলসনের এক পাউন্ডের চীজ়ের টিন, আমার কেডসের সাদা রং, মঙ্ঘারামের বিমিশ্র বিশকুটের টিন, বাবার জন্য প্লেয়ার্স নাম্বার থ্রি সিগারেটের কৌটো এক কার্টন ভর্তি, আর সোলান নাম্বার ওয়ানের দুটো বোতল — তুলসীবাবুর আবগারি লাইসেন্স নিশ্চয়ই ছিলনা কখনও! একটা বড় মাপের পারিবারিক আঘাতের পর নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন তুলসী বাবু৷ চেশায়ার ক্যাট হাসতে হাসতে মিলিয়ে যেত, স্মিতাননের হাসির রেশ টুকু ফেলে রেখে; তুলসীবাবু যখন আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেলেন, তাঁর জীবনের বিষাদের আভাস আমার মনের মধ্যে জেগে রইলো দীর্ঘকাল।…

তখনও এদেশে কনজ়িউমারিজ়মের ৎসুনামি আছড়ে পড়েনি৷

তা বলে কি চাহিদা কম ছিল আমাদের? উপরের ফিরিস্তি দেখেই বুঝতে পারছেন, মোটেই তা নয়৷

নতুন জামাকাপড়ের দরকার হলে গোবিন্দবাবু, যাঁর পেশাদারি নাম নেম কার্ডের বয়ান অনুযায়ী গবিন্স, মানে গবিন্স অভ় গবিন্স এন্ড রবিন্স, নিয়ার রক্সি সিনেমা, ক্যালকাটা৷ পাঁচ মাইল দূরের চুঁচড়ো থেকে সাইকেল ঠেঙিয়ে শনিবার ধরে আসতেন; মল্লিকাশেম হাটের কাছে বাড়ি, পরনে মিলের ধুতির ওপর হাত-গুটোনো তৎকালীন সামনে-বন্ধ হেমন্ত কুমার শার্ট, গলায় ঝুলত ট্রেড মার্ক ফিতে৷ খুব মৃদুস্বরে কথা বলতেন, প্রেমালাপের মত, তবে কানে খাটো, তাঁর সঙ্গে চেঁচিয়ে কথা বলতে হত৷ “খোকার জন্য দুজোড়া ট্রাউজার্স বানিয়ে দিই, সার, দেখুন এক নম্বর মাখম জিন আছে চারটে রঙে, খাপি, সেই সঙ্গে চারটে শার্ট!” বলাই বাহুল্য, তখনও আমার ট্রাউজার্সে উন্নয়নের কয়েক বছর বাকি!

ফুলিয়া বসাকপাড়া থেকে নবীন বসাক আসতো দু গাঁঠরি শাড়ি নিয়ে; সে ফেল করলে আসতো ধনেখালির শাড়িওয়ালা৷ শাল, ব্রয়ডার করা স্কার্ফ নিয়ে আসতো কাশ্মীরওয়ালা, সঙ্গে কয়েকটা আগাপাশতলা নিপুন কাজ করা হাতবাক্স আর আখরোট কাঠের ফোল্ডিং টেবিল৷ আমাদেরটা একদা তার কাছেই কেনা৷ অ্যাপ্লিকের আর চিকনের কাজ নিয়ে মেটিয়াবুরুজ থেকে আসত মিতবাক ওসমান, তার একটা পা ছিল ছোট৷

কেকম্যানের কথা অন্যত্র বলেছি, বলা হয়নি পার্ক সার্কাসের বিশকুটওয়ালা হোসেনের কথা। সেও আসত কালো সিন্দুক মাথায়: তার মধ্যে থাক থাক সাজানো নানখাটাই, বাকরখানি, সুজি তক্তি, পিলা তক্তি, হরা তক্তি, দুধিয়া ইত্যাদি হরেক মুসলমানি বিশকুটের সম্ভার। ডিমের সাদা, মিহি চিনি আর অনেকটা হাওয়া দিয়ে ফেটিয়ে তৈরি ফেনি বাতাসার মত ম্যাকারুন, হোসেনের জবানিতে তার দেশি নাম মকরন্দ্, অ-কারান্ত সংস্কৃতে যার মানে ফুলের মধু, মুখে দিলেই মিলিয়ে যেত পি.সি.সরকারের (অবশ্যই কালের নিরিখে সিনিয়র এবং তখনও একমেবাদ্বিতীয়ম!) জাদুর মত। বিজাতীয় নামগুলো আমার নবলব্ধ বৌদির মুখে প্রায়শই গুলিয়ে যেত৷ একবার মকরন্দ্ দেখতে না পেয়ে সে হোসেনকে শুধিয়েছিল, “খন্দখান আনোনি?” আমি ছিলাম সে রসনাস্খলনের একমাত্র সাক্ষী। তার সঙ্গে আমার কবিখ্যাতি লোভ মিলে গিয়ে দিকে দিকে রটি গেল ক্রমে যে বৌদি “বলেছে খন্দখান, তাহার করিব পিন্ডদান!”

সোফা সেটির নতুন আপহোলস্ট্রি চাই, রং জ্বলে ভ্যাসটা হয়ে গেছে? খাটের পুরনো গদিটা মিউনিসিপ্যালিটির বরাতে তৈরি রাস্তার মত দেবে গেছে কয়েক জায়গায়, চাই নতুন ছোবড়ার ফেস লিফট? ইশাক তো আছেই, খবর দিলে তড়িঘড়ি আসবে, পাছে বাঁশবেড়ের ঘনশ্যাম বরাতটা তুলে নেয়৷ কাঠপালিশের মাস্টার ছিল শরৎ সরণির ইসমাইল, মুখটা সর্বদা হাঁ করা, খয়েরের ছোপ ধরা অবশিষ্ট কয়েকটা দাঁত, ঘোলাটে চোখ দিয়ে সর্বদা জল ঝরছে৷ সে কাছে দাঁড়ালেই স্পিরিটের গন্ধ পাওয়া যেত৷ ন্যাকড়ার নেচি বানিয়ে গালা, রং আর কি কি সব স্পিরিটে গুলে কাজটা করত কিন্তু নিখুঁত! মায়ের ধারণা ওই স্পিরিটের ভাপে তার সদা অশ্রুময় চোখ; বাবা বলতেন, “স্পিরিটটা ঠিকই ধরেছ, ফেমিনিন ইনটিউশন; তবে যতটা পালিশে লাগে তার দশ গুণ ও গলায় ঢালে৷”

মাছি আটকানোর সুইংডোরের আর জানলার তাম্রময় ঊর্ণাজাল কোন ইন্দ্রজালে প্রায়ই ফেটে যেত৷ অল্প ফাটলে কোম্পানির কার্পেনট্রি ডিপার্টমেন্ট থেকে আসতো ‘বাঙাল’, ম্যাচিং (মানে কম বা বেশি কলঙ্ক ধরা) তার দিয়ে ফাঁসা জায়গাটা রিপু করে দিত বেমালুম৷ বেশি ফাটলে, দরজার কিংবা দেয়াল আলমারির কাঠের কাজ থাকলে বাঙালকে সঙ্গে নিয়ে আসতো ছেদিলাল ছুতার৷ সে ছিল আমার রোল মডেল, সেই যখন আমি বড় হয়ে তুরপুন করাত রেঁদা হাতে ছুতোর হওয়ার খোয়াব দেখতাম৷ আই.ও.কিউ. ছেড়ে এস্টেটে যাওয়ার পর আমাদের সাফাই করত ঝগড়ুর মা; ঘরবারান্দা ঝাড়ামোছা, জানলা সাফ, ব্রাশ দিয়ে মশারি-জাল সাফ, স্টেটসম্যান ভিজিয়ে জানলা আর স্কাইলাইটের কাচ সাফ, বাথরুম সাফ তো বটেই৷ তার ছেলে কোম্পানির পারমেন্ট সুইপার — সোজা কথা! ঝগড়ুর মা সঙ্গে নিয়ে আসতো দুই নাতনি এতোয়ারি আর জামেলিয়াকে, তারা দুটিতে আমার ভাইকে সামলাতো৷ ওই এতোয়ারির কাঁখে চেপে বুগনু স্কাইলাইটের জালের বাইরে বাসা বাঁধা চড়াইদম্পতি কে দেখত, দেখত চড়াই শিশুদের ক্রমাগত খাওয়ানোর প্রয়াস, আর আবিস্কারের বিস্ময়ে চোখ বড়ো বড়ো করে, ঢোঁক গিলতে গিলতে দিনান্তে আমাদের বলত, “তোতো পাকি মার দুদু কায়!”

আই.ও.কিউ.তে সাফাইয়ের কাজ যে করত, নোয়াখালির সেই বিশ্বনাথকে দেখে আমার ঝাড়ুদার হওয়ার ইচ্ছেও হয়েছিল একবার৷ রাজা হওয়ার মত চেহারা ছিল তার, মুখের ভাষা অবশ্য কখনও বুঝতে পারিনি চেষ্টা করেও; না মা, না আমি৷ তারপর আলটপকা মরেই গেল লোকটা৷

খোকাদা-বৌদির খাস খানসামা ছিল রমণী৷ দারুন মটন রোস্ট বানাত,  রোস্টান্তে ধারালো ছুরি দিয়ে পাঁচ মিলিমিটর মোটা করে নিখুঁত কাটা, সঙ্গে ব্রাউন সস আর জ্যাকেট পোট্যাটো; আর খোকাদার রোজ কার কাজের দিন, নিয়ম করে সকাল দশটায় বৌদির জন্য আগে থাকতে আধ সেদ্ধ করে রাখা আলু দিয়ে আঙ্গুলের মত মোটা মোটা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই! ছুটি থাকলে আমিও যথা সময় বৌদির কাছে উপস্থিত হতাম৷ একটু দেরি হলে বৌদি শুধাত, “রমনী, আলু ভাজো নি?”

###

কলকাতা কলকাতা

আমাদের কলকাতার আস্তানা, ২০২ রাসবিহারী অ্যাভ়িনিউ, আধুনিক বাংলা কবিতার ঠিকানা হিসেবে তামাম কবিতাপ্রিয় বাঙালির চেনা, অন্তত এক কালে তাই ছিল৷ ডোভ়র লেনের দিক থেকে রমণী চাটুজ্যে স্ট্রীট দিয়ে সোজা এসে রাসবিহারী অ্যাভ়িনিউ পেরুলে যে কালো লোহার দু পাল্লার গ্রিল গেটটায় থমকে দাঁড়াতে হয় (আজকালকার ফঙ্গবনে সেকশন ওয়েল্ড করা নয়, দস্তুরমত ঢালাই করা মাল), সেটাই ২০২, অবশ্য হকারদের নিবিড় অরণ্য ভেদ করে যদি এখন দৃষ্টি যায়! আমার শিশুকালের গড়িয়াহাট অনেক পরিপাটি ছিল, ফুটপাথে অনেক গাছ, অ্যাভ়িনিউ নাম সার্থক: রাসবিহারী বিথী৷ ঠাকুদ্দা ঠাকুমার ঘরের জানলা দিয়ে রমণী চাটুজ্জে বরাবর নজর চলত বহু দূর — কংক্রিটারণ্যে ঠেকে যেত না৷

ট্রামের ঝঞ্ঝনায় একেকদিন কাকভোরে ঘুম ভেঙে গেলে সেই জানলায় দাঁড়াতাম, দেখতাম বাতিওয়ালা রাস্তার আলো নেভাচ্ছে, কালো লোহার ফ্রেমের চার দিকে কাচ, উলটোনো পিরামিড ফ়্রাসটাম বাতি৷ মই ঠেস দেওয়ার জন্য বাতিস্তম্ভের যুতসই জায়গায় চ্যাপলিনের নেকটাইয়ের মত দুটো আধ-হাত খানেক গোলমুন্ড হাতল৷ ভিস্তিওয়ালারা মোষের চামড়ার ভিস্তি কাঁখে রাস্তা ধুচ্ছে রোজকার রোজ৷ আমাদের বাড়ির কাছে গঙ্গাজলের নলধারা ছিল সতত প্রবহমানা; দমকলের একচেটিয়া সেই হাইড্র্যান্ট খুলে দিয়ে জীবনানন্দের কুষ্ঠরোগীর পক্ষে জল চেটে নেয়া সম্ভব ছিলনা কোনমতে, কারণ হয়ত প্রবাহরোধের কলকব্জা, ম্যানহোলের ঢাকনাগুলোর মত, চুরি হয়ে গিয়েছিল কবে, অথবা সে হয়ত বা একদিন গিয়েছিল ফেঁসে; তাই হোজ় দিয়ে জল দেবার সুযোগ ছিল না আর! আর জন্মান্তরের উপেক্ষায় অনপহৃত পড়ে ছিল প্রাগৈতিহাসিক বিশাল বিশাল দুটো ঢালাই লোহার চৌবাচ্চা, ট্রামের দীর্ঘবিলুপ্ত ঘোড়াদের জল খাবার জন্য, জানলা দিয়ে যে দৃষ্টিপথ তার কিছুটা বাইরে৷

ওই ভিস্তিওয়ালাদের জনৈক আমাদের স্নানঘরের দু-দু’টো মস্ত ড্রামে রোজ ভরে দিত স্নানের জল — একেকদিন দুবার — কারণ প্লাম্বিং এর দোষে সরকারি জলে কোনওমতে রান্নাঘরের জলাধার গুলো আধভরা হত৷ পেতলের গাগরি ভরে টিপকল থেকে খাবার জল আনত খ্যান্ত পিসি, পরের দিকে ষষ্ঠীর মা; পেছনের বারান্দার রেলিঙের বেদিতে সার সার মাটির কুঁজো, কলসি আর সুরাইতে জল ইভ়াপোরেশনে ঠান্ডা হয়ে থাকত দারুণ গ্রীষ্মে — দাদু বলতেন, “এলিমেন্টারি ফিজ়িক্স!” বাতিওয়ালা সন্ধের মুখেও আসতো মই কাঁধে বাতি জ্বালাতে৷ ওরিয়েন্টাল কোম্পানির গ্যাস, কর্পোরেশনের বেতনভুক বাতিওয়ালা৷

দাদু চালচুলো,   মানে  ফিটিং জামা  প্যান্ট  জুতো আর লম্বা চুল,  পছন্দ করতেন না৷ আমার শার্টের পুট প্রায় কনুই অবধি, আর হাঁটু-প্লাস-চার-ইঞ্চি হাপপ্যান্ট — বেল্ট না কষে, গ্যালিস না ঝুলিয়ে পরা যেত না কোনমতে; পাদুকালয়ে মাপ দিইয়ে দু-সাইজ বড় জুতোর বরাত দিতেন, নতুন জুতো পরতাম তুলো গুঁজে — সেসব বাড়তি বয়সে অনেক কাল চলতো৷ (ভাগ্যে দাদাদের হ্যান্ড-মি-ডাউন জামাকাপড় ছিল, নইলে লোকসমাজে বেরুনো দুষ্কর হত; আমি নাকি অচেনা জামা প্যান্ট পেলেই জিজ্ঞেস করতাম, “এটা কের ছিল?”) পরামাণিক কাকাকে ডেকে পাঠাতেন ঘনঘন, পেছনের বারান্দায় টুলের ওপর আনন্দবাজার মুড়ি দিয়ে বসতাম, দুএকবার আমি দাদা বাবা জ্যেঠা ও দাদু স্বয়ং মাথা পেতেছি পরের পর, যদিও বাবার মাথায় তখনই ইন্দ্রলুপ্তির করাল গ্রাস! পরামানিক কাকিকেও কয়েকবার দেখেছি — নানার, মায়ের, জ্যেঠির বা নমিতাদির হাত-পায়ের নখ কেটে দিচ্ছে, পায়ে তেল মাখিয়ে, মালিশ করে, ফাটার ওপর ঝামা ঘষে মরামাস তুলে আলতা পরিয়ে দিচ্ছে।

ওই পেছনের বারান্দার ঠান্ডা সিমেন্টের রেলিঙে চিবুক রেখে দাঁড়ালে দেখা যেত হিন্দুস্তান পার্কে সুনীতি চাটুজ্যে মশাইয়ের বাড়ি (এখন, হায় ভাষাচার্য, সেখানে ফ্যাব ইন্ডিয়ার দোকান) আর সযত্নলালিত বাগান, বিস্তীর্ণ বাগান — অন্তত আমার শৈশবে সেটা বিস্তীর্ণ দেখাত৷ তারও ওপারে অখিল হাউস  নামাঙ্কিত বাড়ি৷ কবে একদিন সুনীতিবাবুর বাগান জুড়ে, দাদুর বারান্দা থেকে স্পষ্ট দেখা যাওয়া অখিল হাউস ঢেকে, গজিয়ে উঠলো একটা স্বভাবসিদ্ধ, কদর্য বহুতল৷

সুনীতিবাবুর বাড়িতে দু’একবার গেছি বাবার সঙ্গে৷ তাঁর বাগানের একান্তে কয়েকটা কলাগাছ ছিল, হয়ত নিস্ফল বাহারি কলা৷ রাতের অন্ধকারে পেছনের বারান্দা থেকে তাদের আবছা দেখা যেত, হালকা হাওয়ায় পাতা দোলাচ্ছে; শিশুমন দিয়ে দেখলে মনে হত অনেকগুলো ডাইনি বুড়ি — ইংরেজিতে গোটা একটা কোভ়়েন — আমাকে ডাকছে, আয় আয়৷ কল্পনাবিলাসী চোখে আমি অখিল হাউসের ছাদে অনেক ছোট ছোট পরি ও পর দেখতাম৷ শৈশবটা আসলে রূপকথারই দুনিয়া: রাজপুত্তুর রাজকন্যে নিয়ে মেয়েরা ভাবে হয়ত, আমার জগতে পরি পর, ডাক ডাকিনী, দৈত্য দানবরা যত্রতত্র বিচরণ করত৷ রুনকি, আমার পিসির (করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়, দাদা দিল্লির রেওয়াজে ডাকতো বুয়া, অতএব আমিও) মেয়ে, ঠিক দশ মাসের ছোট আমার চেয়ে; আমার ওপর তার অগাধ বিশ্বাস৷ তাকে বলেছিলাম সুনীতিবাগানের সেই ডাইনিতত্ত্ব, এবং পত্রপাঠ সে বিশ্বাস করেছিল; যদিও আমি নিশ্চিত জানতাম দিনের আলোয় কোভ়েনটা আটপৌরে কলার ঝাড় হয়ে যায়৷ রুনকি সে কথা কি করে জানবে, ওরা যে গড়িয়াহাট মার্কেট পেরিয়ে, আলেয়া সিনেমা পেরিয়ে, গিনি ম্যানশনেরও ওপারে  সেই সুদূর একডালিয়ায় থাকে!

দাদারাও, মানে জ্যেঠা জ্যেঠি দাদা, আগে কলকাতায় থাকতনা; ওদের ডেরা রাজধানী শহরে৷ গ্রীষ্মের এবং/অথবা পুজোর ছুটিতে আসতো৷ দিল্লি থেকে স্কুলের শেষ পরীক্ষা দিয়ে তারপর ওরা কলকাতায় এলো পাকাপাকি৷ আর আমরা, মানে বাবা মা আমি, থাকতাম একঘোড়ার শহর শা’গঞ্জে, কলকাতা থেকে স্থলপথে চল্লিশ মাইল দূর, রেলপথে হাওড়া টু  ব্যান্ডেল চল্লিশ কি.মি. ছাপা থাকত উত্তরছাপ্পান্ন টিকিটে৷ হ্যাঁ, ১৯৫৬-তে হাওড়া-ব্যান্ডেল রেলপথের বিদ্যুতায়ন হয়, অল স্টপ এক ঘন্টা, গ্যালপিং ৪০ মিনিট, আগে লাগত দেড়-পৌনেদুই ঘন্টা; এখন নতুন করে আবার তাই, আমরা পিছু হটছি কিনা! লিউইস ক্যারলের বাচ্চা অ্যালিস সাচ্চা বুঝেছিল, এক জায়গায় থাকতে গেলেও প্রাণপন দৌড়োতে হয়; আমাদের জননেতারা সেটা ঠিক বোঝেননি এখনও!

ফি শনিবার আমরা সপরিবারে কলকাতায় যেতাম, ফিরতাম হয় রবিবার বেশি রাতে, নয়তো  সোমবার  খুব  ভোরে৷  রাতের  ট্রেনে ফিরলে আমি উৎসুক হয়ে লজেন্সওয়ালা শম্ভুকে খুঁজতাম: হাতে মস্ত একটা তারের বলয়, তা থেকে নানা বর্ণ-গন্ধের ল্যাবেনচুষের সেলোফেন প্যাকেট ঝুলত, “প্যারি  লরেন, প্যারি লরেন, নেবেন ভাই, প্যারি লরেন, নেবু লরেন, অরেন লরেন, হজমি লরেন!” আর উঠতেন শ্বেতকেশ বলাইবাবু, নেমে যেতেন মানকুন্ডুতে; তিনি আমাকে ইসকা মন্তর ফিসকা মন্তরের জাদু শিখিয়েছিলেন জোরদার, নিমেষে জোড়া আঙুলের দৈর্ঘ্য পরিবর্তনের অমোঘ, নজর কাড়া জাদু! কদাচিৎ ভোরের ট্রেনে ফেরার সময় এক শ্মশ্রুগুম্ফময় গেরুয়াপরা ভেকধারীকে দেখতাম; সে দোতারা বাজিয়ে মাঝে মাঝে কন্যাদায়গ্রস্তদের উদ্দেশে গাইতো “টাটা-বাটা-**** বড়, সেথায় জামাই সন্ধান কর” (নক্ষত্র চতুষ্টয়ের জায়গায় যে কোনো একটা তৎকালীন, লাগসই, বহুজাতিকের নাম কল্পনা করে নেবেন), তবে সে বাউল ছিলনা বোধহয়৷

সেই শা’গঞ্জ তখন এক ঘোড়ার শহর তো বটেই! ব্যান্ডেল স্টেশনে তখন একটা, মানে একটাই, সার্থকনামা স্টেশন ওয়াগন ছিল, সবুজ রঙের, সাতটা থেকে সাতটা, সুপ্রাচীন ফোর্ড, তার পেছনের একটা দরজা কেরোসিন কাঠের; সওয়ার ভর্তি হলে অথবা ড্রাইভার সাহেবের মর্জি হলে ছাড়ত৷ আর ছিল মজিদ মিঞার এক-ঘোড়ার ছ্যাকরা৷ সাইকেল রিকশা অবশ্যই থাকত তবে সংখ্যায় নগন্য, বেশি রাতে তারা জুজুর ভয়ে বাড়ি যেত শুতে; মাথায় থাকুক অন্ন চিন্তা — আপনি বাঁচলে বাপের নাম! জি.টি. রোডে ক্যাম্বেল দম্পতির হত্যা কাণ্ড পাবলিক অতো দিন পরেও মনে রেখেছিল৷

তখন হাওড়া স্টেশন থেকেও অবশ্য ঘোড়ার গাড়ি নির্বাসিত হয়নি — সীমিত রাস্তায়, কাছের রাস্তায় চলত; আলাদা স্ট্যান্ড ছিল বোধহয় আজকের স্টিমারঘাটার টিকিটঘরের কাছে৷ অশ্ববরে মাখামাখি হয়ে থাকত তাদের পার্কিং লট। একবার ভারি বর্ষণে কলকাতা অর্ধনিমজ্জিত, যন্ত্রযান অকুলান, হাওড়ায় নেমে অসহায় আমরা গ্র্যান্ড হোটেল অবধি ঘোড়ার গাড়িতে গিয়েছিলাম — আবছা মনে আছে — সেখান থেকে ট্যাক্সি৷

আমি যখন কলেজে (১৯৬২-৬৩ থেকে ৬৪-৬৫), গড়িয়াহাটের স্বর্গ হইতে পতন  তখন থেকে শুরু৷ ১৯৬৩ বা ৬৪র ঝড়বাদলে অনেক গাছ পড়ে যায়, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, বিচ্ছিন্ন ট্রামের বিজলি, জল থইথই ডোভ়র লেন৷ এখন যেখানে এল.আই.সি.-র কদাকার, শ্রীহীন আবাসন, সেখানে ছিল নয়নাভিরাম ফাঁকা মাঠ, ফি শীতে সঙ্গীত সম্মেলন হত৷ পড়ে যাওয়া গাছগুলো আর ফিরে লাগালো না কেউ৷ বাংলা নববর্ষের সময় একমাস, দুর্গা পুজোর সময় একমাস, ফুটপাথে সেল সেল হোল সেল বসত, আবার উঠেও যেত৷ রাস্তা ধোয়া বন্ধ হয়েছিল আগেই, ক্রমে ক্রমে ভিড়ভাট্টা বাড়তে লাগলো, হিন্দুস্তান মার্টের জলুস খসে নতুন নতুন দোকান খোলা হল৷ আর জনসেবায় শাড়ি কেনেনা কেউ, পাদুকালয়-জাতীয় ব্র্যান্ড পদমর্যাদাহীন জুতোর দোকান টিমটিম৷ তখন থেকে সাবেক দক্ষিণের অনাদর শুরু, পরে এলো মধ্য কলকাতার সাহেবি পাড়ার পালা৷ তারপর থেকে অদ্যাবধি শহরের পরিধি বেড়েছে, নিঃসন্দেহে, কিন্তু অপশাসনের গতি রুদ্ধ হয়নি৷ দুচারটে ফ্লাই-ওভার দিয়ে কি শহরের চরিত্র পালটায়?

সম্ভবত ১৯৭১-এর পাক-ভারত যুদ্ধের পর তোলাবাজরা রাজনৈতিক দাদা দিদির সাজে হকারদের সঙ্গে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে — সায়েবি আমলের জমিদারি প্রথার অনুকরণে। মুক্তির দশক  সত্তরের  দশকে  মুহুর্মুহু  বিদ্যুৎমোচনও শুরু হল, থামল অনেক পরে অরাজনৈতিক বিদ্যুৎমন্ত্রী শংকর সেনের হাতযশে, যদিও বামাচারী সরকার অন্ধকারমুক্তিকে সাঙ্গঠনিক কীর্তি বলে দাবি করতেন৷ তারপর একদিন হকার্স’ বুলেভ়ার্ড উঠে গেল উড়াল পুলের খাতিরে, কিন্তু পঙ্গপালের মত নিত্যনতুন হকার রাস্তার এপার ওপার দখল নিল পাকাপাকি৷ সে অন্য গল্প৷ ইদানীংকার নীল সাদা রঙের ঘনঘটা আর রামকৃষ্ণদেবের মত ত্রিমুদ্রা বাতিদান অন্যবিধ পরিবর্তন  সূচিত করছে হয়ত, যদিচ আমার বয়স্ক ম্লান দৃষ্টিতে এখনও বাড়তি কোনও চিহ্ন দেখিনি — সেটাও অন্য গল্প, অন্য যুগের কাহিনি৷

কালো গেটের ডানদিকের পাল্লায় একপা ফাঁসিয়ে অন্য পায়ের ধাক্কায় আমরা মহানন্দে ক্যাঁচকোঁচ করে দুলতাম — দীর্ঘকালীন মজবুতির পরীক্ষায় সসম্মানে পাশ করেছিল ঢালাইয়ের কারিগর — তবে দরওয়ানজি দেখতে পেলে তেড়ে এসে বিনীত ভঙ্গিতে তুলসীদাসি সুর করে বলত, “ভেঙ্-গে গেলে গির পড়োগে, চোট লাগেগা, বুঢ়াবাবুকো নুকসান হোবে!” গেটের ডানদিকে ফুটপাথ থেকে খাড়া উঠে গেছে একটা তিনতলা বাক্সবাড়ি৷ তার রাস্তামুখী একতলায় কয়েকটা দোকান: আগে ছিল সীবনী, পাদুকালয় আর টাইমকো, তারও আগে সীবনীর জায়গায় ছিল দরোয়ানজির একটি মাত্র পা-কলের দোকান, পর্দা সেলাই, থানকাপড় বা ধুতি দিয়ে লুঙ্গি সেলাই, মায় উজ্জ্বলা ছুটকির ফ্রক (আমারও একটা কামিজ় একবার) সেলাই হত, পুজোর আগে রড থেকে ঝুলত বেশ কিছু অর্ডারি শার্ট প্যান্ট৷ এখন সেখানে সার সার শাড়ি আর রকমারি রেডিমেড জামাকাপড়ের দোকান — চেনা দায়!

মাস পড়লে দরওয়ানজি এসে বাড়ি ভাড়া নিয়ে যেত বাড়িউলির প্রতিভূ হয়ে; পারসি বাড়িউলিকে আমি অন্তত দেখিনি কখনও৷ দুর্গাঠাকুর ভাসানের সময় দরওয়ানজি নানা দাদুকে দোকানের দুটো ভাঁজ করা কেঠো চেয়ার সসম্মানে বের করে দিত: “বাবুজি, মাজি, আরাম কোরেন, নহি তো থক জাওগে!” দাদু বলতেন ‘অতিভক্তি…!’

গেটের বাঁদিকে মদনের এক চিলতে পানবিড়ির দোকান, তবে সেখানে ভিমটো লেমনেডও পাওয়া যেত, পরের দিকে কোকাকোলা জুসলা৷ নরম করে চাইলে বেগনি লুঙ্গি, হাপহাতা গেঞ্জি আর হাতে গলায় অনেক মাদুলি তাবিজ পরা মদন মাঝেমধ্যে এক আধ চিমটে মিষ্টি মশলাও দিত — নিতান্ত অনিচ্ছায়৷ এখন সেখানে অনেকটা জায়গা জুড়ে বাটার দোকান৷

লোহার গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে ডানদিকে, দোকানের পেছনে, এক নম্বর ফ্ল্যাট: সেখানে এক বৃদ্ধ তাঁর দুই বয়স্থ ছেলে আর নববিবাহিত জ্যেষ্ঠ পুত্রবধুকে নিয়ে বাস করতেন৷ মা বলতেন মলিনা নামের মেয়েরা দুঃখী হয়; মলিনা কাকিমাও আমাদের চোখের সামনে কাঁচা বয়েসে বিধবা হন, টি.বি., তবে শ্বশুর ছোট ছেলের সঙ্গে তাঁর আবার বিয়ে দিয়েছিলেন৷ কালো গেট দিয়ে ঢুকেই সামনে অবশ্য একটা প্রশস্ত বাঁধানো চাতাল, আমাদের ফুটবল ক্রিকেট কিৎকিৎ খেলার জায়গা, কিন্তু পিট্টুর পক্ষে স্থান অকুলান৷ চাতাল পেরিয়ে আরেকটা তিনতলা বাড়ি, গেট যতটা চওড়া ততটা অফ়সেট করে সমান্তরাল; বহিরঙ্গে মনে হত হুবহু এক৷ দুটোরই ঠিকানা ২০২৷ ফুটপাথের ওপর যে বাড়িটা তার দোতলায় দু নম্বর ফ্ল্যাটে থাকতেন বুদ্ধদেব বসু — সেটাই কবিতাভবন, সেখান থেকেই কবিতা  পত্রিকা প্রকাশ হত, এবং বৈশাখী, আর এক পয়সায় একটি  সিরিজের চটি কিন্তু মূল্যবান কাব্যমালা৷ সুনীল বসুর মিলিতা  তার অন্যতম; তাঁর ঘোঁড়া   কবিতাটা চন্দ্রবিন্দুদোষে জ্যেঠার নাপসন্দ —  আমার পছন্দ ছিল কেঁচো  বলে কবিতাটা: “কেঁচো চেয়েছিল মাটিকে জানতে/ খানা খন্দলে দেহলি প্রান্তে…৷” আমিও যে আসলে মাটিকেই জানতে চেয়েছিলাম সেটা বুঝেছি অনেক অনেক পরে৷

ও বাড়ির মিমি রুমি আমার চেয়ে অনেকটাই বড় — দিদি পদবাচ্য, কিন্তু অকালমৃত পাপ্পা (শুদ্ধশীল) আমার সমবয়সী৷ তিনতলার তিন নম্বর ফ্ল্যাটে ছিলেন আরেক বিখ্যাত কবি, অজিত দত্ত; সেখান থেকে বেরুত দিগন্ত৷ তাঁর এক ছেলে, বাবলুদা, বাবা যে সংস্থায় চাকরি করতেন সেখানে শিক্ষানবিশী করেছিলেন কিছুকাল, তাই তাকে চিনতাম; শঙ্কুদাকে ততটা নয়; মেয়ে ঝুমাদি, রীতিমত সুন্দরী, বেতসলতার মত ছিপছিপে আর ব্যক্তিত্বময় — গড়িয়াহাটের সব তরুণ তাকে ফিরে ফিরে দেখত৷ এখন শর্বরী দত্ত নামে বিখ্যাত৷ (যখন ও-বাড়িতে থেকে কলেজে পড়ি, আমার জ্যেঠতুত দাদা যাদবপুরে, তখন বুঝতে শিখেছি ড্রেনপাইপ শোভিত যতেক ছোকরা গড়িয়াহাটের মোড়ে মেয়ে দেখতে জমায়েত হত, তার বারো আনা বেপাড়ার — দাদা বলত, চোখ যে ওদের ছুটে চলে গো! ধনের বাট, মানের বাট, রূপের হাট গড়িয়াহাটে তো বটেই৷ তা বলে দাদার চোখ কি ইতিউতি ছুটত না, আর আপনাদের বশংবদ তো চিরকাল সুন্দরের নীরব পুজারী!)

লব, কুশ আর পাপ্পা ছিল চাতালে আমাদের ক্রিকেট কিংবা ফুটবল, নিদেন মিনিপিট্টু খেলার সঙ্গী৷ চাতাল পেরিয়ে যে বাড়িটা, তার একতলায় চার নম্বর ফ্ল্যাট সিংহ পরিবারের; মিউকাকিমার বা তাঁর বড় জায়ের বাচ্চারা আমার চেয়ে অনেকটাই ছোট৷ পাঁচ নম্বরে আমার ঠাকুদ্দা ঠাকুমার আস্তানা৷ তেতলার ছ নম্বরে বিশ্বাস পরিবার; তাঁর দুই মেয়েও দিদিস্থানীয়; ছেলে, দেবুদা, আমার জ্যেঠতুতো দাদা কাজলের চেয়ে একটু ছোট৷ পরবর্তীকালে সে বাড়িতে তাদের আত্মীয়স্হানীয়, আমার নিকটবয়সী, দুই ভাই বোন থাকত কিছুকাল, হয়তো তাদের বাবাও, বোনের নাম পদ্মা, ভাইয়ের নাম মনে পড়ছে না, দুজনেই আমাদের চাতালখেলার সঙ্গী৷ চাতালের অন্দরপ্রান্তে একটা দু গাড়ির গেরাজ ছিল, তার দোতলায় একটা ছোট্ট এক কামরার আস্তানা, সেখানে চার সদস্যের এক পরিবার থাকতেন; পদবি মনে নেই, তবে উজ্জ্বলা আর ছুটকি দিদিবাচ্য হলেও লুকোচুরি খেলার সময় আমাকে অবজ্ঞা করত না — তখন অবশ্য আমার ফুটবল ক্রিকেটের বয়েস হয়নি! আমার বয়স হবার ঢের আগে অন্য কোথাও উঠে গিয়েছিল ওরা, আমার জ্ঞানত ২০২ থেকে সেই প্রথম প্রস্থান — দাদুররও আগে৷

ছবি তোলার জন্য স্বাভাবিক আলো দরকার হলে, অথবা গুরুজন পরিবৃত ফ্ল্যাটে সিগারেট খাওয়ার সুযোগ অকুলান হলে বাবা ছাদে যেতেন৷ দাদুর ফ্ল্যাটের এজমালি ছাদে একটা ভাঙা ট্রাইসাইকেল ছিল; ছিল মানে তার ভগ্নাবশেষ আরকি! কখনো ভাবিনি কার সাইকেল — দাদার না দেবুদার — হয়ত শিশুসুলভ অধিকারবোধে ভাবতাম আমারই! মনে আছে, তার বিচ্ছিন্ন দ্বিচক্র চক্রদন্ডটা দুহাতে বারবেলের মত মাথার ওপর তুলতাম অল্পায়াসে — বাবার তোলা একটা ফিকে হয়ে যাওয়া ছবি এখনো বোধহয় মায়ের ফেলে যাওয়া সযত্ন সংগ্রহের মধ্যে খুঁজলে পাওয়া যাবে — স্মৃতিটা হয়ত সেই ছবিটারই শুধু৷ ওই ছাদে দাঁড়িয়ে পাশের বাড়ির — যে দিকটায় এখন বাটার দোকান — খনাদি মনাদির সঙ্গে জমে গিয়েছিল আমার, আমারই মারফত আমাদের হাঁড়ির খবর তারা জানত —  মায়ের কাছে বকুনি খেতাম তাই৷ একেকদিন খাবার নিয়ে দুষ্টুমি করলে মা  এক  হাতে থালা অন্য হাতে আমার ঘেঁটি ধরে ছাদে ঘুরে ঘুরে খাওয়াতেন৷

…কোনো অজ্ঞাত কারণে হঠাৎ একসময় ছাদটা আমাদের অনধিগম্য হয়ে যায়; প্রথম প্রথম মিস করতাম খুব, পরে সয়ে গেল আর পাঁচটা বঞ্চনার মত৷ ছেলেবেলার কথা লিখতে বসে দীর্ঘকাল পরে সেই ছাদের কথা মনে পড়ল, যে ছাদটাকে শৈশবের স্বল্প পরিচয়ের পর আর দেখিনি কোনোওদিন, দেখবও না!

আর মনে পড়ল, গ্রীষ্মের দুপুর বেলা যখন ঠাকুদ্দা ঠাকুমার শয়নকক্ষের সব কাঠের জানলা বন্ধ, খড়খড়ির সূক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে তীব্র সূর্যালোক লখিন্দরের বাসরের ছিদ্রান্বেষী সাপটার মত অলক্ষিতে ঘরে ঢুকে পড়ত, তার মধ্যে আপন মনে নাচত লক্ষ ধুলিকণা৷ একেকদিন নিদ্রাহীন আমি দেখতে পেতাম সাদা পরদার ওপর রঙিন শাড়ির উলটো ছবি, রঙিন এবং সীমিত চৌহদ্দিতে চলিষ্ণু, খনাদি মনাদিদের বাড়ির মতির মা বেলায় কাচা কাপড় মেলছে: পিন হোল ক্যামেরার দ্য ভ়িনসীয় যাদু! দীর্ঘ, দীর্ঘতর নিশ্বাসের মত নির্জন আর বিধুর স্মৃতি সব, ফিকে হয়ে যাওয়া ফ়োটোগ্রাফের মত — জানিনা তার কতটা বাস্তব আর কতটা মায়া!

তবে, ওই বাড়ির কোনার ঘর, যেটা আগে ছিল বাবা মায়ের শয়নকক্ষ, মধ্যযুগে খাবার ঘর, সবশেষে দাদা বৌদির বাসর, সেটাই আমার জন্মস্থান; আমার চিকিৎসক দাদু নিজের হাতে আমায় আলো দেখিয়েছেন৷

###

যুগপতন

ঠাকুদ্দা (শচীন্দ্রনাথ সেন)-কে আমি দাদু বলতাম, ‘ওগো’ দাদু, কারণ ঠাকুমা (সুধা, ডাকনাম ননি) তাঁকে ‘ওগো’ বলেই ডাকতেন৷ পঙ্কজ মল্লিকের “ওগো তুমি পঞ্চদশী, তুমি পৌঁছিলে পূর্নিমাতে…” আটাত্তর আর.পি.এম. রেকর্ডটা বহু পুরনো — বাবাকে জিজ্ঞেস করে পঞ্চদশী মানে জেনেছিলাম এবং আন্দাজ করেছিলাম দাদুর পনেরো বছর বয়স; এমন আর কি! ঠাকুমাকে, হিন্দি বলয়ের লজিক উলটে, ডাকতাম নানা, দিল্লিবাসী দাদার দেখাদেখি৷ নানা ছিলেন বাঙালি মহিলাদের তুলনায় বিশালদেহী, লম্বা এবং চওড়া, ততটাই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, ডাকসাইটে সিভ়িল সার্জনের মেয়ে৷ আমার মনে পড়ার বয়সে ক্রমহ্রসমান স্থুলত্বের দরুন তাঁর গলার (আমি বলতাম গলকম্বল) এবং বাহুর (যেখানে বাজুবন্ধ পরত সেকালের এয়োতিরা) চামড়া ঝুলে পড়েছিল; ওজন কমলেও তেজ কমেনি এক রতি! বিস্তর বাংলা সাহিত্য পড়েছেন — নিজে কবিতা লিখতেন একদা — এমনিতে রাগিধাপি তবে সহজেই অশ্রুময়ী৷ দাদু তাঁর নিত্য হরিজন  পত্রিকা পড়া অন্ধ গান্ধিভক্তি নিয়ে কটাক্ষ করতেন সুযোগ পেলেই; সুযোগ জুটতোও সহজে৷

রাত থাকতেই অ্যালার্ম বাজিয়ে ঘুম ভাঙত নানার, তারপর বিছানায় শুয়েই হাততালি দিয়ে রামধুন৷  তাতে দাদুর এবং ঘরে বাইরে অনেকের ঘুমের ব্যাঘাত হত, কারণ নানার কন্ঠ জোরালো হলেও তাঁর কবিতার মত মিঠে ছিলনা মোটেই! রামধুনের পর আবার ‘বিপদে মোরে রক্ষা কর…৷’ তারপর বিনা চেষ্টায় ঘুমিয়ে পড়তেন নিজে, নাক ডাকতো অনতিমৃদু স্বরে; অন্যেরা তখন চারটের ট্রামের ঝঞ্ঝনার সঙ্গে ভেড়া গুনছে৷

শুনেছি, বাড়িতে প্রথম মশকনিবারণী স্প্রে-গান ও  ফ্লিট আসার পর দাদু  হস্তিশিকারির ভঙ্গিতে বিজাতীয় যন্ত্রটা ম্যানলিকারের মত বাগিয়ে ধরে নানার দিকে তাক করে বললেন, “আসো, তুমারে আগে শ্যাষ করি!” সেদিন নানার অশ্রুধারা বাগ মানাতে আমার বাপ মা ও বুয়াকে বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল! আমি আর দাদা মহানন্দে ছবি আঁকতাম: নানার চোখের জলে ধরিত্রী ভেসে যাচ্ছে, সেই জলে তৃপ্ত সাঁতার কাটছেন দাদু, ঠোঁটের কোনে চেশায়ার মার্জারের মত হাসি — ছবির নাম হত নানাশ্রম  কিংবা অশ্রুগঙ্গা৷

আমার ভ়িরুলেন্ট হেপাটাইটিস সনাক্ত করেছিলেন স্বয়ং পিতামহ, ডাক্তারি জীবনে তাঁর একেন উন অন্তিম রোগনির্নয়; অন্তিম ডায়াগনসিসটা ছিল তাঁর নিজের কর্কট রোগ৷ প্রথমে লিভ়র, সেখান থেকে প্যাংক্রিয়াস, তা থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে মধুমেহ, এবং শেষকালে অবশ্যম্ভাবী বহু-অঙ্গ হানি৷ আমরা সবাই তাঁর মৃত্যুর জন্য তৈরি ছিলাম৷ লুক লিখিত সুসমাচারে আছে, ভিষক, নিজের চিকিৎসা কর আগে;  দাদু নিজের রোগ নির্মূল করতে পারেননি কারণ তখন কর্কট রোগের কোনও দাওয়াই ছিলনা, কিন্তু নির্ণয় করতে ভুল হয়নি।

মফসসলে চাকুরিরত আমার বাবা কিংবা দিল্লিস্থ জ্যেঠার পক্ষে অনির্দিষ্টকাল কাজ ছেড়ে পিতৃসেবা সম্ভব ছিল না৷ অতএব, আমার মায়ের কাঁধে সে গুরুদায়িত্ব পড়ল৷ আমি তখন সদ্য কামলার স্বর্ণাভা মুক্ত কিন্তু সম্পূর্ণ সুস্থ নই, স্কুলে যাইনা, বাড়ির বাইরেও নয়, কারণ ঠাকুদ্দার আশংকা ছিল তাতে আবার সেকন্ডারি ইনফ়েকশন হতে পারে৷ আমিও তাই সে যাত্রাতেও মায়ের পদাঙ্কে কলকাতায়৷ গৌরীমাসি ঠিক করে দিয়েছিলেন কৃষ্ণাদিকে — একটি সদ্য এম.এ. পরীক্ষা দেয়া মেয়ে — ঘন্টা খানেক আমাকে লেখাপড়ার তালিম দিত রোজ৷ রজনীকান্তের গান ভালো গাইত বলে নানা একেকদিন তাকে কবজা করে নিতেন; তাইতে হয়তো আমার বিদ্যে বুদ্ধি বিশেষ এগুলো না!

কেউ কেউ বলেছিলেন, এত ছোট ছেলেকে সাক্ষাৎ মৃত্যু, যন্ত্রনাদায়ক মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে রাখা অন্যায়, তাতে শিশুমানসে ধাক্কা লাগে, আখেরে ক্ষতি; কেমন মা বাপ তোমরা? কি জানি, তেমন ধাক্কা বোধহয় লাগে নি, নয়তো শিশু মনস্তাত্ত্বিকরা ঘন্টা জানে!

ভৌমিক ছিলেন পাড়ার একটা ওষুধের দোকানের কম্পাউন্ডার, আমরা বলতাম ডাক্তার ভৌমিক, নাকের নিচে আদরে ছাঁটা প্রজাপতি গোঁফ, চেহারায় কোথাও যেন জহর রায়ের আদল, একেকটা অ্যাঙ্গলে দ্য গ্রেট ডিক্টেটর৷ তিনি ওই লাফানে মধুমেহ পর্যায়ে রোজ দাদুর প্রস্রাবের চিনি মাপতেন৷ তাঁর কাছে দেখে দেখে শিখেছিলাম দুরূহ টাইট্রেশনের খুঁটিনাটি আর রং দেখে চিনির মাপ ঠিক করা৷ দুদিনেই হাত পাকা হয়ে গেল; ভৌমিক ডাক্তারকে আর রোজ কষ্ট করে আসতে হত না — মাঝে মাঝে আমার নির্ণয় অডিট করতেন শুধু৷ সংকট যখন ঘনিয়ে আসছে, মা আর নানার পক্ষে সামলানো মুশকিল, তখন জ্যেঠি আর বুয়ার তলব পড়ল; অনতিবিলম্বে বাপ জ্যেঠারও৷

দাদু যখন সুস্থ ছিলেন, কলকাতা এলেই আমাকে বিকেলের মরা রোদে লেকে হাঁটতে নিয়ে যেতেন তিনি৷ হাঁটা তো নয়, চলমান আউটডোর ক্লিনিক! দু পা যেতে না যেতেই কোন না কোনও পরিচিত লোক গতিরোধ করত তাঁর৷ চেনা লোকের সংখ্যাও কি কম! কেউ ভিস্তিওয়ালা, কেউ রিকশা টানে, কেউ পাশে মুখুজ্যেবাড়ির বাসন মাজা ঝি, কেউ ভদ্রলোক — দাদুর ভাষায়, “দ্যাশ  ভাগের  পর  অবোস্তা  পড়ি গেছে৷”  সবাই তাঁর বিনি পয়সার রুগি৷ দাদু তাঁদের কুশল প্রশ্ন করতেন, হালহকিকতের কথা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, নিপাট গল্প করতেন কারু কারু সঙ্গে৷ ফেরার সময় সিধে রাস্তায় নয়, এ গলি সে গলি দিয়ে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা অথবা জানলার অন্তরালে অপেক্ষারত তাঁর কম বয়সি, মাঝ বয়সি, শেষ বয়সি চেনা জানাদের সঙ্গে দুটো কথা বলার জন্য — তাঁদের বেশির ভাগই মহিলা!

দাদু তাঁর অননুকরণীয় খুলনাই দখনে ভাষা ও ভঙ্গিতে ইলিয়াড অডিসির গল্প বলতেন আমায়, আরব্য উপন্যাসের গল্প, বুদ্ধের ভিষক জীবকের গল্প, চরক সুশ্রুতের দ্রব্যগুণের কথা, তাঁর চিকিৎসক জীবনের দু একটা অভিজ্ঞতার কাহিনি (“মহেশপুরে সেবার এক পাগল ভর করিছিল আমার ঘাড়ে; রোগ নাই বললি মানে না, ওষুদ দিতি হবে; শিশিতে দাগ কাটি কাটি দিতাম তারে খড়ি গোলা জল; মাস ঘুরতি পেত না, আবার আসতো; শেষ মেষ…”)৷ বৈদ্যকুলে জন্ম তবু একবার বলেছিলেন, “বড় হয়ে ডাক্তার হোয়োনি; আমাদের বংশে কেউ চাইতে শেখে নাই — মহাশয় সব, মুখচোরা — মহাশয় হলিই মহৎ বিষয় আশয় হয় না!”

জ্যেঠা জ্যেঠির সঙ্গে দাদাও এসেছিল, তাই আমার পক্ষে দাদুর অন্তিম যন্ত্রণা চাক্ষুষ করা, সহ্য করা সম্ভব হয়েছিল৷ শেষ দিকে নানা প্রশ্ন করতেন, “কিছু খেতে সাধ যায়?” দাদু গোঙাতে গোঙাতে বলতেন, “ব্র্যান্ডি দাও, নইলে বিষ!” মৃত্যুতে সেই অসহ যন্ত্রণার থেকে রেহাই পেয়েছিলেন দাদু, আমরা সকলেই রেহাই পেয়েছিলাম৷…

শ্রাদ্ধাদি চুকে বুকে যাওয়ার পর একদিন বাবা আমাদের তিন ভাই বোনের মন মেজাজ ভালো করার জন্য টেন কম্যান্ডমেন্টস দেখাতে নিয়ে গেলেন, বোধহয় লাইট হাউসে৷ সেসিল বি.ডি’মিলের সেই বহুতারকাখচিত, বহুব্যয়ী ছবিতে ইউল ব্রাইনর সেজেছিলেন মুণ্ডিতমস্তক দ্বিতীয় রামেসিস৷ আমাদের সামনের পেছনের কয়েকটা পংক্তির তাবৎ লোকজন, সিনেমা দেখবে কি, ঘুরে ঘুরে বাবাকে দেখছিল, অবিশ্যি শ্রাদ্ধান্তের মুণ্ডন বাবার গভীর ইন্দ্রলুপ্তিতে খুব একটা দাগ কাটতে পারেনি!

…একঘোড়ার শহরে, বারো কোয়ার্টারের চার দেয়ালের মধ্যে আমি তিল তিল করে বড় হচ্ছিলাম৷ যে শহরটায় অতঃপর আমাকে অনেকগুলো দশক কাটাতে হবে, তার স্বপক্ষে অনেক ভালো ভালো লাগসই যুক্তি ছিল, কুপমন্ডুক হয়ে বেঁচে থাকা যদি দূষনীয় না হয়৷ তবু শোক আর বঞ্চনার একটা ধোঁয়াশা তখন কাটতে চাইছিল না কিছুতেই; বারো কোয়ার্টার ছেড়ে নতুন এস্টেটে যাওয়া সেই ধোঁয়াশারই আরেকটা উপাদান৷ শৈশব আর বাল্যের মধ্যে যে সময়, কৈশোর আর যৌবনের মধ্যেও, তখন নাকি বাড়ন্ত হাড়ের টানে গ্রোথ প্যাং হয়, বয়ঃসন্ধির অব্যক্ত যন্ত্রণা৷ তার অনুরণন মনের ভেতরেও নীরবে বাজে৷ সেই যন্ত্রণার তখন সবে শুরু, শেষ হতে অনেক পথ বাকি৷

দাদুর অসুখ এবং তাঁর মৃত্যুর খুঁটিনাটি আমার মনে আছে সব: তাঁর প্রাক্তন সহপাঠী, চুনিলাল গাঙ্গুলি আর বিধান রায়, পর পর দুদিন দেখতে এসেছিলেন দাদুকে; একেবারে শেষদিকে বুয়া-তাতু জ্ঞান মজুমদারকে ডেকেছিলেন৷ বিধান রায় নানাকে একান্তে বলেছিলেন, “শচি নিদান হাঁকা ঘরের ছেলে, ওর ডায়াগনসিসের নড়চড় হয়না৷”

দাদুকে ভালবাসতাম খুব, তবু সেই জোনাকিদের হারানোর শোকের মত তাঁর মৃত্যু দুঃসহ হয়ে বাজেনি; হয়ত দীর্ঘ প্রস্তুতির জন্য, হয়ত বয়সটা একটু বেড়েছিল বলে৷

ক্রমশ

Other posts in <aniruddhasen.wordpress.com> and <apsendotcom.wordpress.com>

Advertisements

পদক্ষেপ

Information

One response

2 01 2014
Visits to my three Blog Sites: Distribution by titles till yearend 2013 | aniruddhasen

[…] সেই জোনাকিরা (৭–৯) ৷৷ অনিরুদ্ধ সেন […]

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s




%d bloggers like this: