সেই জোনাকিরা (১০–১২) ৷৷ অনিরুদ্ধ সেন

3 05 2013

There are 19 sections of these memoirs, divided into 6 posts, this being the fourth.

১০ হাট বসেছে শুক্রবারে

বারো কোয়ার্টার এবং তার বাইরে, শা’গঞ্জ বাজার, কারখানা, স্পোর্টস গ্রাউন্ড পেরিয়ে স্টাফ কোয়ার্টারে, সেই যেখানে আন্টি ডি’ক্রুজের স্কুল, কোনওখানেই বন্ধুবান্ধবের অভাব ছিলনা আমার৷ গুচ্ছের তুতো ভাইবোন ছিল দুনিয়া জুড়ে, মায় খামারপাড়াতেও দেবুদা আর শঙ্কু — তাদের ঠাকুমাকে আমরা ছোটোমা বলতাম, বাবার খুড়িমা৷ দেবুদাদের বাবাকে আমি দেখেছি বলে মনে পড়ে না৷ ছোটোমার অন্য দুই ছেলে নিলুজ্যেঠা (সত্যেন সেন, পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য) আর লুকুকাকা (লোকেন সেন, শা’গঞ্জেই কর্মরত)৷ লুকুকাকার সঙ্গে খামারপাড়াতেই থাকতেন ছোটমা৷ রত্নগর্ভা তো বটেই, অসাধারণ রান্নার হাত ছিল, চৌষট্টি ব্যঞ্জন নিরামিষে নানার চেয়েও ভালো; আর আমসত্ত আচার মোয়া নাড়ুতে সিদ্ধহস্ত; ঘরেই তৈরি করতেন যাবতীয় পাঁপড়৷ বিজয়ার পর পদ্মচিনির চাক দিতেন অন্যান্য স্বহস্ত রচিত লোভন খাবারের সঙ্গে: পদ্মের চাকাপানা ভেতরটা, পাপড়ির আড়ালে যেটা থাকে, সেটা সন্তর্পনে বের করে হালকা চিনির রসে আসাতে হয়, তারপর শুকিয়ে নিলে পদ্মচিনির চাক — মুখে মিলিয়ে যায় আপন সুবাস সমেত, মিষ্টত্বের রেশও থাকেনা, শুধু স্মৃতিটুকু থেকে যায়৷

আর কলকাতায় তো তখন আত্মীয়স্বজনের ছড়াছড়ি! ঘড়ির কলকবজার মত ফি শনিবার আমরা কলকাতা যেতাম, ব্যান্ডেল স্টেশন থেকে দুপুর একটা কুড়ির ধূলায় ধূসর ইন্টার ক্লাসে৷

আমার বড়মাসি আর মেসো, সসন্তান ঢাকা উর্দু রোডের শঙ্কর ভবনে থাকতেন৷ দেশ ভাগের পর চন্দননগরে ছিলেন কিছুদিন, সেখানে তাঁদের ভাঙা হাটের পুনর্নির্মিত ঢাকা আয়ুর্বেদিক ফার্মেসির কারখানা৷ দিপুদা আর অপু দুজনে আমার ভাইক্কে ভাই, বন্ধুক্কে বন্ধু; বোনেরা ভবিষ্যতের গর্ভে৷ ওরা ছাই রঙা দশনসংস্কার চূর্ণ দিয়ে দাঁত মাজত, দেখে দেখে আমিও কিছুদিন তাই; আমি অবশ্য বলতাম, দশম সংস্করণ , হয়ত নিবিড় পুস্তকপ্রেমের মোহে! ওরা ডিম ভাজা, মানে ফ়্রায়েড এগকে বলত পোচ (বেশিরভাগ বাঙালি অবশ্য এখনও তাই বলে), খেত নুন-মরিচের বদলে হজম-সহায়ক ভাস্কর লবণ ছিটিয়ে, অতএব আমিও৷ ওদের চন্দননগরের বাড়িটা আবছা মনে আছে, তবে কলকাতায় পাকা আস্তানা ছিল শঙ্কর ভবনের বদলে পাওয়া, লেক মার্কেটের উল্টো দিকে ঠাকুরবাড়ি রোডের একটা বাড়ি, টিপু সুলতানের অনেক কলকাতাস্থ বংশধরদের কারু আবাস ছিল আগের জন্মে, দিপুদা অন্তত তাই দাবি করত, দৃশ্যমান কোনও সুলতানি আভাস ছাড়াই৷ সেখানে ফাউ হিসেবে পেয়েছিলাম অপুদের জ্যেঠতুতো ভাই, আশিসকে৷ কেউ যদি জিজ্ঞেস করত আমরা ক ভাইবোন, দুহাত দুপা মিলিয়ে কুড়িটা আঙ্গুলেও কুলোত না; জ্যেঠতুতো খুড়ততো মাসতুতো পিসতুতো মামাতো আর পরস্মৈপদী সবাইকে জুড়তে হবে তো!

শা’গঞ্জে বসেই বেশ কিছু নাগরিক আকর্ষণ উপভোগ করতাম আমরা৷

বুধবার বুধবার ব্ল্যাক জাপান করা তোরঙ্গ মাথায় কেকম্যান আসতো বিকেল চারটে নাগাদ৷ যখনই আসুক, তারহীন টরেটক্কায় পাড়ার শিশু মহলে খবর পৌঁছে যেত লহমায়; তাদের আরক্তমুখ মাতৃকুল লজ্জা রাখার জায়গা পেতেন না৷ সরভাজা সরপুরিয়াওয়ালা, নিয়ম করে নয়, যখন ইচ্ছে তখনই আসতো৷ শীতের পরিযায়ী পাখিদের সঙ্গে আসতো খেজুর গুড়ের নাগরি পাটালি আর মোয়া নিয়ে জয়নগরওয়ালা৷

ওই শীতেই ব্যাঞ্জো আর একর্ডিয়ন নিয়ে কলকাতার বো ব্যারাক থেকে আসতো ফিরঙ্গ গায়ক, সচরাচর দুজন, শুক্র শনি রবি বাদ দিয়ে হপ্তায় যে কোনও এক দিন সন্ধ্যায়, ফ্র্যাংক সিনাট্রা আর আর্থা কিটের গুড় মাখানো গান গুলো গাইতে৷ ক্যারল গান আমি তাদের মুখেই প্রথম শুনি … “টিল রিঙিং সিঙিং অন ইটস ওয়ে,/  দ্য ওয়র্ল্ড রিভ়লভ়ড ফ়্রম নাইট টু ডে,/ আ ভ়য়স, আ চাইম, আ চান্ট সাবলাইম/ অভ় পীস অন আর্থ়, গুড উইল টু মেন …৷” ছোটদের জন্যেও গাইত তারা দুএকটা গান৷ একটা গানের কথা আমার স্মৃতিতে গেঁথে গেছে: “শি’ল বি কামিং রাউন্ড দ্য মাউন্টেনস, হোয়েন শি কামস, সিঙিং আই আই য়িপ্পি য়িপ্পি আই৷” এখানে বলে রাখা ভালো, গানটার লিরিক নিয়ে আমার একটা ধন্দ আছে; আমার স্মৃতিতে “শি’ল বি ওয়্যারিং সিল্ক পাজামাস, হোয়েন শি কামস” একই গানের অঙ্গ, কিন্তু রসিক জন বলছেন সেটা বিশ্ব যুদ্ধের সময়কার অন্য একটা বড়দের  অর্থবহ গানের কলি, হয়ত বাবা তাঁর মার্কিন সহবৈমানিকদের কাছ থেকে শিখে নিজের মনেই গাইতেন — আমার স্মৃতিতে তার অনধিকার প্রবেশ হয়ত সেই সূত্রে৷

বাংলা গান — দাশু রায়ের পাঁচালি কিংবা রামপ্রসাদী — গাইতে আসতো হুগলি ঘাটের অশীতিপর নন্দ ধীবর৷ জাত গাইয়ে, দানাদার বলিষ্ঠ গলা, যদিও গায়কিটা গ্রাম্য ধাঁচের৷ তার একটা গানের এক কলি আজও মনে আছে: “শুনেছি লোকে শেখে, লোককে দেখে,/হাবা লোকে ঠেকে শেখে” — কার বাঁধা গান কে জানে! মাকে বলেছিল, “আমরা জেলেকৈবত্ত বটি কিন্তু ভালো ঘর, আমার বাপ ছেল ম্যাকলয়ড ঠিকেদারের ফদ্দোনবিশ৷” ফার্সি নবিশ  ডেজ়িগনেশনটার মানে বুঝেছি পরে৷ অনেক বছর পর একটা সিনেমায় মরিস শেভ়ালিয়রের গান শুনে নন্দ জেলের কথা মনে পড়েছিল — নিশ্চয়ই মিল পেয়েছিলাম কোথাও!

শুক্কুরবার বুকম্যান আসতো, তার ঝোলায় কাগজ মলাটের রগরগে হত্যা রহস্য, আন্টিদের জন্য মিলস অ্যান্ড বুন জাতীয় দ্বিপ্রাহরিক রোম্যান্স, কাকিমা মাসিমাদের জন্য বাংলা উপন্যাস, গুচ্ছের ম্যাগাজিন আর প্যাটার্ন বই, দিস্তা দিস্তা কমিক: যথা ডেল, লুনি টিউনস, সুপারম্যান আর ক্লাসিকস আখ্যার ডক্টর জেকিল এন্ড মিস্টার হাইড, টেল অভ় টু সিটিজ় জাতীয় গল্প৷ মিকি মাউজ় বা ডনাল্ড ডাকের ডিজ়নি কমিক তার কাছে দেখিনি (সে সব পাওয়া যেত হাওড়ার হুইলারে কিংবা নিউ এম্পায়ারের উল্টোদিকের দোকানে) তবে সুপার ডাক বলে একটা অ-ডিজ়নীয় সিরিজ ভালোই লাগত পড়তে৷

কোম্পানির অডিটোরিয়ামটা, নির্ভেজাল সিনেমা হলের রূপ ধারণ করার আগে, যথার্থই বহুমুখী ছিল৷ সকালে বাংলা স্কুল চতুর্থ শ্রেণী অবধি, যদ্দিন না আলাদা স্কুল বাড়ি তৈরি হয়৷ হপ্তায় পাঁচ দিন, বিকেল চারটে থেকে রাত নটা পর্যন্ত সেটা অনেকগুলো তাসের, কয়েকটা ক্যারমের আর গুলতানির টেবিল এবং একটা টেবল টেনিস বোর্ড সম্বলিত ক্লাব ঘর, চা চানাচুর সিগারেট আসতো মুনসির দোকান থেকে; তত্ত্বাবধানে ক্লাব চাটুজ্জে, তাঁর পিতৃদত্ত নামটা তখনই অনুদ্ধারণীয়৷ একটু দুরে কংক্রিটের টেনিস কোর্ট, বল সংরক্ষণের জন্য খেলার সময়টুকু লাইনিঙের পর্দা দিয়ে ঢাকা৷ কারখানায় ব্যবহৃত মোটা সুতির তাগড়া লাইনিং অল্প ছিঁড়ে গেলে বাতিল করা হত; তাপ্পি মেরে নিলেই খাসা বল আটকানোর পর্দা৷ শীতকালে ক্লাবের পেছনে  ব্যাডমিন্টন কোর্ট কাটা হত৷ ক্লাবের একপাশে একটা রেস্টলিং পিট —  আসলে  ধুলো করা গঙ্গা মাটি দিয়ে বোঝাই একটা আয়তাকার গর্ত, সিজ়ন টাইমে ঈষৎ তৈলাক্ত, তার চেয়েও বেশি ঘর্মাক্ত, ভর বর্ষায় সকর্দম৷ যাদের আমরা হিন্দুস্থানী বলতাম, সেই হিন্দিভাষীরা রোজ ভোরে সেখানে ধুপ ধাপ করে পরস্পরকে আসমান দেখাত৷ শুক্কুর শনি দুই এবং তিন শোয়ের সিনেমা; শুক্কুরের রাত আটটার শোতে বাছাই করা ইংরেজি ছবি, বাছাই করতেন স্বয়ং পিতৃদেব৷ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রগুলো — বাইসিক্ল থীভ়স, সিটি লাইটস, হাউ গ্রীন ওয়জ় মাই ভ়়্যালি — সেই হলে দেখা৷ ওয়েস্টার্ন বলে পরিচিত ব্যাং ব্যাং (মার্কিন ভাষায়, অবশ্যই সংস্কৃতে ভেক ভেক নয়) ছবি, যা দেখেছি, সব সেখানেই৷ সিনেমার দিন অবস্থা বুঝে ছোলা বাদাম ওয়ালারা জমায়েত হত, বাদাম ভাঙার মড়মড় (বানান অভ্রান্ত!) ধ্বনিতে গোটা হল শব্দায়মান, পায়ের তলায় — শুকনো পাতা নয় — খোলা ও ঠোঙা মথনের মর্মর ধ্বনি (এটাও নির্ভুল!)৷ মশলামুড়ি-ওয়ালাও আসতো; তবে, দক্ষিণের ভারত মহাসাগরটুকু বাদ দিয়ে আসমুদ্রহিমাচল যারা ভিন্ন ভিন্ন নামে দাপটে রাজত্ব করে, সেই ফুচকা পানিপুরি গোলগাপ্পা ঘুপচুপওয়ালাদের সেখানে দেখেছি বলে মনে পড়ে না৷ তারা বসত শহরের স্কুলগুলোর কাছে, হুগলি কিংবা চুঁচড়োয়, বড় সিনেমা হল রূপালি আর কৈরির পাশের গলিতে — কলকাতার পেশাদারি ফুচকার কাছে স্বাদে বা পরিবেশনে নগন্য!

ওই অডিটোরিয়ামেই ডিসেম্বরের একটা দিন বসতো মহিলা সমিতির বিকিকিনি মেলা; সেখানে আমরা মহানন্দে লাকি ডিপ (এলেবেলেদের জন্য), হুপলা (বেতের রিং ছুঁড়ে সাজানো প্রাইজ়ে গলানো), কোকোনাট শাই (কেঠো বল ছুঁড়ে বাঁশের মাথায় স্থাপিত নারকেল ফেলা), লাকি স্কোয়ারের জুয়ার খেলা খেলতাম, মা মাসিদের হাতে তৈরি খাবার এবং নিষিদ্ধ বাজারি খাদ্যাখাদ্য সকল কিনে খেতাম৷

হাসি আর প্রতিমার বাবা মারা যান ক্ষয়রোগে; হাসির মা — তাঁকে আমার বেশ মনে আছে — সেলাই ফোঁড়াই করে দিন গুজরান করতেন৷ তাঁর সাহায্যের জন্য বিকিকিনি মেলা শুরু হয়, আসলে ছিল বিলিতি ভ়িকারেজ ফ়েয়ারের নকলে সেল অভ় ওয়ার্কস, সঙ্গে যার যা কিছু বাতিল বা বাড়তি সামগ্রী (হোয়াইট এলিফ়্যান্ট) বাড়িতে জঞ্জাল হয়ে আছে — যথা পেপারব্যাক নভেল, উপহারে পাওয়া ফুলদানি, অসহ্য চড়া রঙের শাড়ি, মলিন হয়ে যাওয়া ফ্রেম সুদ্ধ ছবি — তাদের বিদায়্করণ৷ জুয়ার রোজগারটা উপরি৷ মা ছিলেন একজন পালের গোদা; উমাদি, শান্তিনিকেতনের উমা দত্ত (২০১৩-র ৪ঠা নভেম্বর নিরুনব্বুই পার করেও তাঁর মাথাটা এখনও তারিফ করার মত পরিস্কার, ক্বচিৎ কদাচিৎ ফ়োন করলেই চিনতে পারেন, আলাপচারী চালান যেন কালকেই আমাদের বাক্যালাপ শেষ হয়েছিল), বিকিকিনি নামটা বেছেছিলেন; আর সে যজ্ঞের প্রথম অগ্নিহোত্রী ছিলেন মিসেস জ্যাকসন৷ ক্রমে সেই বিকিকিনি বৃহত্তর স্বার্থে বাৎসরিক মেলায় উন্নীত হয় এবং ক্রমে ক্রমে চরিত্র হারায়৷

স্কুল বলুন, ক্লাব হাউস বলুন, সিনেমা বলুন, গুদাম ঘরের মত ওই ইমারৎটিতে অনেক ইতিহাস তৈরি হয়েছে একদা৷

সামনেই ছিল প্রায় আড়াইটে প্রমাণ সাইজ ফুটবল মাঠের মত সাবেক স্পোর্টস এবং প্যারেড গ্রাউন্ড৷ সেখানে সারা বছর দেদার ফুটবল, হকি আর ক্রিকেট খেলা হত৷ মাঝে মাঝে ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের মত বড় দল প্রদর্শনী খেলা খেলে যেত; শৈলেন মান্না বদরু ব্যানার্জি থঙ্গরাজ সালে কিট্টু ইত্যাদি নাম একেকটা সেরকম খেলার পরে বহু দিন ধরে লোকের মুখে ফিরত অঙ্গভঙ্গি সহকারে৷ বছরে একদিন কোম্পানির বাৎসরিক স্পোর্টস উৎসব হত ঘটা করে — তার নেপথ্য খাটনির সিংহভাগ বাবার ঘাড়ে৷ ক্লাব-ইভ়েন্ট ওপেন-ইভ়েন্ট মিলিয়ে সারা দিনমানের স্পোর্টস;  পুরস্কার  বিতরণের আগে শেষ  দুটো ইভ়েন্ট ছিল গো-অ্যাজ়-ইউ-লাইক এবং কোম্পানির দমকল ও রক্ষী বাহিনীর দড়ি-টানাটানির লড়াই৷ দমকলের লোকেরা নাকি বসে থেকে থেকে খুঁটি হওয়ার যুগ্যি মোটা হত আর খাস সৈন্যবাহিনী থেকে আসা দরোয়ানরা আদতে পালোয়ান৷ বিতরণের নিয়মটা কি ছিল সঠিক জানিনা, তবে যাদের কাছেই স্পোর্টসের প্রোগ্র্যাম বই থাকত, তার পেছনে ছাপা একটা নম্বরি কুপনের বদলে সমবেত দর্শকবৃন্দকে একটা করে এলাহি খাবারের বাক্স দেয়া হত, আর তা ছাড়াও একটা করে বাছাই কমলালেবু; খোসা ছাড়ানো যায়না এমন পঞ্জাবি কিনু নয়, পাতিলেবুর মত দার্জিলিংও নয়, বোধহয় বিশুদ্ধ কর্নাটদেশীয় নাগরঙ্গ!

বাবার আমলেই বেঙ্গল অলিম্পিক এসোসিয়েশন তাকে প্রথম শ্রেণীর স্পোর্টসের মর্যাদা দেয়৷ তারপর কারখানার বাড়তি কাজের দরকারে কারাপ্রাচীরের করাল গর্ভে ঢুকে যায় সেই মাঠ, সেই প্রথম শ্রেণীর বনেদিয়ানা৷ ঠিক যেমন করে বন কেটে মানুষের বসত দরকার মত বাড়ে, যেমন করে খান্ডব বন জ্বালিয়ে অযুত মৃগপক্ষিকুলের বসত, অরণ্যচারী শবরদের জীবনযাপন নষ্ট করে সভ্যতার বিকাশ হয়৷

###

১১ অনুসন্ধান

এক অনুপম সুন্দরীকে তিনি দূর থেকে কালবৈশাখীর বিদ্যুল্লতার মত এক ঝলক দেখেছিলেন; তাকে আরেকটিবার দেখার জন্য সব কিছু — এমনকি সমরকন্দ বুখারার তামাম ঐশ্বর্যও — বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন সেই রহস্যের কবি হাফ়েজ়়৷ অত অনুভব, অত রহস্য, অত ঐশ্বর্য, কাঙ্গাল আমি পাব কোথায়! তবু সেই শ্রাবণের অনন্যসাধারণ জোনাকিদের আরেকটিবার দেখার জন্য আমি আমার সর্বস্ব দিয়ে দিতে পারতাম, নিশ্চিত৷ আমার বুকের ভেতর ধিকিধিকি করে তুষের মালসার মত যে আগুন জ্বলছিল তাদের দেখার পর, তাতে কালেকালে অনেক ইন্ধন যুগিয়েছে আমার পারিপার্শ্বিক৷ সেই দেওঘরে একদিন হাড় কাঁপা শীতে হিরালাল তুষের মালসা দিয়ে গিয়েছিল ঘরে৷ যতক্ষণ জেগেছিলাম, দেখেছি, হয় মা, নয়তো বাবা, তাতে আরো তুষ, আরো তুষ, শেষকালে কয়েকদিনের জমানো খবরের কাগজ গুঁজে দিয়ে জিইয়ে রাখতে চাইছিলেন তার ওম, কিন্তু কটু ধোঁয়ায় ঘর ভরে গেল বলে সে চেষ্টা ছেড়ে দিলেন অবশেষে৷

অনেক দিন সেই মৃগতৃষ্ণা আমার পিছু ছাড়েনি, বহু বছর … কাঁচা সুপুরি যেমন চর্বণে চর্বণে নির্মূল হয়ে যাওয়ার পরও তার কষা স্বাদ আর হালকা মাথা ঝিমঝিম বহুক্ষণ থেকে যায়, শেষের দিকে ভালো লাগে না আর, মনে হয়, আপদ! কোথাও হয়ত তার একটুখানি রেশ থেকে গেছে দীর্ঘ কাল৷ তার পর অনেক জোনাকি দেখেছি সারা জীবন, তবু তেমনটি দেখলাম না আর!

বাবার মৃত্যুর তিন বছর পর কেওটা-লাটবাগানে বাবারই কেনা জমিতে একটা বাড়ি তুলেছিলেন মা৷ সেখান থেকে কোম্পানির কারখানা সিধে পথে পৌনে মাইল, গাড়ি নিলে ঘুরপথে যেতে হয় বলে মাইল আড়াই৷ কি সাইকেলে, কি গাড়িতে, সন্ধেবেলা কোম্পানির ক্লাবে যাওয়ার সময় সর্পিল শরৎ সরণি দিয়ে ওই ঘুরপথটাই বেছে নিতাম অজান্তে৷ শরৎ সরণিই একদা ছিল শাহি সড়ক — দ্বিতীয় যুদ্ধের সময় মার্কিন সেনা সরলতর, প্রশস্ততর গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড নির্মাণ করা অবধি৷ পরে সেটা স্থানীয় রাস্তা হয়ে গেল, অপ্রশস্ত, কোথাও দুপাশে সরু ইটের সাবেক হর্ম্যশ্রেনীর মধ্যে শুঁড়ি পথ৷

আমার  পছন্দ  ছিল  কেওটা  থেকে  জি.টি. রোড পর্যন্ত বৃক্ষগুল্মময় আঁকাবাঁকা একটা ক্ষুদ্র অংশ৷ অর্ধশিক্ষিত নেতারা মিলে (যেমন তাঁদের দস্তুর) সেই সর্পিল রাস্তার নব নামায়ন করেন যে ঔপন্যাসিকের নামে, তাঁর সাতগাঁয়ের ভিটে, বা হুগলি শহরের ব্র্যাঞ্চ স্কুল যেখানে দত্তা-র তিন বন্ধু লেখাপড়া করতেন, কস্মিনকালেও সে পথের আওতায় ছিল না৷ বরং, দেবযানের বিভূতিভূষণ সে পথের বালির মোড়ে বিলীন একাংশে ছিলেন কিছুকাল, এবং প্রসন্ন গুরুমশাইয়ের পাঠশালা ছিল অনতিদূরে কোথাও, ছোট্ট অপু পড়তে যেত সেখানে৷

শরৎ সরণির যে ছিন্ন অংশটা আমার পছন্দের, তার অরুন্তুদ নিস্তব্ধতা ভেদ করত ঝিঁঝির আর মত্ত দাদুরির ডাক — উভয়েই আষাঢ় শ্রাবণে সূর্যাস্তের পর মিলনপিয়াসী৷ পির বাবার উপেক্ষিত ইটের মাজারটা পেরিয়ে চুলের কাঁটার মত যে বাঁক, সেখানে ছিল অনেকগুলো ঝাঁকড়ামাথা আশশ্যাওড়া, দেখেই বোঝা যেত অনেকদিনের, হয়ত পাবড়া ছোঁড়া ঠ্যাঙ্গাড়েদের বলি অনেক নিরীহ পথিকের শব সার সঞ্চার করেছে তাদের ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠায়৷ আধা জ্যোৎস্নার সিলুয়েটে দেখলে একটা গাছের মাথা সগ্রীব উটের মত লাগত; আমার প্রিয় গাছ ছিল সেটা, আকাশমুখী হয়ে নিশ্চিন্তে জাবর কাটা উট৷ অবশ্যই উটের গ্রীবার মত  উদ্ভট সেই জনহীন শ্যাওড়াতলার নিস্তব্ধতা৷ জায়গাটা সাদামাটা, গেরস্ত জোনাকিদের খুব পছন্দের, তারা সেখানে মহানন্দে নাচ দেখাত৷ কিন্তু তাদের সে জলুস কই? উজ্জ্বলতা বুদ্ধি গ্ল্যামার ও যৌন আবেদন? তবু একেকদিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খুঁজতাম তাদের, যদি ভুল করে দেখা দেয়!

আমার বিয়ের ক’মাস পরে বর্ষায় সেখানে একবার গাড়ি থামিয়ে উট গাছটা চেনাচ্ছিলাম আমার স্ত্রীকে৷ ভালো করে দেখানোর জন্য গাড়ি থেকে নেমে একটা ভ়্যান্টাজ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছিলাম দুজনে৷ যে আটপৌরে জোনাকির দল সেখানে ঘোঁট পাকিয়ে বেহায়াপনা করছিল, তাদের দেখেই মুগ্ধ হয়ে গেল রিনি: “দেখো কত জোনাকি ওখানে!” কি করে তাকে বোঝাই যে তারা আমার ছেলেবেলার সেই জোনাকিদের বাঁ পায়ের কড়ে আঙ্গুলের নখের যুগ্যি নয়!

…একটা মিশ্র আবহাওয়ায় বড় হয়েছিলাম আমি: মিশ্র ভাষা ও সংস্কৃতি; মিশ্র কাল: যুদ্ধোত্তর শান্তিকামী দুনিয়া, মন্বন্তরের পর আপাত স্থিতাবস্থা, স্বাধীনতার ইউফ়়োরিয়া, দেশভাগের হাহারব; মিশ্র স্থানভেদ: শা’গঞ্জ, শান্তিনিকেতন, কলকাতা৷ কখনও ধানখেতের আলিপথ ধরে হেঁটেছি, কখনও নাগরিক ফুটপাথ়ে৷

একদিকে আমরা শনিবার শনিবার ট্রিংকাতে চা পেস্ট্রি খেতাম, সুযোগ পেলেই ম্যাগনোলিয়া বা হ্যাপি ভ্যালি আইসক্রীম, বিদেশি হ্যাম আর চীজ়, অন্যদিকে রেশনের চিনি ফুরিয়ে গেলে বাবা-মা এখো গুড়ের চা খেতেন, কালোবাজারের চিনি কিনতেন না, দৌরলার চৌখুপি চিনিও নয়৷ একদা শা’গঞ্জ দর্শনে আসা তদানীন্তন খাদ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনকেও গুড়ের চা খাইয়েছিলেন মা৷ কি করবেন, মন্ত্রী মশাইয়ের সঙ্গে অত লোকজন, তাদেরও তো দিতে হবে, নাকি! রেশনের ক্বচিৎ কখনও পাওয়া অপেক্ষাকৃত ভালো চালটা আমার জন্য যথেষ্ট জমিয়ে রেখে বাবা মা খেতেন অখাদ্য চাল, শ্যামদেশ বা বর্মা থেকে পি.ডি.এস.-এর জন্য আমদানি করা গোল দানা, ভাত রাঁধার সময় বদ গন্ধ বেরুত৷

সেভাবে  বাড়তে বাড়তে  এক  দিকে  যেমন  একটা  মূল্য  ধরে  দিতে  হয়েছিল,  অন্যদিকে  দুনিয়াদারির রাস্তাগুলো সাফ হয়ে গিয়েছিল — মানুষের সঙ্গে নিষ্কারণ সংঘাত এড়াতে শিখেছি অল্প চেষ্টায়, মানিয়ে নিতে পেরেছি যে কোনো জায়গায়, রকমারি পরিস্থিতির সঙ্গে৷

বয়ঃসন্ধির অমোঘ চিহ্নগুলোও কষ্ট করে কেউ চেনায়নি  আমায়, এদেশে সে রেওয়াজই নেই, পশ্চিমে যা মধুমক্ষিকা ও বিহঙ্গের প্রিয়মিলনের নমুনা দিয়ে বোঝানো বাপ মায়ের দায়িত্ব। চোখের সামনে এত বেড়াল কুকুর, গোয়ালে গোরু, খেতিকাজের বলদ! একবার সেই ১১৬ নম্বরের লনে সাপের শঙ্খ লাগা দেখেছিলাম আমি আর টুকু৷

কেষ্ট মালির হাতে বারো নম্বরের ছোট বাগানও মরশুমে ঝলমল করত, ১১৬ নম্বরের বড় বাগান তো বটেই; বাকি সময় বেল-রজনীগন্ধা, বছরভর গোলাপ — সানন্দে শেখাত আমাকে কলমের কারসাজি৷ শান্তিনিকেতনে একবার পেছনের ধানক্ষেতে পায়েস রাঁধার মাতাল গন্ধ পেয়েছিলাম, হরিপদদা বুঝিয়েছিল, “ধানের বুকে দুধ এয়েচে যে!” স্তোকভারনম্রা যে শ্যামস্বর্ণাভ ঝিউড়িরা জীবনানন্দকে মুগ্ধ করেছিল, আমিও তাদের কাছ থেকে দেখেছি, ঈশ্বরবাগ চন্দনপুর হরিহরগঞ্জে, হাওয়ার দোলায় আপন খুশিতে লুটোপুটি খেতে৷ কোথাও একদিন দেখেছিলাম, বরিশাল না গিয়েও, শ্বেতাঙ্গ লক্ষ্মীপেঁচা মিলনরত যুগল ব্যাং ছোঁ মেরে তুলে নিল বর্ষাস্নাত সন্ধ্যায়, শ্বেতাঙ্গদের যেমন দস্তুর ছিল এদেশে একদা৷  গলিত স্থবির  ছিল না সেই দাদুরী মিথুন, দু –একটি মূহুর্তের ভিক্ষা  মেগেছিল কিনা প্যাঁচাই জানে!

গন্ধেশ্বরী ঘাটে যারা দাহ করতে আসতো তাদের শোকদুঃখধর্মগন্ধহীন বীভৎস হরিবোল আর মাতাল হুল্লোড় বারো নম্বর থেকে স্পষ্ট শোনা যেত নিশুত রাতে৷ সব মিলিয়ে ব্লেকের বা জীবনানন্দের জন্য তৈরি হয়ে গিয়েছিল মন, আমার নিজের মনেও সেই গহন ছায়া — শরতের রোদ্দুরে ঝলমল ভাগীরথীর পাশাপাশি! সেই ভাগীরথীরই মুক্তবেণী ত্রিবেণীর মেলায় বিক্রি হত কাঠখোদা বেনেবউ, মৃন্ময় পেঁচা — সেই সাদা রঙের লক্ষ্মী পেঁচা, মাটির কোলা ব্যাং, খাদ্য ও খাদক, ডোরাকাটা উজ্জ্বল বাঘ, চিরন্তনতার প্রতীকের মত৷

তবু তারা কেউ — কেষ্টমালি, হরিপদদা, ব্লেক আর জীবনানন্দ — আমার সে মোহময় জোনাকিদের ঝোপজঙ্গল গাছগাছড়া পেরিয়ে, কালোকোলো লোহার সেপাইদের এড়িয়ে, গজগামিনীর মত মিলিয়ে যেতে দেখেনি৷

###

 ১২ দক্ষিণে চাই, উত্তরে চাই

বিচারবুদ্ধি শানিয়ে ওঠার আগে মানুষছানাদের মন খুব স্পর্শকাতর থাকে; দুর্বল নয়, শুধু ছাপ তোলার গালার মত নরম৷ কোনও একটা খেলনা হারিয়ে গেলে, কাছের বন্ধু দুরে চলে গেলে, চেনা মানুষের মৃত্যুতে কিংবা চেনা পারিপার্শ্বিক থেকে সরিয়ে নিলে একটা বঞ্চনার বোধ তাদের ভর করে৷ হয়ত সে বোধ কারু সঙ্গে ভাগ করে নেয়ার মত প্রকাশ ক্ষমতাও থাকে না তাদের৷ সে সব সংকটের সময় বড়দের ভাবভঙ্গি গোলমেলে খুব৷ কখনও তারা নিজের কথারই বিরোধিতা করে, কখনও একে অন্যের সঙ্গে ঝগড়া করে; মোট কথা তারা পাকা মাথায়,  ঠান্ডা  মাথায়  ভাবতে পারে  না তখন৷ ছোটরা তখন মনের দুঃখ মনে চেপে বড়দের ছেলেমানষি দেখে আর তাদের অন্তর্নিহিত পরস্পর বিরোধিতার শিকার হয় নীরবে৷ সে অবস্থাটা সুখের নয় খুব৷ দাদু তখন তিলতিল করে মৃত্যুর দিকে কিন্তু তখনও তাঁর বোধশক্তি টনটনে; আমাকে বলেছিলেন ছোটখাটো খুঁটিনাটি সব দেখে রাখতে, সব আপাতবিরোধিতা, সবার অবুঝপনা, রোজ কত কি ঘটে যাহা তাহা  যত তুচ্ছই হোক; “মনে রাখবা, নিজির চোখে দেখা আর নিজির কানে শুনার উপর কুনও সইত্য নাই!”

ফার্স্ট আর্টস পাশ করে, অষ্টাঙ্গ আয়ুর্বেদ চর্চা না করে বেঙ্গল মেডিকাল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন দাদু (শচীন্দ্রনাথ), তাঁর সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন দাদা (ক্ষিতিমোহন) — তিনি সে পাঠ শেষ না করেই অন্য পথে হাঁটেন, সেই সঙ্গে অষ্টাঙ্গ আয়ুর্বেদের পূর্ণ পাঠও শেষ করেছিলেন৷ দুজনের কেউই জানতেন না, বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হবে তাঁদের মধ্যে, এক প্রজন্মের তফাতে৷ দুরারোগ্য অ্যানথ়্রাক্সে বিস্তর ভুগে দাদু কোনক্রমে প্রাণ নিয়ে বেঁচেছিলেন নানার আপ্রাণ সেবায়৷ ছোট ছোট তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে তিনি যখন যমের সঙ্গে লড়াই করছেন, নিকট কুটুমরা এক কড়াও সাহায্য করেননি, ছোঁয়াচে রুগিকে আশ্রয় দেয়া তো দূর অস্ত! সমস্ত গয়না বিক্রি করে দাদুকে তিনি নিশ্চিত মৃত্যুর দোরগোড়া থেকে ফিরিয়ে আনেন৷ এসব কথা বাবা জ্যেঠার কাছে পরে শুনেছি৷

যে দাদুকে আমার মনে আছে তিনি মিতবাক কিন্তু স্বভাবে রসময়, এবং অনেক বিষয়ে আশ্চর্য পন্ডিত৷ সেযুগেও ডাক্তারদের মধ্যে পলিম্যাথ়ের সংখ্যা হাতে গোনা; তিনি ছিলেন সেই বিরল প্রজাতির একজন৷ দাদু তখন মুরারই, নসিপুরে ইত্যাদি প্রত্যন্ত জায়গায় ডাক্তারি করেন; সেখানে তাঁর ছেলেরা কষ্ট করে, জলকাদা ভেঙে, বিস্তর হেঁটে স্কুলে যেতেন; বিকল্প ছিল হাতি — বুয়ার পক্ষে দুষ্কর সেই দুস্তর পদাতিক বৃত্তি৷ তাই আমার পিসি স্কুলে পড়েননি কখনও৷ দাদু নিজেই তাঁকে পড়াতেন, বিদ্যাদানের জন্যই পড়াতেন এবং নিজের বিদ্যাদানের ক্ষমতা ছিল বলেই, কারণ পাশ করানোর তাগিদ ছিল না কোনও৷ প্রাইভ়েটে স্কুল পাশ করে বুয়া কলেজে ভর্তি হন, পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. করেন৷ আমার এক দিদি, নমিতাদি, নানা দাদুর কাছে থেকেই কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত; তাকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পড়াতেন দাদু৷ ডাক্তারি বিদ্যের বাইরের বিদ্যা তো ছিল বটেই৷ নমিতাদি জনান্তিকে আমার কাছে আক্ষেপ করে বলত,  “মেজদামনি প্রফেসরদের ওপর এক কাঠি!”

শুনেছি, কিছু অন্যায় বাতিক ছিল তাঁর, কিছু যুগ ও সমাজোপযোগী গোঁড়ামি, কিন্তু অন্য দিকে অনেক মুক্ত মনের মানুষের চেয়ে বেশি খোলামেলা মনে হত তাঁকে৷ বুড়োকাকা যখন বিজয়া পিসিকে বিয়ে করে, পয়োগ্রাম বাড়িতে ছীছিৎকার ও শোকের আবহ তখন নানা দাদুই ছিলেন তাদের পেছনে৷ সেটা দ্বন্দ্বের যুগ, নতুনের সঙ্গে পুরনোর, হিন্দুত্বের সঙ্গে ব্রহ্মবাদিত্বের, দমনের সঙ্গে নারীমুক্তির৷ আমি তাঁর বিচারের অধিকারী নই, এত যুগ পরে বিচারের দরকারই বা কি? যে দাদুকে আমি দেখেছি, তিনি নাকের ডগায় পুরু পরকলার চশমা লাগিয়ে বারান্দার রোদে পিলগ্রিম’স প্রোগ্রেস পড়ছেন, অথবা সেই কোন সত্য যুগের বাঁধানো স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজ়িন, দুটিই বহুপঠনে জীর্ণ; নিম্নাঙ্গে মালকোঁচা মারা ধুতি, শীতকালে পরনে একটা ছোট হাতার পাশবোতাম ফতুয়া, গ্রীষ্মে খালি গায়ে মার্জিত উপবীত৷ আমি মুগ্ধ ভক্ত ছিলাম তাঁর, তাঁর অন্তিম নিজে দেখো, নিজে শোনো  উপদেশ উপেক্ষা করার কে?

তার আগেই অবশ্য এই দুনিয়ার ক্যালাইডোস্কোপে উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করেছি নিজে নিজেই৷ তাতেই কাল হল আমার৷ নজরটা তীক্ষ্ণই ছিল; অনেক গুরুজন আমার নজরদারির অভ্যেস ভালো মনে নিতেন না — অভিভাবকদের কাছে নালিশ যেত৷ তাইতে আমার নজর ছুটল মাঠেঘাটে, পথচলতি লোকজনের দিকে এবং গুরুজনদের নীরব নিরীক্ষণে৷

বারো কোয়ার্টারের ছোট মাঠের উত্তর-পশ্চিমে দুটো ঝোপের পাশে অনেকটা খালি জায়গা ছিল, আমাদের সদর থেকে তেরছা করে৷ তার একটা চৌখুপিতে একবার কেউ উৎসাহভরে ভুট্টা লাগিয়েছিল৷ লাগোয়া আরেকটা চৌখুপিতে কেষ্টকে দিয়ে বাবা লাগিয়েছিলেন সূর্যমুখী — বোস কাকা বলেছিলেন, “তার চেয়ে কি একটা কিচেন গার্ডেন ভালো হত না, এ.কে.?” বাবা নিজেই একেকদিন পোকা বাছতেন, মায়ের সেলাই বাক্সের আলিগড় কাঁচিটা নিয়ে পোকা ধরা পাতা, পুঁয়ে পাওয়া ডাল ছেঁটে দিতেন সযত্নে৷ আর পাঁচটা সূর্যমুখীর চেয়ে অনেক বড় সাইজ়ের ফুলের মেলা বসে গেল শেষকালে: প্রায় চায়ের পিরিচের মত বড়, ভ্যান গহ্-র সূর্যমুখীর মত, ব্লেকের বাঘের মত উজ্জ্বল হলুদ৷ ভুট্টার শিসেও তখন রস এসেছে — রথের মেলার আগেই তোলা দরকার৷ দেখতে দেখতে একদিন পঙ্গপালের মত একঝাঁক খাটিয়ে কিন্তু আমুদে টিয়া নেমে এলো দুটো চৌখুপিতেই, অবিশ্বাস্য পান্না রঙের, মারামারি করলনা, ঝগড়া ঝাঁটিও নয়৷ কেষ্টমালি ছাতা নিয়ে হুশ হুশ বলার আগেই সমান ভাগে আহার করে উড়ে গেল অন্যত্র৷ পরের দিনও পুনরাবৃত্তি৷ বুঝলাম, তারা মানুষের মত আমার আমার  রোগে ভোগে না৷

খোকাদার কাছে কাজ করত চিত্তদা, মা বলতেন, “চটপটে, চালাক চতুর, আমাদের হরির মত নয়৷” আমার একটা ট্রাইসাইকেল জুটেছিল, বড়দের সাইকেলের মত চেন-স্প্রকেটওয়ালা — বিদায়ী কোনও সাহেবের থেকে কেনা৷ সেটা নতুন চালাতে শিখছি যখন, চিত্তদা দেখি অফ টাইমে মাঞ্জা দিয়ে বেরুবার জন্য প্রস্তুত৷ আমাকে শুধালো, “বাজারের দিকে যাচ্ছি, তুমি যাবে?” অমনি আমি দু প্যাডেলে খাড়া! আমরা খোশমেজাজে গল্প করতে করতে বাজার গেলাম, চিত্তদা সিগারেট লজেন্স আর লিলি বিশকুট খাওয়ালো৷ বেলা গড়িয়ে ফিরছি যখন, দেখি বাবা মা খোকাদা সহ দুনিয়ার লোক গেটের সামনে; পুলিসে খবর দেয়নি কেউ তখনও, সার্চ পার্টির প্ল্যান ছকছে সবে৷ সেটা বোধহয় আমার প্রথম একলা অ্যাডভেঞ্চর, একলা বলতে বাবা মা বা অন্য গুরুজন অথবা তাঁদের অনুমতি ছাড়া৷ আত্মপ্রসাদটা মাঠে মারা গেল যখন বুঝলাম চিত্তদার কাজ গিয়েছে আমার জন্য, আমাকে একটু সাবালক হতে সাহায্য করার জন্য৷ বুঝলাম, বড়রা কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, কতটা বেমরমী!

###

ক্রমশ

Other posts in <aniruddhasen.wordpress.com> and <apsendotcom.wordpress.com>

Advertisements

পদক্ষেপ

Information

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s




%d bloggers like this: