সেই জোনাকিরা (১৩–১৫) ৷৷ অনিরুদ্ধ সেন

3 05 2013

There are 19 sections of these memoirs, divided into 6 posts, this being the fifth.

১৩ বন কেটে বসত

আমার স্কুল জীবন শুরু হয়েছিল উনিশ শো একান্নর গোড়ায়; বারো নম্বরের পেছবাগান তখন নানান মরশুমি ফুলে ঝলমল করছে৷ চার বছর পুরে সবে দুমাস হয়ছে৷ চেনাদের মধ্যে এ পাড়ার ননতু, হেদর, ক্যারল, হাসি৷ তা ছাড়া বেপাড়ার সুজিত, বাপি আর আর ইলাকে আগেই চিনতাম৷ অন্যেরা সব আনকোরা৷ যে রাস্তায় আমার ট্রাইসাইকেল অ্যাডভেঞ্চর, স্কুলগামী   রিকশা  সে  পথ দিয়ে আরো  অনেক দূর,  বাজারের  পাশে  বাগদিপাড়া  রোড  হয়ে, কারখানার পাচিল ডানহাতে রেখে চলছি তো চলছিই…হঠাৎ একটা বাঁক নিলে কারখানার প্রধান ফাটক, তারপর ডাইনে ঘুরে ময়দান আর ক্লাব হাউস, তারও পর স্কুল৷ কম রাস্তা? একেক পিঠে প্রায় সিকি ঘন্টা! কারখানার ভেতর দিয়ে গেলে সময় বাঁচে অনেক কিন্তু বিধি, অর্থাৎ আমার পিতৃদেব, বাম; “আমার ছেলেকে আনডিউ অ্যাডভ়ান্টেজ নিতে দেবনা!”

এলোপাথারি ম্যাকিউলার ডিজেনারেশনের মত এখন আমার স্মৃতিপটের অনেকটাই পোকায় খাওয়া, নাম ভুলে যাই, মুখের সঙ্গে নাম মেলাতে পারিনা, আগে পরে পারম্পর্যে বিস্তর গোলমাল৷ তবু যেন মনে হচ্ছে, হেদর আর ক্যারল ছিল আমার প্রথম রিকশা সহযাত্রী, পরে তাদের বদলে ননতু৷ আনটি ডি’ক্রুজের স্বামী ছিলেন, পরে জেনেছি, কোম্পানির ওয়ার্ক স্টাডি বিশেষজ্ঞ, থাকতেন ক্লাব হাউস পেরিয়ে বাঁহাতি রাস্তায়, যার দুপাশে সার সার স্টাফ় কোয়ার্টার নতুন ধোবিখানা অবধি (তখনও তৈরি হয়নি)৷ পোর্টুগীজ় গোয়ার এই তরুণ দম্পতি ছিলেন অতিশয় ভদ্রলোক; তাঁদের প্রথম সন্তান, ব্রেন্ডা, তখন সবে হয়েছে, তাকে প্র্যামে শুইয়ে স্কুল চালাতেন আন্টি, গোড়ার দিকে তাঁকে সাহায্য করতেন তাঁর মা — তাঁকে আমরা টীচর বলতাম৷ বি ব্রেন্ডার চুষিকাঠি মুখে দিয়েছিল একদিন, ননতু অমনি নালিশ করলো, “আন্টি! আন্টি! বি ব্রেন্ডা মিল্ক!” বুঝতে অসুবিধে হয়নি কারু৷

যখন এই অবাক দুনিয়ার সিংদরোজা আমার চোখের সামনে ধীরে ধীরে খুলছে, ছুটি পড়লেই বরং কেঁদে কেটে অস্থির, ঠিক তখনই ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ার মত একটা বাজে অসুখ ধরলো আমার! তার একটাই সুফল — সপ্তাহাধিক কাল, হয়তো দ্বিসপ্তাহাধিক, মায়ের সঙ্গে শোওয়া, সেখানে তাঁর স্নানশেষের উষসী পাউডারের সুবাস, হেজ়েল স্নো, ওটিন ক্রীম, অগুরু সেন্ট৷ বাইরে যেতে গেলে অবশ্য বিলিতি কমপ্যাক্ট আর সন্তর্পণে খরচ করা শ্যানেল ফ়াইভ়৷ তোয়ালে জড়িয়ে মা আমার মাথায় আইস ব্যাগ দিচ্ছিলেন একদিন, পাশে দাঁড়িয়ে ঊষা কাকিমা, দরজার কাছে উৎকন্ঠিত বাবা — এই দৃশ্যটা মনে আছে আমার৷

বছর তিনেক পড়েছি কি পড়িনি, নতুন ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ভাব হয়েছে: রতন সেনগুপ্ত, নাম করা ভালো ছেলে; আমি পড়া না পারলে মাকে বলতাম, “আমিও পড়া পারিনি, রতনও পড়া পারেনি!” কলেজ শেষ করেই সেই যে গেল, অ্যামেরিকাতেই পাকাপাকি থাকে সে; অধুনা ই-মেলেই যেটুকু যোগাযোগ৷ ইলা চোংকার; তিন বোন তারা — শীলা, ইলা আর নীলা৷ দিদি শীলা পরে একবার ইভ়জ়’ উইকলির ভারত সুন্দরী হয়েছিল৷ গৌতম, ফোটোগ্র্যাফ়ার অমর সেনের ছেলে, সে বোধহয় কিছুকাল থাকত চোংকারদের সঙ্গে; কলকাতার সাকিন ছিল লেক মার্কেটের কাছে৷ আর্কিটেক্ট ইয়ং সাহেবের ছেলে, জনি, যে দেশে ফিরে গিয়ে পরে ইশকুল মাস্টার হয়েছিল; ছুটিতে শা’গঞ্জে এসেছিল একবার, দেখা হয়নি আমার সঙ্গে৷ কলিন বাটারউইক — চোখে মুখে কথা বলত, চ্যাটারবক্স৷ ক্ষণস্থায়ী সুভাষ কুলকার্নি — লিখতে বসে হঠাৎ মনে পড়ল নামটা৷ সে কে, কোত্থেকে এলো, কোথায় গেল, কিচ্ছুটি মনে নেই, শুধু মনে আছে ভালো লেগেছিল তাকে৷ আরো কত কে!

এমন  সময়  বিনা  মেঘে কামলায়  ধরল আমাকে,  বিলিরুবিন  বলে কি একটা যেন নাকি তুঙ্গে, চোখ-চামড়া-নোখ সেই টিয়াপসন্দ সূর্যমুখীর মত, কেঁদো বাঘের মত হলুদ — শার্দুল শার্দুল উজ্জ্বল জ্বলছে!

ইত্যবসরে বড়রা তাঁদের অভিরুচি মত নতুন এস্টেটে স্থানান্তরণের বন্দোবস্ত করছিলেন, আলোচনা শুনেছিলাম আগেই৷ আমার স্কুলে যাবার যে পথ কারখানার প্রধান ফাটক থেকে ডাইনে বেঁকেছে, সেটাই মিলেছে ফাটক থেকে নাক বরাবর এক কিলোমিটর গিয়ে জি.টি. রোডের সঙ্গে৷ রাস্তাটা আগেও ছিল, তবে ইয়ং সাহেব ভেবেচিন্তে চওড়া করেছেন সেটা, আর তার নামকরণ হয়েছে লিঙ্ক রোড৷ জি.টি. রোড যেতে তার বাঁ দিকটা ফাঁকাই বলা যায়, কিছুটা জল কিছুটা ডাঙা, বাদা আসলে, দুএকটা বোর ওয়েলের ইটের ঘর৷ ডানদিকটায় প্রথম সারিতেই অনেকগুলো দোতলা, পয়েন্টিং করা ইটের বাড়ি, ঝকঝকে নতুন হাসপাতাল, নতুন টেনিস এন্ড সোশল ক্লাব৷ আরো ভেতরের সারিগুলোর জায়গায় জায়গায় অ্যাটাচড একতলা স্টাফ় কোয়ার্টার সব, আর অপারেটরস’ ফ়্যামিলি কোয়ার্টার, লাইনের পর লাইন৷ প্রথম সারির বাড়িগুলোর সব কটাই তখন জোড়ুয়া ভাইয়ের মত সমদর্শন—প্রতি তলায় দুটো করে ফ্ল্যাট; শুধু হাসপাতাল থেকে স্কাউটস’ ডেন অবধি পাঁচটা বাড়ির প্রতিটি ফ্ল্যাটে একটা করে বাড়তি সান বারান্দা — শীতকাল ছাড়া রোদ পোয়ানোর দরকার এমনিতে নেই কিন্তু এই দক্ষিণমুখী জালে ঢাকা বারান্দাটা হাওয়া ঘরের মত, আবার ঘোর বর্ষায় দরকার মত কাপড় শুকোত অনেকে৷ বাবা বলতেন, “ঘরের জাঙিয়া ঘরেই থাক না!” বস্তুত, পেছনের নির্জাল লম্বা বারান্দাতেও লোক না দেখিয়ে স্বচ্ছন্দে কাপড় শুকোনো যেত৷ আমাদেরটা ছিল স্কাউটস’ ডেনের আগে উন-অন্তিম বাড়ির দোতলায় ১১৬ নম্বর ফ্ল্যাট৷

###

১৪ পদ্মখাকির দল

শা’গঞ্জের নামকরণ হয়েছিল বাংলা বিহার ওড়িশার মুঘল শাসক শাহ আজ়িমের নামে, যাঁর পোশাকি নাম আজ়িম উশ শান৷ প্ৰথম বাহাদুর শাহের ছেলে তিনি, ঔরঙ্গজ়েবের নাতি৷ কোনো যুদ্ধে একদা শিবির ফেলেছিলেন এই তল্লাটে৷ তার আগেও বর্ধিষ্ণু ছিল গ্রামটা, বাঁশবেড়ের মতই সাবেক সাতগাঁর এক গাঁ, তবে আগে তার কি নাম ছিল তা নিয়ে অনেক সংশয়৷ সরস্বতী মজে যেতেই সাতগাঁর হাঁড়ির হাল৷ বর্ধিষ্ণু বেনেরা মালকড়ির খোঁজে সাতগাঁ ছেড়ে চাটগাঁ (তৎকালীন পোর্টুগীজ় বানানেও প্রায় একাকার নাম দুটো, Catgao আর Catigao), ঢাকা, মালদা, মুর্শিদাবাদ, মায় কলকাতায় ছড়িয়ে গেল৷ চতুষ্পাঠী টোলগুলো তার পরের শিকার: এক বাঁশবেড়েতেই অনতিঅতীত একদা চল্লিশ ঘর টুলো উপাধ্যায় ছিল বলে কানাঘুষো৷ ইংরেজ আমলে আজ়িমের কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল পাবলিক; সেই সুযোগে জায়গাটার নাম হয়ে যায় সাহাগঞ্জ — কয়েক ঘর স্থানীয় সাহা যারা ছিল তারা সে’নামের দাবি রাখেনি কখনও৷ বিভূতিভূষণ তাঁর দেবযান উপন্যাসে শা’গঞ্জই লিখেছেন — শা’গঞ্জ-কেওটা — কেওটা মানে কেওট (কৈবর্ত) পাড়া৷ তা লিখতেই পারেন, একদা কিছুদিন এ তল্লাটে ছিলেন তিনি, অপুর কিশোর বয়েসে; প্রসন্ন গুরুমশাইয়ের পাঠশালা নাকি এখানেই ছিল!

সেনাশিবিরের দৌলতে শা’গঞ্জ বাঁশবেড়ের সঙ্গমে, যার নাম এখন খামারপাড়া, গড়ে উঠেছিল একটা অবধারিত বেশ্যালয়৷ সৈনিক আর বেশ্যা, দেবসেনাপতি উভয়েরই আরাধ্য৷ সেই সুবাদে, পাঁজি দেখে নয়, কৃত্তিকা নক্ষত্রের নামে যে কার্ত্তিক মাস, তার শেষ দিনে এখনও ধুমধাম করে হয় কার্ত্তিকেয়ের পূজা, বারোয়ারি উদ্যোগে৷ তাও একটা দুটো নয়, গণনাতীত! কাত্তিক ঠাকুরের চেহারার রকমফের দেখে ধাঁধা লেগে যায়: খোকা কাত্তিক, ধেড়ে কাত্তিক, দরওয়ান কাত্তিক, এক কানে দুল পরা ঢলানে কাত্তিক (সম্ভবত গে!), বরাঙ্গনা বারাঙ্গনা পরিবৃত লম্বা জুলপি কানে মাকড়ি হাতে লোহার বালা কোমরে ভোজালি মাচো কাত্তিক, এবং দেবানন্দ ব্রুস লী মার্কা কাত্তিকও দেখেছি৷ এখন হুজুগটা হুগলি চুঁচড়ো এবং বাকি বাংলায় ছড়িয়ে গেছে৷ আর আলকাৎরায় লেখা গৃহস্থের বাড়ি নামাঙ্কের সন্দেহজনক পাড়াটা আমার স্মরণকালেও ছিল — সে পাড়ার সত্যিকারের গেরস্তরা গোরে মালা হাতে, আতর সুরভিত, প্রায়-মাতাল রসিকদের হাত থেকে পরিবারের মহিলাদের রক্ষার্থে বাড়িময় লিখে রাখতেন তাঁদের শুচিতার বিজ্ঞাপন!

বারো কোয়ার্টারের অবস্থান শা’গঞ্জের উত্তর-পূর্ব কিনারায়৷ গেট থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় পড়ে ডানদিকে কিছুটা গেলে কারখানার ফাটক৷ বাঁদিকে খামারপাড়া, প্যালেস বোর্ডিং, তার উল্টোদিকে গন্ধেশ্বরী ঘাট৷ সেসব উজিয়ে বাঁশবেড়ে৷ বাঁশবেড়ের ওবাগে দেবরায়দের বাসুদেব (প্রাচীন) আর হংসেশ্বরীর (অর্বাচীন) মন্দির৷ মন্দিরের আশেপাশের ময়রারা খাসা মাখা-সন্দেশ বানাতো, দানা দানা; তেমনটি আর খেলামনা!

তারপর, দরাপ খাঁ গাজির ঢিপি পেরিয়ে, ত্রিবেণী৷ সেই খাঁসায়েব — তুর্কি জ়াফর খাঁ গাজ়ি (ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতক) — যিনি শেষ জীবনে ভুলভাল সংস্কৃতে গঙ্গাস্তোত্র লিখতেন: সুরধুনি মুনিকন্যে…  জাতধম্মের অত্যাচার চরমে পৌঁছনোর আগে অবশ্যই সম্ভব ছিল সেটা, আজ হলে এম.এফ়.হুসেনের দশা হত, অন্যথায় মৌলবিদের রক্তচক্ষু, হয়ত দুটোই! বাঁশবেড়ের মাঠে রথের মেলা বসত তখন: থালার মত বড় পাঁপড়ভাজা আর দাঁতভাঙা গুজিয়া-কটকটি (বাসি সন্দেশ বেশি করে চিনিতে জ্বাল দিয়ে আধ বিঘৎটাক লম্বা কাঠির মত গড়ে একটু তিল ছিটিয়ে তৈরি হত দাঁত ভাঙা কটকটি) খেয়ে, চাকাওয়ালা মালসার ওপর ব্যাঙের চামড়া লাগানো দড়িটানা খ্যাঁচকাঠির ট্যামটেমি, কিংবা টিনের চোঙের দুপাশে নকল চামড়া আঁটা ঢোল, এবং বাঁশের-কাঠির-ওপর সাঁটা মৃগিগ্রস্ত তালপাতার সেপাই কিনে বীরদর্পে ঘরে ফিরতাম৷

আমাদের বারো নম্বর বাড়িতে সোফা সেটি; সেন্টার টেবিল; পেক্স স্টুল; দম দেয়া বাক্স গ্রামোফোন (রেড উডের বডি, সবচেয়ে ওপরের প্রকোষ্ঠের হিঞ্জ করা ডালাটা ষাট ডিগ্রি কোণ করে খুলত — ডালার মাঝখানে প্রভুর বশংবদ সারমেয়ের ছবি, টার্ন টেবলের এক পাশে পিন রাখার আর বাতিল পিন ফেলার জায়গা, অন্য পাশে ষোলো থেকে আটাত্তর আর.পি.এম. অব্দি ঘূর্ণি পাল্টানোর ডায়াল, বাক্সের তিনটে প্রকোষ্ঠের মাঝেরটায় চোঙ্গার বদলে একটা তসরে ঢাকা চৌকো অংশ — বাবার ভাষায় গ্লাস-ডায়াফ়্রাম স্পিকার — সেটা যে কি জন্তু তা কে জানে! নিম্নতম প্রকোষ্ঠে রেকর্ড রাখার ব্যবস্থা); মায় আমার চেন-স্প্রকেট ওয়ালা বিলিতি ট্রাইসাইকেল — সবই ছিল, জীবনানন্দের অমোঘ ভাষায়, ব্যবহৃত, ব্যবহৃত, ব্যবহৃত…, বিদায়ী সাহেবদের থেকে কেনা৷ শুধু আমার দুলুনি ঘোড়াটা আনকোরা; অবরেসবরে সেই ঘোড়ায় পালা করে দুলত সবাই, সমবয়স্ক কারু জন্মদিনে গমগমে আওয়াজের সেই বাক্স-গ্রামোফোনটার চাহিদা ছিল খুব — বিবিধ ঈর্ষান্বিত মন্তব্য (বাট নট সো পোর্টেবল লাইক আওয়ার অ্যাটাচি-সাইজ়়ড ওয়ানস!) সত্ত্বেও৷

বারো কোয়ার্টারের চত্তরে বারোটা একতলা বাড়ি, মেলাই ছেলেমেয়ে, তার মধ্যে আমার কাছাকাছি বয়েসের বিজগুড়িরা আধ ডজনের বেশি তো বটেই! আমরা ক’জন আন্টি ডি’ক্রুজ়ের এলেবেলে স্কুলে যেতাম শম্ভুর মাসকাবারি রিকশায়৷ মাঝেমাঝে পাগলা সুন্দরলাল তার বদলি খাটত৷ (সুন্দরলাল সত্যিই পাগলা: শরৎ সরণির অন্ধকারে হিসি করতে নেমে ডানহাতে সাপের ছোবল খেয়েছিল; বাঁহাতে বিষাক্ত সাপটার ফনা মুঠিয়ে ধরে, রিকশা চালিয়ে, সোজা কোম্পানির হাসপাতাল!) অন্যেরা যেত কোম্পানির বাংলা স্কুলে, পঞ্চিপিসির সঙ্গে, পদাতিক৷ পঞ্চিপিসির ছেলেছাঁট চুল ও পরনের কাপড় দুইই সাদা৷ ছোটখাটো মানুষটা ঝুঁকে পড়লেও শক্তপোক্ত৷ প্রত্যেকটি ক্লাস ঝাড়পোছ, হেডমাস্টারের নোটিস এ ক্লাস ও ক্লাসে চালাচালি আর সময়মত ঘন্টা বাজানো ছিল তার কাজ; পরীক্ষার সময়ে ওপর টেইম!

খোলা আকাশের নিচে, সবুজ-দেয়াল সবুজ-গালিচার খেলাঘরে, বেমিশাল আনন্দ ছিল তখন: স্বাধীনতার আনন্দ, বড়বেলায় যার খোঁজ পাইনি আর৷ রঙন ফুলের মধু চুষতাম আমরা, বড়কাকিমাদের লংকা জবারও৷ মৃত্যুঞ্জয় মুখার্জির যমজ মেয়েরা, বড়ি আর ছুটি, বলত, “কলকে ফুলের মধু খাসনি, বেজায় বিষ!” আমরা তাও চুষতাম৷ হাঁটুতে মার্কিউরোক্রোম, কনুয়ে মার্কিউরোক্রোম, কখনও সখনও লাল ওষুধের বদলে গাঁদা পাতার হাতে ডলা রস, কারুকারু কপালে স্টিকিং প্লাস্টার (ব্যান্ড-এড তখনও দেখিনি), আলুথালু চুল, প্যান্টের বাইরে শার্টের লেজ, ধুলোমাটি মাখা তো ছিলই!

সে সব ছেড়ে যাওয়া সহজ?

তবু ছেড়ে যেতে হল, যেতে হবে তাই৷

###

১৫ গুপ্তধনের খোঁজ

নতুন এস্টেটের সামনে দিয়ে একটা চওড়া রাস্তা, লিঙ্ক রোড, কারখানার গেট থেকে বেরিয়ে পূব পশ্চিম নাক বরাবর জি.টি. রোডে পড়েছে৷ পূব দিক বাদ দিলে তিনদিকেই এক ইটের পাঁচ ইঞ্চি দেয়াল, সাইন কার্ভ়ের মত ঢেউ খেলানো, যাতে হাওয়ায় পড়ে না যায় — আর্কিটেক্ট ইয়ং সাহেবের অনবদ্য সৃষ্টি৷ তাঁর ছেলে জন আমাদের সঙ্গে পড়ত, থাকত সাহেবদের জন্য বরাদ্দ কমপাউন্ডে — বিলাসের অমরাবতী৷…

লিঙ্ক রোডের (রাস্তার নামগুলো ক্যাজুয়ারিনা ওয়াক, ক্যানা অ্যাভ়িনিউ ইত্যাদি — মদীয় পিতৃদত্ত; একটা বিশুদ্ধ দেশি নাম, শিরিষ গাছে সমৃদ্ধ শিরিষ বীথিকা, অবশ্য ধোপে টেঁকেনি) উত্তরে দোতলা বাড়ি সব, নিচে দুটো ওপরে দুটো ফ্ল্যাট৷ ঠিক সার বেঁধে নয়, গায়গায়েও নয়, জায়গাটার  ভূগোল মেনে, যথাসম্ভব গাছ না কেটে, সন্তর্পণে উপস্থাপিত, যাতে খামোখা খটকা না লাগে৷ বাড়িগুলোর সামনে পায়ে চলার জন্য ইটের পথ, লিঙ্ক রোডের সমান্তরাল; তা থেকে সমকোণে গৃহাভিমুখী অনুরূপ পথ প্রত্যেক বাড়ির সামনের লম্বাচওড়া লনগুলোকে দ্বিখন্ডিত করছে৷

মেহেদির বেড়ায় ঘেরা লনে আমরা বড়-হয়ে-যাওয়া খেলা খেলতাম: ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, পিট্টু, আর ট্রাইসাইকেল সজোরে চালিয়ে পেছনের একটা চাকা শূন্যে তুলে দ্বিচক্র ব্যালান্সের খেলা৷ ওই লনে আমি বাইসাইকেলও চালাতে শিখি: ম্যানজ়েল এঞ্জেলো, স্টিভ়েন পেট্রোজ়া আর জ্যাকি স্টিফ়্ল্ (স্ত্রীং!) আমার এক রাশ কমিক ধার নিত — পড়তে যতক্ষণ লাগে তাদের চোদ্দ কিংবা ষোলো ইঞ্চি সাইকেল ততক্ষণ আমার৷ ফ্ল্যাটগুলোর পেছনে, বাগান আর নয়ানজুলি পেরিয়ে স্কাউটস’ ডেনের মাঠ, সেটা পেরিয়ে আরো কিছু নির্মীয়মান কোয়ার্টার আর ৮৪ একর সদ্য কেনা অনাঘ্রাত জঙ্গল৷ কুন্ডুদের জায়গা ছিল আগে, তখনও ছিল তাদের চাকর মহলের ধ্বংসস্তুপ এবং খিড়কির মজে আসা পুকুর — লোকে কুন্ডু পুকুর বলে৷ সেখানে আমরা গুপ্তধনের খোঁজে বিস্তর খোঁড়াখুঁড়ি করতাম৷

আমার ন’বছরের জন্মদিনে মা কিনে দিয়েছিল একটা ডায়ানা এয়ার রাইফ়ল, ভ়েরি এক্সপেন্সিভ়, ২৫ টাকা! তবে লিডারশিপের জন্য দুর্দান্ত৷ আমার ভাই আমার চেয়ে প্রায় দশ বছরের ছোট; তার জন্মের সময়, ১৯৫৬-তে, বাবা দিলেন বয়ঃপ্রাপ্ত চব্বিশ ইঞ্চি এভ়ন সাইকেল (অনেক দিন হাপপ্যাডেলে চালাতাম), আজ মনে হয় হয়ত ঘুষ হিসেবে৷ এ-দুয়ের মণিকাঞ্চন যোগেও আমার ভবিষ্যৎ নায়কত্ব পাকা হল না!

১৯৫৪-র মাঝামাঝি থেকে আমরা নতুন এস্টেটের ১১৬ নম্বরে৷ জনডিসের জন্য প্রায় একবছর গৃহবন্দি থাকার পর ১৯৫৫-র জানুআরিতে কোম্পানির বাংলা স্কুলে ভর্তি হলাম, পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ক্লাস ফ়াইভ়ে৷ মলয় বাদে ক্লাসের সব্বাই পুরনো, কিন্তু আমার কাছে বুলটু, পতাকী, শঙ্কর, জাপান, পাঁচুগোপাল কান্ডি, সুভাষ, বিমান, দুই দীপালী, চম্পা, ছন্দা, আরতি, প্রণতি — আনকোরা নতুন৷ মলয় করও আমার মত সেবারই ভর্তি হল কলকাতা থেকে এসে৷ শুধু টাইফয়েডে বেদম ভুগে নতুন করে ভর্তি হল আলো বলে একটা মেয়ে — আলো মজুমদার; স্বভাবতই তার সঙ্গে আমার ভাব হল বেশি৷ কিন্তু মেয়েদের সঙ্গে ভাব করে লাভ নেই: তারা ফুটবল ক্রিকেট ডাঙ্গুলি লাট্টু খেলতে চায়না, পারেওনা; অগত্যা…!

বলতে দ্বিধা নেই, আমার প্রাণের বন্ধু ছিল কানাই হালদার — ঈশ্বরবাগে বাড়ি, তার বাবা কোম্পানির শ্রমিক৷ কত কি শিখেছি তার কাছে — অমোঘ চার আর অব্যর্থ টোপের সুলুক সন্ধান: সর্ষের খোল, মেথি, দুধের সর (অভাবে লুকিয়ে চুরিয়ে বুগনুর কাউ এন্ড গেটের এক খামচা মহার্ঘ্য গুঁড়ো দুধ … মাছ যাবে কোথায়!), আরও কত কি সব ঘিয়ে ভেজে তৈরি সেই গোপন ফর্মুলার চার, ছিপ ফাৎনা বঁড়শি বাঁধা, খ্যাঁচ মারার টাইমিং; নারকেল তেল আর কস্টিক সোডা মিশিয়ে গোলা-সাবান তৈরি; নানান জংলি গাছগাছালির গুণাগুণ… ঋণের শেষ নেই!

প্রথম হেডমাস্টার ছিলেন যিনি, তাঁর নাম মনে নেই তবু তাঁর বিরলকেশ, প্রবীণ চেহারাটা চোখের সামনে ভাসে৷ কমাস বাদেই এলেন জিতেনবাবু, সতীদির বাবা; কয়েক বছর পর কোনও কারণে তাঁকে চাকরি ছাড়তে হয়৷ তদ্দিনে অবশ্য আমি চুঁচড়োর স্কুলে৷ দু-বছর মাত্র ছিলাম, কিন্তু মায়ায় জড়িয়ে ছিলাম তার চেয়ে ঢের বেশি৷

এই পর্বে আমার দিগন্ত অতি দ্রুত পিছু হটছিল৷

সামনের সর্পিল পাচিল আর পেছনে, স্কাউট’স ডেনেরও পেছনে, চুরাশি একর জঙ্গল পেরিয়ে; বাঁশবেড়ের হংসেশ্বরী-বাসুদেবের মন্দির ছাড়িয়ে ত্রিবেণীর গাজির ঢিপির কাছ বরাবর; উল্টোবাগে পুরনো পোস্টাপিস, পেরেক কল, ব্যান্ডেল চার্চ, হুগলি বালির মোড়, চকবাজার ডিঙিয়ে ওলন্দাজদের শহর চুঁচড়োর ঘড়ির মোড় অবধি৷ বন্ধুদের সংখ্যাও জ্যামিতিক হারে বাড়ছিল, ইশকুলের বা পাড়ার বন্ধু ছাড়াও এদিক ওদিক সেদিকের বন্ধু৷ যদিও, কোনো কারণে, অবশ্যই আমার নিজেরই দোষে, আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুর সংখ্যা চিরকালই কম; এখন যত তখনও প্রায় ততজনই৷ সম্পর্কের গন্ডি বাড়তে থাকলে, এবং চোখ কান মনের দরজা হাট করে খুলে রাখলে, মানব বৈচিত্র্যের একটা ঝাপসা মত আন্দাজ পাওয়া যায়, যে আন্দাজ অনেকের পরিণত বয়সেও অকুলান৷ সেটা মানুষের দোষ নয়, ইন্দ্রিয়ের অসুখ; একরকম অন্ধত্ব, বধিরতা; দরজা খোলার মত কাজে আলস্য৷ তা ছাড়া, তখন আমাদের টিউশনের চাপ, গান শেখা, ক্রিকেট শেখার, পেট থেকে পড়েই ডাক্তার এঞ্জিনিয়ার আই.এ.এস. বনবার বাড়তি চাপ ছিল না, তাই হয়ত নিজেরা নিজেদের মত ইচ্ছেশিক্ষা করতে পারতাম।

একদিকে, সেই ব্যাঙের কুয়োর মত বদ্ধ দুনিয়ার নিম্নতম থেকে সর্বোচ্চ স্তরের স্ব-স্ব চেহারা আর তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, অথবা সম্পর্কের অভাব — কয়েকটি ধানের শিসের উপর কয়েকটি শিশির বিন্দু — নিজের চোখে দেখতে আর চিনতে শিখলাম, একটু একটু করে — শিশু যেমন আস্তে আস্তে অ-আ-ক-খ শিখে তারপর যুক্তবর্ণে উন্নীত হয়, চেলাগিরির সময় পোটো যেমন আগে আধমাটির কাজ শিখে বয়সকালে দুগ্গা গড়তে শেখে৷ চরিত্র পাঠে অবশ্য কাজের কাজ কিছু হয়না, বরং ক্ষতি অনেক, সাত পাঁচ দেখে তখন মনে দশ রকম অকারণ ভয় জন্মায় — সম্পর্ক গড়ার ভয়, সম্পর্ক ভাঙার ভয়, মানুষকে অজান্তে আঘাত করে ফেলার ভয়, অন্যের ক্ষতি করে নিজের আখের গোছানোর অব্যক্ত আশংকা! অন্যদিকে বই পড়া জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তবকে মিলিয়ে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম ওই অল্প কয়েকটা বছর৷ লাভের মধ্যে কেবল জটিল বীজগনিতের মত অনেকগুলো সমাধান সুত্র আমার মনের মধ্যেই জড়ো হয়ে গেছে, চাই বা না চাই; তাতে আখেরে লাভ হয়না, তবে লোকসানও নেই কিছু। এখন, বয়সকালে, হাতে যখন অঢেল সময়, সেই সব গাণিতিক সমাধান অনেকখানি একলা সময়ের মধ্যে মনের মধ্যে যৌবনের ভোমরার মত গুনগুনিয়ে ওঠে থেকে থেকে; ভাগ্গিস কেউ মন পড়তে পারে না!

সেই যে অসিত হালদারের ছড়া আছে না —

আহ্লাদি পুতুলের তিনটি ছেলে

খিদে পেলে খায় না কো মাকে ফেলে

কাঠখোদা কুকুরের বড় করে ভয়

তাই তারা সর্বদা মা’কাছে রয়

 তাদের মত ঘরকুনো, মা ঘেঁষা হলে আজীবন কাঠখোদা কুকুরদের ভয় করে চলতে হত। (প্রসঙ্গত, আরেকটা মা ছেলের ছড়া হঠাৎ মনে পড়ল —

পাঁচির মায়ের পাঁচটি ছা

পাঁচটি ছায়ের পাঁচটি পা

পাঁচটি পায়েই পাঁচড়া ঘা!

—  কার লেখা মনে নেই তবে বেশি মা ঘেঁষা হলে দেখছি চর্ম রোগও হতে পারে!)

কুন্ডু পুকুরের অনতিদূরে একটা ইটের ইমারতের ধ্বংসাবশেষ থেকে পাঁচটা রং জ্বলা কড়ি আর গোটা দুই প্রাচীন, কলঙ্ক ধরা তামার পয়সা পেয়েছিলাম একবার, পিটর আর আমি; সে কোন কালের কে জানে! বিস্তর খোঁড়াখুঁড়ি করতে হয়েছিল ওইটুকু প্রত্ন লাভের জন্য। পিটরের ইচ্ছে ছিল কোদাল গাঁইতি নিয়ে আরো গভীর করে খুঁড়ে দেখে; বর্ষা নেমে যাওয়ায় তা আর হয়ে ওঠেনি৷ তার পর পিটর অনিচ্ছায় যেখানে পৌঁছে গেল, সেখানে গুপ্তধনের কোনও দরকার হয়না। তবু যেন মুঠো মুঠো গুপ্তধন না চাইতেই পেয়েছিলাম নিজের অজান্তে; শুধু ধ্বংসস্তুপের আনাচে কানাচে নয়, পারিপার্শ্বিকের থেকে, অনেক মানুষের গায়ে গা ঘষার ফলে, তাদের ভাষা ব্যবহারের, সংস্কারের, বিশ্বাস অবিশ্বাসের অবচেতন বিশ্লেষণে৷ তাতে অভিজ্ঞতার ঝুলি আপনিই ভরে গিয়েছিল সারা জীবনের মত।

###

Other posts in <aniruddhasen.wordpress.com> and <apsendotcom.wordpress.com>

Advertisements

পদক্ষেপ

Information

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s




%d bloggers like this: